Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২০, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭, ১২ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

করোনায় শিশুর টিকা ব্যবস্থাপনা

| প্রকাশের সময় : ১০ জুলাই, ২০২০, ১২:০১ এএম

করোনায় নাকাল সারা বিশ্ব। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। এই স্লােগান পৌঁছে গেছে পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে। নিরাপত্তার স্বার্থেই সবাই ঘরে থাকতে চাচ্ছেন। বড়রা কাজের জন্য বের হলেও শিশুরা ঘরেই আছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সবই বন্ধ আছে। এমতাবস্থায় ছোট শিশুদের মা বাবারা চিন্তায় আছেন তাদের বাচ্চাদের টিকা নিয়ে। কারন দুই বছর বয়সের মধ্যেই সরকার প্রদত্ত ইপিআই এর টিকাগুলি দিতে হবে। ইউনিসেফ বলছে এপ্রিল মাসে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার শিশু টিকা পায়নি। তাই আগামী ৬ মাসে বাড়তি ২৮ হাজার শিশুর মৃত্যু আশংকা আছে।
কোথায় যাবেন টিকা দিতে:
করোনার প্রথম দিকে টিকা কেন্দ্রগুলি কিছুটা সীমিত পরিসরে খোলা থাকলেও ধীরে ধীরে সবই এখন খুলে দেয়া হয়েছে। প্রথম দিকে মা বাবারা ভয়েও অনেকে টিকা কেন্দ্রে যাচ্ছিলেন না। মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর বাড়িতে বা অন্য কারও বাড়িতে টিকা কেন্দ্র, সামাজিক দূরত্বের বিবেচনায় অনেক জায়গায় টিকা কেন্দ্র বসছিল না। এখন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে টিকা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
দেশের প্রতিটা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিন টিকা দেয়ার ব্যবস্থা আছে। আবার গ্রামের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড ভিক্তিক স্বাস্থ্যকর্মীরা মাসের কয়েক দিন টিকা দেন। জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিনই টিকা দেয়ার ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও সরকারের কাছ থেকে টিকা নিয়ে সিটি কর্পোরেশন, বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান, এনজিওরাও এই টিকা জনগনের মধ্যে বিতরণ করছে। সারাদেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্রে টিকা দেয়া হয়। তাই খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনার আশেপাশে কোথায় টিকা কেন্দ্র আছে বা আগে যে কেন্দ্রে দিয়েছিলেন তাদের কার্যক্রম চালু হয়েছে কি না।
টিকাগুলি কতদিন দেরিতে দেয়া যায়:
বাংলাদেশে ইপিআই শিডিউলের টিকা দেয়া শুরু হয় বাচ্চার বয়স ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন হলেই। তবে টিকা কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকলে সম্ভব হলে জন্মের দিনই বা ১৪ দিনের মধ্যেই বিসিজি ও পোলিও জিরো দেয়া যায়। এরপর একে একে সরকারি এই টিকাগুলি শেষ করতে ১৫-১৬ মাসের মধ্যে ৫ বার টিকা কেন্দ্রে যেতে হয়। মাঝে যেই বিরতিগুলি দেয়া হয় প্রয়োজনে তা বাড়ানো হয়, কিন্তু কমানো যায় না। অর্থাৎ কোন টিকা দরকারে একটু দেরিতে দেয়া যায়, কিন্তু আগে দিয়ে দেয়া যায় না। বাচ্চা অসুস্থ থাকলে, বাড়িতে না থাকলে বা অন্য কোন কারনে বিলম্বিত হলে পরে তা দিয়ে নিতে হবে। বাদ দেয়া যাবে না। যেমন এই করোনাকালে অনেকেই সময়মত টিকা দেননি। তাই আর দেরি না করে এখনই স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে যোগাযোগ করুন। যেভাবেই হউক ২ বছর বয়সের মধ্যে টিকাগুলি শেষ করার চেষ্টা করুন।
ইপিআইয়ের বাহিরের আর কোন টিকা এখন দেয়া যাবে কি:
হাঁ দেয়া যাবে। সরকার ইপিআইয়ের মধ্যে অতি জরুরী ১০ টি রোগের টিকা দিচ্ছে। এই টিকা গুলি দিলে যক্ষা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা জনিত রোগ, হাম, নিউমোকক্কাস জনিত নিউমোনিয়া ও রুবেলা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এর বাইরের আর কোন রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে, টিকা থাকলে তা নিতে হবে।
আর কি কি টিকা আমরা নিতে পারি:
দুইমাস বয়সের পর থেকেই ডায়রিয়ার টিকা দেয়া শুরু করতে হবে। ৬-৭ মাস বয়সের মধ্যেই ২-৩ ডোজ ডায়রিয়ার টিকা শেষ করতে হবে।
৬ মাস বয়সের পর থেকেই দেয়া যায় ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা। এই টিকা প্রতি বছরই নেয়া লাগতে পারে। যাদের নিজেদের শ্বাস বা বংশগত শ্বাস রোগের সমস্যা আছে তাদের এটি নিয়ে রাখা ভাল। এই করোনার সময়েও যাদের এই ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা নেয়া ছিল তাদের জটিলতা কম হওয়ার একটা সম্ভবনা আছে।
১ বছর বয়স হলেই হেপাটাইটিস এ ও চিকেন পক্সের টিকা দেয়া শুরু করবেন। হেপাটাটিস এ এর টিকা ১ টা নেয়ার ৬-১২ মাসের মধ্যেই ২য়টা নিতে হবে। আর চিকেন পক্সের ২য়টা স্কুলে যাওয়ার বয়স হলে নিতে হবে।
২ বছর বয়স হলে টাইফয়েড, মুখে খাওয়ার কলেরা ও মেনিনগো কক্কাল মেনিনজাইটিস টিকা নেয়া যায়।
কিশোরি বয়সের মেয়েদের ১৫ বছর বয়স থেকে ইপিআই কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে ধনুষ্টংকারের টিকা দেয়া হয়।
টিকা কিভাবে রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে:
ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস যে জীবাণুই মানুষের শরীরে ঢুকুক না কেন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুতই তাকে আক্রমণ করে। ফলে জীবাণু ধ্বংস করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমাদের বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি শক্তিশালী জীবাণুর বিরুদ্ধে হেরে যায় তবে আমরা অসুস্থ হয়ে যাই। আর টিকা হল মৃত বা অকার্যকর জীবাণু বা জীবাণুটার কোন অস্রকে শরীরের ভিতর আগেই ঢুকিয়ে তাকে চিনিয়ে রাখা। ফলে জীবিত জীবাণু শরীরে ঢুকার আগেই এন্টিবডি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরী হয়ে থাকে। এবার শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধের কারনে জীবাণু আমাদের পরাজিত করতে পারে না। আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়া মানুষের শরীরে তৈরী হওয়া এন্টিবডি সমৃদ্ধ প্লাজমা আজকাল অসুস্থ কোভিড রুগীদের দেয়া হচ্ছে, যাতে তারা তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে পারে। তবে এটা ক্ষণস্থায়ী, নিজের শরীরে এন্টিবডি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠলেই তা অধিক কার্যকর হবে।
টিকা না দিলে কি হবে:
অনেকেই হয়ত জানেন বাংলাদেশ টিকা দিয়ে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছে। যা বিশ্বের দরবারে প্রসংশিত হয়েছে। ইপিআই-এর টিকা না দিলে যেই ১০ টি রোগে সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশী মানুষ মারা যায় তা আবার বেড়ে যেতে পারে। করোনার কারনে এমনিতেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর প্রচুর চাপ। আপনি নিশ্চয়ই এসময়ে নতুন কোন রোগ নিয়ে হাসপাতালে যেতে চাইবেন না। এমনিতেই বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশ হাম নিয়ে চিন্তায় আছে। গত বছরও ইউরোপ সহ অনেক দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়েছিল। এটা আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন। করোনা না থাকলে সরকার হামের জন্য বিশেষ এনআইডি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল।
তাই টিকা দিয়ে নিজের বাচ্চাকে প্রতিরোধ করা যায় এমন রোগ থেকে নিরাপদ রাখুন, পরিবার, সমাজ ও দেশকে নিরাপদ রাখুন। আসুন টিকাকে হাঁ বলি, রোগকে না বলি।
ডা. জহুরুল হক সাগর
নবজাতক ও শিশু-কিশোর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ,
রূপসী বাংলা হসপিটাল,
শনির আখরা, কদমতলি, ঢাকা ১২৩৬।
ফোন: ০১৭২-৮৫৫৮৯৯৯, ০১৭৮-৭৭৪০৭৪০।
ইমেইল: zhsagar@google.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শিশুর-টিকা
আরও পড়ুন