Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১১ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

পেটের দায়ে ফুটবলার আরিফ এখন জোগালি!

স্পোর্টস রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৮ জুলাই, ২০২০, ৮:৩৯ পিএম | আপডেট : ৮:৪৯ পিএম, ১৮ জুলাই, ২০২০

মো. আরিফ হাওলাদার, ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) একজন খেলোয়াড় ছিলেন। যিনি মাত্র কিছুদিন আগেও ফুটবল খেলেই আয় করতেন লাখ লাখ টাকা। এখন এই করোনাকালে সেই আরিফই পেটের দায়ে কাজ করছেন রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। প্রচলিত বাংলায় যাকে বলে জোগালি। রাজমিস্ত্রির জোগালি এক সময়ের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার আরিফের আয় এখন দৈনিক ৪০০ টাকা। হাড়ভাঙা খাটুনির পর এই টাকা হাতে পেয়ে তিনি দুপুরের খাওয়া ও অন্যান্য বাবদ ১০০ টাকা খরচ করে বাকি ৩০০ টাকা ব্যয় করেন অসুস্থ্য বাবা-মা এবং ছোট ভাইয়ের পেছনে।

আরিফ হাওলাদার ২০১০ সালে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে ফিলিপাইনে খেলার পর ধীরে ধীরে বিকশিত হন। আক্রমণভাগের এই খেলোয়াড় ২০১৬ সালে নাম লেখান ঘরোয়া ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ আসর বিপিএলে। ওই বছর তিনি আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের হয়ে খেলে সবার নজর কাড়েন। ফলে বিপিএলের ২০১৭-১৮ মৌসুমে আরিফকে দেখা যায় শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের পক্ষে খেলতে। অবশ্য এর পরেই ছন্দপতন। বিপিএল থেকে আরিফের অবনমন ঘটে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে (বিসিএল)। ২০১৮-১৯ মৌসুমে বিসিএলে অগ্রণী ব্যাংকের হয়ে খেললেও ২০১৯-২০ মৌসুমে দল পাননি তিনি। এখান থেকেই শুরু তার দুঃস্বপ্ন। এরই মাঝে বিশ্বজুড়ে দেখা দেয় করেনাভাইরাসের প্রার্দুভাব। প্রাণঘাতি এই ভাইরাসের প্রভাব বাংলাদেশে পড়লে গত মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে বন্ধ হয়ে যায় অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরণের খেলাধুলা। প্রতিভাবান এই ফুটবলার যে পায়ে বল খেলতেন, তার সেই পা এই কারোনাকালে রক্তাক্ত জোগালির কাজ করতে গিয়ে।

আরিফদের আদিবাড়ি ভোলায়। তবে তার বাবা মো. শাহজাহান হাওলাদার সংসার নিয়ে থিতু হয়েছেন নারায়নগঞ্জে। এই শহরের ইসদাইরে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তারা। চার বোন, দুই ভাই আরিফরা। বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। আরিফের বাবা ৬টি ব্লক নিয়ে হার্ট স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে ঘরে। মা চোখের অসুখে ভুগছেন। মূলত আরিফ ও তার ছোট ভাই রাব্বি হাওলাদারের ফুটবল থেকে আয়েই চলতো তাদের সংসার।

কিন্তু ২০১৯-২০ মৌসুমে আরিফ ও রাব্বি দল না পাওয়ায় এবং দেশে করোনার প্রার্দুভাব দেখা দেওয়ায় তাদের আয়ের পথ বন্ধ। যে কারণে সংসার চালাতে প্রায় ৬ মাস ধরে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করছেন আরিফ। ছোট ভাই একটি চায়ের দোকান দিয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে মানুষ সেই চায়ের দোকানে না যাওয়ায় সেখান থেকেও কোন আয় নেই। দুই ভাই পিঠাপিঠি। আরিফের বয়স ২৬ বছর, রাব্বির ২৫। দুজনই এখন ফুটবলের বাইরে- বুটহীন। তাই সংসার আর চলছে না তাদের। দীর্ঘদিন ফুটবল খেললেও আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় মা-বাবার চিকিৎসা, ছোট ভাইয়ের দেখভাল ও করোনাকালে পরিবারের খরচ জোগাতে খুবই হিমশিম খেতে হয় আরিফকে। চরম অর্থ সংকটে থাকায় লুকিয়ে লুকিয়ে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করছিলেন। কিন্তু এক বন্ধুর পরামর্শে শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে লুকিয়ে রাখেননি। আরিফদের অসহায়ত্বের খবর জানতে পেরে কোচ কামাল বাবু ব্যক্তিগতভাবে কিছু সহায়তা করেছেন।

আরিফের অসহায়ত্ব নিয়ে কথা বলতে শনিবার তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে শুরুতে এড়িয়ে গেলেও পরে নিজের জীবনের করুণ চিত্র তুলে ধরেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে আরিফ বলেন, ‘আমাদের পরিবারের অবস্থা খারাপ ছিল না। ফুটবল খেলে নিজের জমানো টাকা বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। সেই টাকায় তিনটা বাসও (পরিবহন) কেনা হয়েছিল। বাসগুলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলত। হঠাৎ সেই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসায় চরম ক্ষতি হয়। বাবা স্ট্রোক করে বিছানায়। পুরো পরিবারের অবস্থা এখন বেহাল। মা চোখের সমস্যায় ভুগছেন। কারো কাছে হাত পাততে পারছিলাম না। গেল মৌসুমে দল পেলে হয়তো সমস্যা হতো না। তারওপর করোনার হানা। মা-বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতেই শেষ পর্যন্ত রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করতে হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন,‘আমাদের বড় সমস্যা এখন মাসে ৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া দেয়া আর বাবার ঔষধের টাকা। ছোট ভাইয়ের চায়ের দোকানে এখন মানুষ যায় না লকডাউনের কারণে। এখন যা আয় করি তা থেকে নিজে ১০০ টাকা খরচের পর দৈনিক যে ৩০০ টাকা থাকে সেটাই এখন আমার একমাত্র ভরসা। কারো কাছে হাতও পাততে পারি না। নারায়নগঞ্জের ডিএফএ’র কর্মকর্তারা নারী ফুটবলারদের কিছু সহায়তা করেছেন। কিন্তু আমরা যারা সমস্যায় আছি তাদের কেউ খবর নেননি। আগামী দিনগুলো কিভাবে কাটবে জানি না।’

বিপিএলের তিনটি দলের হয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের মাঠ মাতিয়েছেন যে ফুটবলার নিয়তি আজ তাকে বানিয়েছে রাজমিস্ত্রির জোগালি। যে পা দিয়ে আরিফ হাওলাদার দেশের জন্য ফুটবল খেলেছেন, তার সেই পা দিয়ে রক্ত ঝড়ছে ইট-বালু, সিমেন্ট আর রডের কাজ করতে গিয়ে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন