Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২০, ০১ ভাদ্র ১৪২৭, ২৫ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

ভারতে মুসলমানদের করুণ হাল

মোহাম্মদ আবদুল গফুর | প্রকাশের সময় : ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:০৩ এএম

গত রবিবার ৬ জুলাই ইনকিলাব-এর শেষ পৃষ্ঠায় একটি ছোট সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি আকারে ছোট হলেও এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ছিল বিশাল। সংবাদটির শিরোনাম ছিল: সবজি-বিক্রেতা পিএইচডিধারী। প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরের রাস্তার ধারে সবজি বিক্রি করতে বসেছিলেন। কিন্তু পৌরসভার লোকজন বাধা দিতেই তিনি পরিষ্কার ইংরেজিতে প্রতিবাদ করেন। আর এতে হতবাক বাধাদানকারীরা। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুগ্ধ হয়েছেন নেটিজেনরা। জানা গেছে, এই নারীর নাম ড. রাইসা আনসারী। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের বাসিন্দা তিনি। তার ইংরেজি শুনে সেখানে উপস্থিত সবাই শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা জিজ্ঞাসা করেন। সবজি বিক্রেতা নারী জবাবে জানান, তিনি ইন্দোরের দেবী অহল্যা বিশ^বিদ্যালয় থেকে মেটেরিয়েল সায়েন্সে পিএইচডি করেছেন। প্রতিবাদের সময় ইংরেজিতে বলেছেন, বাজার বন্ধ, ক্রেতাও নেই। আমি রাস্তার ধারে গাড়ি নিয়ে ফল ও সবজি বিক্রি করি। কিন্তু পৌরসভার লোকেরা সেটাও করতে দিচ্ছে না। আমার পরিবারের সদস্য ২০ জন। কী করে রোজগার করবো? কী খাব, কীভাবে বাঁচব? মেটেরিয়েল সায়েন্সে পিএইচডি করে কেন সবজি বিক্রি করছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আমার প্রথম প্রশ্ন, কে আমার চাকরি দেবে? অভিযোগ, করোনা মুসলমানদের কারণে বেড়েছে, এই ধারণা ভারত জুড়ে। যেহেতু আমার নাম রাইসা আনসারী। তাই কোনো কলেজ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান চাকরি দিতে রাজি নয়।

যে দেশের এক মুসলিম পিএইচডি ডিগ্রীধারী নারী সম্পর্কে বলা হলো, সে দেশটি এককালে বিশে^র বৃহত্তম গণতন্ত্র ও সেকুলার রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত ছিল। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের সংগ্রামে নেতৃত্ব দানের কারণে সে দেশের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী সেকুলার রাষ্ট্র নীতি পালনে দৃঢ় থাকার কারণে তিনি নাথুরাম গডসে নামের এক কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কর্মীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দান করলেও তিনি নিজে কখনও সরকারে অংশগ্রহণ করতেন না। সে কারণে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন পন্ডিত জওহরলাল নেহরু। এই পন্ডিত নেহরুও ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর মতই ধর্মনিরপেক্ষ ও অসম্প্রদায়িক নেতা। তার এই পরিচয় তার নিজের সম্পর্কে একটি উক্তিতেও প্রমাণিত হয়। তিনি নিজের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রমাণ হিসাবে বলতেন, আমি বিশ্বাসে খ্রিস্টান, সামাজিক চালচলনে মুসলিম এবং দৈবক্রমে হিন্দু।

স্বাধীন ভারতের প্রথম দিকের রাজনীতিতে নেতৃত্ব যারা দেন তাদের অনেকেই ছিলেন মুসলমান। এর প্রমাণ মওলানা আবুল কালাম আজাদ, অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর প্রমুখ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন ভারতের সেদিন আর নেই। এখন ভারতে শাসন চলছে বিজেপির, যার রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে গডসের রাজনৈতিক আদর্শের মিল ছিল। বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তাও প্রথম মেয়াদে নন, দ্বিতীয় মেয়াদে। প্রথম মেয়াদ শেষে দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারণাকালে হিন্দুপ্রধান ভারতের ভোটারদের এই বলে তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত করার আহবান জানানো হয় যে, মুসলমানদের দুর্বল ও নিষিদ্ধ করতে হলে নরেন্দ্র মোদিকে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনতে হবে। হিন্দুপ্রধান ভারতের জনগণ এই প্রচারণায় প্ররোচিত হয়ে নরেন্দ্র মোদিকে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত করেন।

এই যে দেশে রাজনীতির প্রধান ধারা, সেখানে মুসলিম পিএইচডি ডিগ্রীধারী সংসার চালাতে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী! প্রসঙ্গক্রমে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অতীত রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হবার আগে এক সময় তিনি নিজ রাজ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। গুজরাটের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সে রাজ্যে মুসলিমবিরোধী গণহত্যায় নেতৃত্ব দানের কারণে ‘গুজরাটের কসাই’ নামে কুখ্যাতি অর্জন করেন। অনেকেই একমত, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে মুসলিম দমন-পীড়ন-বঞ্চনা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ অবস্থায় ভারতের কোনো উচ্চ শিক্ষিত মুসলিম নাগরিকের যদি সবজি বিক্রি করে সংসার চালানো, তা যত দুঃখজনকই মনে হোক, স্বাভাবিক ব্যাপারই মনে করতে হবে।

ভারত যে এখন আগের অবস্থায় নেই, তা বুঝা যায় দেশটির একমাত্র মুসলিম প্রধান রাজ্য কাশ্মিরের ইতিহাস থেকেও। অবিভক্ত ভারতে বৃটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামকালে আজকের বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগের অন্যতম তরুণ নেতা ছিলেন। সে নিরিখে প্রথমে তিনি ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করেন, পরে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মর্মবাণী অনুসারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানে সফলতা অর্জন করেন।

পক্ষান্তরে কাশ্মিরের এককালের অবিসংবাদিত নেতা শেখ আবদুল্লাহ কংগ্রেস নেতা পন্ডিত নেহরুর সঙ্গে পারিবারিক পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ হবার সুবাদে নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রভাবে অখন্ড ভারতের সমর্থক হয়ে ওঠেন। অথচ মুসলিম প্রধান কাশ্মিরের জনগণ কিছুতেই হিন্দুপ্রধান ভারতের রাজনীতির মূল ধারার সমর্থক হয়ে উঠতে পারেননি। বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিজেপির মতো কট্টর সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী দলের হাতে যাওয়ায় শেখ আবদুল্লাহর বংশধরদের অবস্থাও হয়ে পড়েছে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের মতই দুঃখজনক। বর্তমানে ভারতে কট্টর সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী শাসন কায়েম হবার পর কাশ্মিরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অবস্থা হয়ে পড়েছে দুর্বিষহ। দ্বিতীয় মেয়াদে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবার পরপরই কাশ্মিরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। কাশ্মিরের মুসলিম জনগোষ্ঠিকে নানাভাবে পর্যদস্ত ও দুর্বল করে ফেলতে সেখানে বাড়ানো হয়েছে সেনা সংখ্যা।

এখন কাশ্মিরসহ সমগ্র ভারতেই চলছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মুসলিম বিদ্বেষী ও দমনমূলক শাসন। তারা শেষ পর্যন্ত কতদিন এ দুঃশাসন চালিয়ে যেতে পারবে এবং এর কোনো শুভ পরিবর্তনের মাধ্যমে বৃহত্তম সেকুলার গণতন্ত্রের মর্যাদা ভারতে ফিরে আসবে কিনা সেটা দেখার জন্যই আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে।



 

Show all comments
  • Ahmed Baker ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৪ এএম says : 0
    বাংলাদেশে চলে আসেন বোন ভালো থাকবেন ইনশাআল্লাহ
    Total Reply(0) Reply
  • Abdullah Islam ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৫ এএম says : 0
    আল্লাহ তুমি তাকে হেফাজত ও জীবন চলার রাস্তা করে দিন আমিন
    Total Reply(0) Reply
  • Monira Sultana ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৫ এএম says : 0
    আললাহ সব বিচার করবেন
    Total Reply(0) Reply
  • Md Kamrul ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৭ এএম says : 0
    মুসলিমদের ভাগ্যে কি হচ্ছে কি করুন পরিনতি । করনা সমগ্র বিশ্বে অথচ মুসলিমদের বিরুদ্ধে কত বড়ো শরোযনত্রো।
    Total Reply(0) Reply
  • Sowad Saffin ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৭ এএম says : 0
    সহযোগিতা কামনা করছি
    Total Reply(0) Reply
  • Rashed Hasan ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৭ এএম says : 0
    আল্লাহ হেফাজত করুন এই বোন মহাসয়কে।আমীন
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammed Kowaj Ali khan ৩০ জুলাই, ২০২০, ২:৩২ এএম says : 0
    ভারতের স্বাধীনতা অর্থই হইলো মোসলমানদের পারাধীনতা। গান্দি বলেন আর নেহেরু ওরা সবাই ধোকাবাজ। জাতে ছিলো বেঈমান। ইনশাআল্লাহ।
    Total Reply(0) Reply
  • nikoshiraj ৩০ জুলাই, ২০২০, ২:৫৪ এএম says : 0
    Ektu beshi e bola hoyeche , Bjp atota kharap na.
    Total Reply(0) Reply
  • monir gazi ৩০ জুলাই, ২০২০, ৬:৩১ এএম says : 0
    এটা ভারতের মুসলমানদের জন্য ঈমানের পরীক্ষা।আশাকরি ভারতের মুসলমানরা। আবার মাথা উচু করে দারাবে।
    Total Reply(0) Reply
  • monir gazi ৩০ জুলাই, ২০২০, ৬:৩১ এএম says : 0
    এটা ভারতের মুসলমানদের জন্য ঈমানের পরীক্ষা।আশাকরি ভারতের মুসলমানরা আবার মাথা উচু করে দারাবে।
    Total Reply(0) Reply
  • md anwar ali ৩০ জুলাই, ২০২০, ৬:৫৯ এএম says : 0
    হে আল্লাহ ! ভারতের মুসলমানদেরে তুমি তোমার কুদরতী হাতে হেফাজত কর।
    Total Reply(0) Reply
  • Mukherjee ৩০ জুলাই, ২০২০, ৯:৩৩ পিএম says : 0
    এটা অপপ্রচার। এখনো ভারতে ৯০% হিন্দু সেকুলার,বিশেষ করে বাঙ্গালীরা। যেখানে ভারতে অন্য ধর্মের ৮০% সেকুলার। আমরা যতমত ততপথ নীতিতে বিশ্বাসী । প্লিস আমাদের আর বিপদ বাড়াবেন না।আমাদের একসাথে থাকতে দিন।
    Total Reply(0) Reply
  • saif ৩ আগস্ট, ২০২০, ৪:১৩ পিএম says : 0
    মুসলমানদের ভাগ্যে যা ঘটছে তার জন্য মুসলমানরাও কি কম দায়ী?? খোদ ভারতেই মুসলমানদের মাঝে ঐক্য নেই, আমাদের দেশেতো দশ বছর আগে যা ছিল এখন তাও নেই, যদি ভুল না করি তা হলে আমাদের দেশে বর্তমানে ১৫০ টির মত দল আছেম, যার মধ্যে প্রায় ধর্মীয় দলই আছে ২০টির মত বা প্রত্যেক দল একে অন্যের বিরোধী, তাহলে আমদেরকে ভারত বা অন্য দেশ ধ্বংস করবেনা কেন???
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভারত

১৫ আগস্ট, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন