Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭, ২২ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা

| প্রকাশের সময় : ১ জুলাই, ২০২০, ১২:০১ এএম

গত সোমবার রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে এক মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ রুটে চলাচলকারি মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ঘাটে ভেড়ার কয়েক মিনিট আগে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। অপেক্ষাকৃত বড় লঞ্চটি মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়ায় মুহূর্তের মধ্যে উল্টে গিয়ে নদীতে তলিয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের দেয়া তথ্য অনুসারে, লঞ্চে থাকা দেড়শতাধিক যাত্রীর মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ জন সাঁতরে কূলে উঠতে সক্ষম হলেও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকারিরা ৩৩ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। স্বজনের লাশ দেখে এবং নিখোঁজদের খোঁজে বুড়িগঙ্গা তীরে শত শত মানুষের আহাজারি ও কান্নার রোল পড়ে যায়। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়। আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালের ফেব্রæয়ারীতে মানিকগঞ্জে পদ্মা নদীতে কার্গো ভেসেলের ধাক্কায় লঞ্চ ডুবিতে ৭১ জন নিহত হওয়ার গত ৫ বছরের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে নৌপরিবহন চলাচলে আইনগত বাধ্যবাধকতা ও সর্তকতা অবলম্বন করলে এ ধরণের নৌ-দুর্ঘটনা সংঘটিত হত না। নৌদুর্ঘটনার জন্য দায়ী ময়ূর-২ লঞ্চটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক নবিশ চালক চালাচ্ছিল বলে জানা যায়।

প্রায়ই নদীতে নৌ দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনো কোনো দুর্ঘটনাকে ¯্রফে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা এবং দুর্ঘটনার সঠিক প্রতিকার না হওয়ায় এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। তাৎক্ষণিকভাবে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি যেন একটি পরিকল্পিত হত্যাকাÐ। অতীতেও এমন অনেক দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় নৌযানের মারাত্মক ত্রæটি, অবহেলা বেপরোয়া মনোভাব ও আইন লঙ্ঘনের চিত্র ধরা পড়লেও তার প্রতিকার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই যথারীতি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়,তদন্তের রিপোর্টও জমা হয়। কিন্তু সুপারিশমালার বাস্তবায়ন বা দায়ীদের শাস্তির নজির না থাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। বুড়িগঙ্গায় দুর্ঘটনার তদন্তেও ইতিমধ্যে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ময়ুর-২ লঞ্চটিকে আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের জিম্মায় আটক করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার মধ্যে এমন ভয়ঙ্কর নৌদুর্ঘটনার জন্য যে বা যারাই দায়ী হোক তাদেরকে অবশ্যই উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বলা বাহুল্য, নৌ-পরিবহন সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। দেশের নৌ-পথের সংস্কার, নদীর নাব্য বৃদ্ধির পাশাপাশি নৌপরিবহনের আধুনিকায়ণ ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির মাধ্যমে নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌপরিবহনের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। এ জন্য নৌপরিবহনের ফিটনেস, নৌচালকদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামগ্রিক বিষয়ের উপর উপযুক্ত মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণত কালবৈশাখী ঝড়, ঘন কুয়াশা এবং অন্ধকার রাতে দিক হারিয়ে ফেলা, যান্ত্রিক ত্রæটি এবং অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বোঝাইয়ের কারণে নৌদুর্ঘটনা হয়ে থাকে। বুড়িগঙ্গার দুর্ঘটনার পেছনে এর কোনোটিই ছিল না। একটি বড় লঞ্চের নবিশ, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়ষ্ক চালকের কারণে এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসবে বলে আশা করা যায়। নৌদুর্ঘটনা প্রতিদিন ঘটে না, বছরে দু-একটি দুর্ঘটনায় শত শত মানুষ মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০ বছরে ১২টি বড় নৌ-দুর্ঘটনায় দেড় হাজার যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন এবং রিপোর্ট পেশ করা হলেও, কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে এ দুর্ঘটনার রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না। মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা। ভরা বর্ষা এবং বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ঈদের ছুটিতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ লঞ্চে চড়ে বাড়ি ফিরবে। তার আগে এই লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রত্যেকের মধ্যেই যে ভীতি সঞ্চার করবে, তাতে সন্দেহ নেই। এ প্রেক্ষিতে, নৌ দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে সতর্কতা ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যে কোনো স্থানে যে কোনো নৌ দুর্ঘটনা মোকাবেলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের গাফিলতি ও শৈথিল্য কাম্য হতে পারে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: লঞ্চ


আরও
আরও পড়ুন