Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

জনপ্রতিনিধিরা কি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন?

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১০ জুলাই, ২০২০, ১২:০২ এএম

আমাদের দেশের জনগণকে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সেবা-যত্ন পেতে খুব কমই দেখা যায়। কেবল নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিরা মাটিতে নেমে আসেন, জনগণের কাছে যান, আর নির্বাচন শেষে সুরক্ষিত প্রাসাদে গিয়ে ওঠেন। সেই যে ওঠেন, আর নামেন না। আবার নির্বাচন এলে নামেন। নির্বাচিত হয়ে গেলে তাদের ধারে কাছেও জনগণ যেতে পারে না। এলাকায় গেলেও তাদের বডিগার্ডরা যেভাবে সুরক্ষা দেয়াল তৈরি করে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে টপকে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। অর্থাৎ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও জনপ্রতিনিধিদের অনেকে জনগণের সুরক্ষার মধ্যে না থেকে বডিগার্ডের নিরাপত্তায় চলে যান। সেখান থেকে বের হন না বললেই চলে। জনগণ তাদের কাছে অচ্ছুৎ হয়ে পড়ে। তার এলাকার জনগণ কেমন থাকে, কীভাবে থাকে, তাদের উন্নয়ন কতটুকু হচ্ছে-এসবের খোঁজ-খবর রাখতে খুব একটা দেখা যায় না। বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধির আচরণ যুগের পর যুগ ধরে এমন হয়ে আছে। অথচ জনপ্রতিনিধি মানেই নিজেকে উজাড় করে জনসেবা করা এবং দুর্যোগ, দুর্ভোগ, দুঃসময়ে জনগণের পাশে থাকা। এই যে, করোনা মহামারি ও মহাদুর্যোগ চলছে, এর মধ্যে কয়জন সংসদ সদস্য কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নিজ এলাকায় আছেন? তারা কে কোথায়, কীভাবে আছেন, তার খবর কি জনগণ জানে? তাদের সেবা কি তারা পাচ্ছে? পাচ্ছে না। বরং এ খবরই পাওয়া যাচ্ছে, প্রায় প্রত্যেকেই সর্বোচ্চ সুরক্ষার মধ্যে নিজেদের নিয়ে গেছেন। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে নিজ এলাকার জনগণের খোঁজ-খবর নেয়া এবং তাদের পাশে থেকে সেবা করার সংবাদ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের চার-পাঁচ জন মন্ত্রী ছাড়া আর তেমন কারো সংবাদ দেখা যায় না। অথচ প্রধানমন্ত্রী বারবার করোনা সংকটের মধ্যেও দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার নিরন্তর প্রচেষ্ট চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক, এক প্রধানমন্ত্রী এবং চার-পাঁচ জন মন্ত্রী ছাড়া যেন জনপ্রতিনিধিদের বেশিরভাগ নিস্ক্রিয় হয়ে রয়েছেন। উল্টো করোনা সংকটের মধ্যেই কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসরত স্ত্রী-সন্তানের কাছে চলে গেছেন। কোনো কোনো এমপির নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এছাড়া বাকি জনপ্রতিনিধিদের তেমন কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিদের এমন নীরবতায় মনে হওয়া স্বাভাবিক, দেশে যেন জনপ্রতিনিধি শূন্য হয়ে রয়েছে।

দুই.
সংসদের জনপ্রতিনিধিদের তেমন খোঁজ পাওয়া না গেলেও, তৃণমূল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের অনেকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বারদের তৎপরতা এবং অপতৎপরতার খবর পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়। তবে এসব প্রতিনিধির বেশির ভাগই যে, করোনাকালীন সরকারি ত্রাণ কর্মসূচির কারণে বেশি সরব, তা বোঝা যায়। এ কার্যক্রমে তারা বেশ আগ্রহ এবং উৎসাহ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। তাদের এই আগ্রহ-উৎসাহের কারণ জনগণ বুঝতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক জনপ্রতিনিধিকে জনগণের সেবার পরিবর্তে ত্রাণ লুটপাট, ত্রাণের অর্থ মেরে দিতে জনগণ দেখেছে। এমন ১০০ জনপ্রতিনিধির খোঁজ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রয়েছে, ইউপি চেয়ারম্যান ৩০ জন, ইউপি মেম্বর ৬৪ জন, পৌর কাউন্সিলর ৪ জন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ১ জন, জেলা পরিষদ সদস্য ১ জন। তদন্তে এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় সরকার সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তবে বরখাস্ত করলেও এলাকায় তাদের অপতৎপরতা থেমে নেই। কেউ কেউ কোর্টের অর্ডার নিয়ে বরখাস্ত স্থগিত করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দুঃখ করে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এদের কেউ বরখাস্ত থাকবেন না। তারা আবার স্বরূপে ফিরে আসবেন। কারণ এদের ৯০ জনই সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় পর্যায়ের এসব জনপ্রতিনিধির বাইরেও যে আরও অনেকে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে আছেন, তাতে সন্দেহ নেই। সব খবর সবসময় পত্র-পত্রিকায় আসে না। এখনও যে সরকারের ত্রাণ নিয়ে নয়-ছয় হচ্ছে, তা সচেতন ব্যক্তি মাত্রই জানেন। চাল, তেল, ডাল চুরি থেমে নেই। এই যে সরকার নগদ সহায়তা হিসেবে সারাদেশে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের একজন করে সদস্যের মোবাইল ব্যাংক নম্বরে ২৫০০ টাকা করে অর্থ দিচ্ছে, এ নিয়ে কী কেলেঙ্কারি ঘটনাই না ঘটেছে! এই সহায়তার প্রথম কিস্তিতে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়িয়াটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তার নিজের ভাতিজাসহ চার স্বজনের মোবাইল ব্যাংক নম্বরে ৩০৬ জনের নাম ঢুকিয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছে, ২৫০০ টাকা হিসেবে ৩০৬ জনের ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা তিনি একাই মেরে দিয়েছেন। অর্থাৎ একদিনেই তিনি লাখপতি হয়ে গেছেন। তার মতো এমন আরও অনেকে কেউ ১০০, কেউ ৮০টি নম্বর দিয়ে টাকা মেরে দিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক গোপন প্রতিবেদনে আরও ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ লাখ প্রান্তিক মানুষকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে মহাদুর্নীতির ‘ছক’ খুঁজে পাওয়া গেছে। সহায়তা পাওয়ার জন্য যে তালিকা মাঠ পর্যায় থেকে মন্ত্রণালয়ে এসেছে, সেখানে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের তথ্যে গরমিল রয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের পাঠানো এ তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে, সরকারি কর্মচারী, সঞ্চয়পত্রের মালিক, পেনশনভোগীদের মতো মানুষ। এসব মানুষের মাধ্যমে ৬৯৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন জনপ্রতিনিধিরা। জনপ্রতিনিধিদের এ কী ভয়ংকর দুর্নীতি! জালিয়াতি ধরা পড়ায় ২৮ লাখের মধ্যে মাত্র ৫ লাখ লোকের তালিকা বাতিল করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি। তার অর্থ হচ্ছে, করোনার এই মহাদুর্যোগ জনগণের জন্য অভিশাপ হয়ে এলেও, অনেক জনপ্রতিনিধির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তাদের জন্য পৌষ মাস আর সরকার ও দরিদ্র মানুষের জন্য সর্বনাশ হয়ে উঠেছে। দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কর্মসূচিতেও অনিয়ম-দুর্নীতি এতটাই বেড়েছিল যে, সরকার এ কর্মসূচি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল। যদিও এখন পুনরায় চালু করা হয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এ কর্মসূচির সাথে জড়িত দুর্নীতিবাজরা এতটাই অমানবিক যে, দরিদ্র মানুষকে ১০ টাকা দিয়েও চাল কিনতে দেয়নি। এ চাল চুরি করে বেশি দামে বিক্রি করেছে। সরকার দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের জন্য রেশন কার্ড প্রবর্তণের ঘোষণা দিয়েছে। এই উদ্যোগ এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কবে থেকে চালু হবে, আদৌ চালু হবে কিনা, তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এটি একটি ভাল উদ্যোগ। উদ্যোগটি চালু হলে, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হতো। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও এই রেশন কার্ডের মাধ্যমে সম্মানজনকভাবে পণ্য ক্রয় করতে পারত। আশি দশক পর্যন্ত দেশে এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তখন মধ্যবিত্তদের সাশ্রয়ে পণ্য ক্রয়ের অন্যতম উৎস হয়েছিল এই রেশন কার্ড। উদ্যোগটি চালু হলে এটিও যে দুর্নীতিমুক্ত থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে দুর্নীতি যাতে না হয় এবং যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে চালু করা হলে অসংখ্য মানুষ এই আকালের সময় উপকৃত হতো। বলা বাহুল্য, তৃণমূল মানুষের কাছাকাছি থাকা অনেক জনপ্রতিনিধিই দরিদ্র মানুষের হক মেরে দেয় এবং দিচ্ছে। এমন দুর্নীতিবাজদের কারণেই ভাল উদ্যোগগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরা যেন জনপ্রতিনিধি না হয়ে দুর্নীতির প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। এদের সিংহভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। তার অর্থ হচ্ছে, দারিদ্র্য কমানো এবং দরিদ্র মানুষের সহায়তায় সরকার আন্তরিক হলেও, তা তার দলের লোকজনের কারণেই ব্যাহত হয় এবং সরকারও বদনামের ভাগিদার হয়। আবার সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে তেমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। যা নিচ্ছে, তা লোক দেখানোতে পরিণত হচ্ছে। নিজ দলের লোকজনের প্রতি এমন নমনীয় আচরণের মাধ্যমে সরকার নিজেই নিজের ইমেজ নষ্ট করছে।

তিন.
চলমান মহাদুর্যোগ তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের জনসেবার নমুনা দেখা গেলেও সংসদের জনপ্রতিনিধিদের জনসেবা এখন কোন পর্যায়ে তা দৃশ্যমান নয়। এটুকু বোঝা যাচ্ছে, নিজ নিজ এলাকায় তাদের তৎপরতা নেই বললেই চলে। অথচ মহাদুর্যোগের এই সময়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে অসহায় হয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাদের প্রধান দায়িত্ব। সাধারণ অর্থে একজন জনপ্রতিনিধি তিনিই হন, যিনি নিঃস্বার্থভাবে জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। আমাদের দেশে বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিজের সেবা করা। সরকারি সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে কীভাবে বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া যায়, ব্যবসাপাতি করে শত কোটি টাকার মালিক হওয়া যায়, এটাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৭০ ভাগেরও বেশি ব্যবসায়ী। এ থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত রাজনীতিবিদরা রাজনীতিতে এখন সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন। রাজনীতিবিদরা ব্যবসা করতে পারবে না, কিংবা ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করতে পারবে না, এমন কোনো বাধাধরা নিয়ম নেই। তবে একজন ব্যবসায়ী যদি রাজনীতিতে এ লক্ষ্য নিয়ে আসেন, তিনি জনপ্রতিনিধি হয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ব্যবসা বাড়াবেন, শত শত কোটি টাকার মালিক হবেন, তখনই তা আপত্তির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এ সময়ের সংসদ সদস্যদের অনেকের লক্ষ্যই যে তেমন, তা জনগণ বুঝতে পারে। অথচ একজন জনপ্রতিনিধি যদি সত্যিকারের জনসেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করেন, তাহলে সরকার যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাতেই তার জীবন স্বচ্ছন্দে চলতে পারে, আবার নিজ এলাকার উন্নয়ন ও জনগণের সেবাও করতে পারে। এতে জনগণ সন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় তাকে নির্বাচিত করবে, এ নিশ্চয়তা থাকে। দুঃখের বিষয়, আমাদের বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি রাজনীতিই করেন নিজের আখের গোছানোর জন্য, জনগণের জন্য নয়। যদি তা না হতো, তবে করোনার এই মহাদুর্যোগে তাদেরকে এলাকার মানুষের পাশে সবসময় দেখা যেত। দেখা যাচ্ছে, তাদের কোনো খোঁজ-খবর নেই। করোনার ভয়ে সবাই সর্বোচ্চ সুরক্ষার মধ্যে চলে গেছে। তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, চাচা আপন প্রাণ বাঁচানোর মতো। জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে যখন এই মনোভাব পরিলক্ষিত হয়, তখন জনগণের দুর্দশার সীমা থাকে না। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কেউ কেউ সর্বোচ্চ সুরক্ষিত জায়গায় থেকেও করোনা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। অনেকে ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। পর্যবেক্ষরা মনে করছেন, সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিয়ে তারা যদি জনগণের সেবায় নিয়োজিত থেকে করোনায় আক্রান্ত হতেন, তাহলে তা হতো প্রকৃত জনপ্রতিনিধির দৃষ্টান্ত। আমরা যদি জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং এমপি মাশরাফি বিন মোর্তজার দিকে তাকাই তবে দেখব, তিনি করোনাকালে তার এলাকার মানুষের সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। মানুষের সেবা করতে গিয়েই তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার প্রতি দেশের মানুষের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও প্রশংসা ঝরে পড়ছে। অন্যদিকে এই করোনাকালেই মাশরাফির কলিগ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং এমপি নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বিরুদ্ধে নিজ এলাকায় অনিয়ম দুর্নীতি, অনিয়ম, চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় দলের সাবেক এই দুই অধিনায়কের মধ্যে কী বিপরীত চিত্র! এছাড়া রাজশাহী-৪ আসনের এমপি এনামুল হকের বিরুদ্ধেও অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আরেক এমপি’র কুর্কীতি তো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি শহিদ ইসলাম পাপুল কুয়েতে অর্থ ও মানবপাচারের মামলায় গ্রেফতার হয়ে দেশটির জেলহাজতে রয়েছেন। তার এই অপকর্মে দেশের মান-মর্যাদা ভুলুন্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ করোনার মহাসংকট মোকাবেলায় সরকারকে যখন হিমশিম খেতে হচ্ছে, তখন সরকারি দলের এসব এমপির কারণে চরম বিভ্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। সরকারের জন্য এ যেন গোঁদের উপর বিষ ফোঁড়া হয়ে উঠেছে। সরকারকে যদি তার এমপিদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বিভ্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়, তবে জনগণের সেবায় সে কাদের ওপর ভরসা করবে? অবশ্য সরকার করোনাকালীন বেশিরভাগ ত্রাণ কার্যক্রম সরকারি আমলাদের দিয়ে করাচ্ছে। এ কাজ করার কথা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এলাকার এমপি ও জনপ্রতিনিধিদের। তা না করে আমলাদের দিয়ে কেন করা হচ্ছে? এর কারণ হতে পারে, হয় এমপিদের ওপর সরকার ভরসা করতে পারছে না, নতুবা তাদের করোনামুক্ত রাখার জন্য। এই দুই কারণই কি এমপি ও জনপ্রতিনিধিদের জন্য লজ্জার বিষয় নয়? জনদরদী হয়ে এমপিরা যদি বলে, করোনার মধ্যেই জনগণের পাশে আমরা দাঁড়াবো, তাহলে কি সরকার মানা করত? করত না। বরং জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের স্পৃহা ও দরদ দেখে খুশি হতো। জনগণও বুঝত, আমরা সঠিক ব্যক্তিকেই আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছি, যিনি বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে আমাদের পাশে থাকেন।

চার.
করোনাকালে দেশে বেকারের সংখ্যা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা ছেড়ে অনেক মানুষ গ্রামে চলে যাচ্ছে। এদের মধ্যে এমন পরিবারও আছে যারা যুগের পর যুগ ঢাকায় বসবাস করছিলেন। করোনার ধাক্কায় বেকার হয়ে পড়া, আয় কমে যাওয়ায় তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, করোনায় রুটি-রুজি হারিয়ে দেশের কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। এমনিতেই দেশে আগে থেকে প্রায় চার-পাঁচ কোটি বেকার ছিল। এর সাথে নতুন করে এসব বেকার সংখ্যা যুক্ত হয়ে সংখ্যাটি মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকে নিয়ে গেছে। অতি দরিদ্র নিঃস্ব হয়ে পড়েছে, দরিদ্র অতি দরিদ্র হয়েছে, নিম্নবিত্ত দরিদ্রে এবং মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তে পরিণত হচ্ছে। এসব মানুষের দায়িত্ব সরকারের একার পক্ষে নেয়া সম্ভব নয়। সরকার বিভিন্ন সহায়তামূলক কার্যক্রম নিলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অথচ জনপ্রতিনিধিদের উচিত সরকারের নেয়া যতটুকু সহায়তামূলক কার্যক্রম নেয়া হয়েছে, তা সুষ্ঠুভাবে সাম্যের মাধ্যমে বাস্তবায়নে দিন-রাত পরিশ্রম করা। বেকার হয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহায়তা করা। মহাদুর্যোগের সময় জনপ্রতিনিধিদের অসহায় মানুষের পাশ দাঁড়ানোর এটাই সর্বোত্তম সময়। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিরা তাদের এই দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন হয়ে রয়েছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানো দূরে থাক, করোনার ভয়ে এবং এ থেকে বাঁচার জন্য নিজেরাই যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকে ঘরে বসে আছেন। অথচ জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা যে শপথ নিয়েছেন তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ই হচ্ছে, দেশ ও জনগণের সেবা করা। দেখা যাচ্ছে, তারা এ শপথ এবং জনগণ কর্তৃক তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না। যাদের সক্রিয় দেখা যায়, তাদের বেশির ভাগেরই যেন লক্ষ্য হয়ে পড়েছে, সরকারি সহায়তা নয়-ছয়ের মাধ্যমে কীভাবে নিজে এবং নিজ পরিবার-পরিজনের সহায়তায় কাজে লাগানো যায়।
[email protected]



 

Show all comments
  • jack ali ১১ জুলাই, ২০২০, ৫:৫৯ পিএম says : 0
    Our country is ruled by the Inhuman.. Allah created us and He knows what is better for Human Being.. so He gave us a Instructions Book [Qurán] .. we need to establish the Law of Allah then we will be able to live in our country in peace with human dignity..
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নির্বাচন

২৫ নভেম্বর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন