Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭, ১০ সফর ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

চামড়ার বাজারে ধস : ক্ষুদ্ধ আলেম সমাজ

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২ আগস্ট, ২০২০, ৫:০৬ পিএম | আপডেট : ৫:০৮ পিএম, ২ আগস্ট, ২০২০

চামড়াজাত পণ্যের দাম বাড়লেও প্রতিবছরই কমছে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবছর কোরাবনির ঈদের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়া দাম কমিয়ে পুনর্র্নিধারণ করে দেয়। আর এভাবেই গত সাত বছরে বছরে গরুর চামড়ার দাম কমে অর্ধেকের নিচে ও খাসি চারভাগের একভাগে নেমেছে।
সবমিলিয়ে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। একেবারে পানির দরে বিক্রি হয়েছে করবানির পশুর চামড়া। প্রকারভেদে প্রতিটি গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৪০০ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১০ টাকায় কেনা হয়েছে। তবে বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় নেয়া হয়। মূল্য কম হওয়ায় অনেক কোরবানিদাতা চামড়া বিক্রি না করে মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করেছেন। তবে পশুর চামড়ার দাম কম হওয়ার দুস্থরা বঞ্চিত হয়েছেন। এতে দেশের আলেম সমাজ ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার মূল্য ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। ওই সময়ে লবণযুক্ত ছাগলের চামড়ার বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে ২০২০ সালে লবণযুক্ত প্রতিবর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দাম মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় এবং প্রতি বর্গফুট ছাগলের চামড়ার ১৩ থেকে ১৫ টাকায় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। গত সাত বছরে গরুর চামড়া দাম কমেছে ৫৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। একই সময়ে ছাগলের চামড়ার দাম কমেছে ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৩ সালে ছাগলের চামড়া যে দামে পাওয়া যেত, ২০২০ সালে এসে গরুর চামড়া তার চেয়েও কম দামে পাওয়া যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ২০১৪ সালে কমিয়ে গরুর চামড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে পরপর দুই বছর প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ২০ থেকে ২৫ টাকায় নির্ধারণ করে দেওয়া ছিল। তবে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে টানা তিনবছর প্রতি বর্গফুট গরু চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। তবে ২০১৭ সালে ছাগলের প্রতিবর্গফুট চামড়া ২০ থেকে ২২ টাকায় নির্ধারণ করা হলেও ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তা আরও কমিয়ে ১৮ থেকে ২০ টাকা করা হয়। সর্বশেষ গত ২৬ জুলাই ২০২০ সালের কোরবানি ঈদের জন্য প্রতিবর্গফুট গরুর চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং ছাগলের ১৩ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে বেলা ১১টার পর থেকে চামড়া কেনাবেচা শুরু হয়। গরুর চামড়া ১০০ টাকা (গাভী) থেকে ৪০০ টাকায় (ষাঁড়) বিক্রি হয়। তবে বড় সাইজের গরুর চামড়া (২৫-৩০ বর্গফুট) ৫০০ থেকে ৫৫০টাকায় কেনা হয়েছে। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে, ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকায়। ভেড়ার চামড়ার দাম দেয়া হয়নি। বিক্রেতারা গরু বা ছাগলের চামড়ার সঙ্গে ফ্রি দিয়ে গেছেন।

রাজধানীর মগবাজারের ওয়্যারলেস এলাকার ট্রপিকেল হাউজিংয়ের ২৮টি আবাসিক ফ্লাটের বাসিন্দারা গত বছরের ইদুল আজহাতে ১৬টি গরু ও ৪টি ছাগল কোরবানি দিয়েছিলেন। এবার সেখানে মাত্র ৬টি গরু ও ২টি ছাগল কোরবানি দেওয়া হয়েছে। ট্রপিকেল হাউজিংয়ের বাসিন্দা আইনজীবী সগীর হোসেন বলেন, করোনার কারণে এখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দা যৌথভাবে কোরবানির আয়োজন করেছিলেন। তিনি বলেন, করোনার কারণে অনেকের আয় কমেছে। আবার অনেকের চাকরি ও ব্যবসা নেই। ফলে এই আবাসিক ভবনে কোরবানির এই অবস্থা।

আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির একজন বাসিন্দা জানান, গত বছর তাদের আবাসিক ভবনে ৬-৭টি পশু কোরবানি হয়েছিল। এবার সেখানে ৩টি কোরবানি হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার একাধিক মাদরাসা ও এতিম খানা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এবার বহু মানুষ কোরবানির চামড়া মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করেছেন। কিন্তু সেই সব চাড়মা মোকামে নিয়ে তারা বিক্রি করেছেন পানির দরে। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে পোস্তায় গিয়ে চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত পানির দরেই চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। দনিয়া এলাকার এক মাদরাসা সুপারিনটেনডেন্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চামড়া ব্যবসায়িরা তো ঠিকই লাভ করবেন। মাঝখান থেকে আমরা ঠকলাম। বঞ্চিত হলার ন্যায্য দাম থেকে। এ নিয়ে আলেম সমাজ ক্ষুদ্ধ ও হতাশ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে এবারের কোরবানিতে। রাজধানীর চামড়ার ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা বলেছেন, গতবারের চেয়ে এবার অর্ধেকরও কম পরিমাণ চামড়া তারা সংগ্রহ করছেন বেপারিদের কাছে বিক্রির জন্য। বেগুনবাড়ি এলাকার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম পিন্টু ও সাইফুদ্দিন। গত বছর তারা দুইজনে প্রায় এক হাজার গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। এবার মাত্র ৪০০টি চামড়া সংগ্রহ করেছে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, সারাদেশে গতবারের তুলনায় অর্ধেক কম পরিমাণ চামড়া কেনার লক্ষ্য রয়েছে চামড়া ব্যবসায়ীদের। যেকারণে চামড়ার দাম এবার কম। গত বছর যে চামড়া কেনা হয়েছিলো দিয়েই কাজ এবার কাজ করেত চাই।
এদিকে কোরবানির গরু-ছাগলের চামড়ার কেনাবেচা নিয়ে বিক্রেতা ফরিয়া ও বেপারি, তিনপক্ষই অসন্তুষ্ট। বিক্রেতারা বলছেন, সরকারের নির্ধারিত মূল্য পাচ্ছেন না তারা। ফরিয়ারা বলছেন, যে দামে বিভিন্ন মহল্লা থেকে চামড়া কিনেছে, সেই দামে বেপারিদের কাছে বিক্রি করতে পারছেন না।

আর বেপারিরা বলছেন, যে দামে চামড়া কেনার কথা সে দামে পাচ্ছেন না তারা। চামড়ার বাজারের এই অবস্থার কারণে অনেকেই তাদের পশুর চামড়া বিভিন্ন এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংকে বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছেন। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পশু কোরবানির যে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে তাতেও উপরের কারণগুলোই স্পষ্ট। করোনা আর ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের বকেয়া।



 

Show all comments
  • ম নাছিরউদ্দীন শাহ ২ আগস্ট, ২০২০, ১০:৪৬ পিএম says : 0
    আমাদের দেশের ব‍্যবসায়ী সমাজ বাংলাদেশের পশুর চামড়ার আন্তর্জাতিক মানের চামড়া প্রক্রিয়াজাত করন প্রতিষ্টান গড়ে উঠেনি। লক্ষ লক্ষ পশুর চামড়া সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও মৌসুমী ব‍্যাবসায়ী ট‍্যানারী মালিকরা চামড়া খরিদ করে। ঋণখেলাপি সহ নানান জটিলতার মাঝেই চামড়ার ব‍্যাবসা। কোরবান আসলেই যতকথা।বর্তমান চামড়া শিল্পের উন্নয়ন প্রক্রিয়াজাত করন প্রয়োজনীয় অর্থের ফান্ড পরিকল্পনা যতাযত কতৃপক্ষ সরকারের সাথে গঠনমুলক আলোচনা করা এখন জরুরী। অতিথের ইতিহাস বাদ নতুন উদ্যোগ উর্দিপনা নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প কে বাচান। ক্ষুদ্ধ আলেম ক্ষুদ্ধ ব‍্যাবসায়ী ক্ষুদ্ধ সাধারণ মানুষ। চামড়ার বাজারে ধস। শিরোনাম হবে প্রতিবসর কিছুই হবেনা। পরিকল্পনা নিন সিদ্ধান্ত নিন। ঐক্যবদ্ধ হোন। আল্লাহ্ আপনাদের সহায় হোক।
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammed Shah Alam Khan ২ আগস্ট, ২০২০, ১১:২৬ পিএম says : 1
    আমি আমার বহু বছর ধরে দেখে আসছি চামড়ার ব্যাবসায়ীরা বা টেনারীর মালিক গণ তাদের জীবনে খুব একটা ভাল করতে পারছেনা। এর কারন আমার মনে হয় এই কোরবানীর পশু কিনতে গিয়ে স্বাভাবিক বাজার থেকে প্রচুর কম দামে চামড়া ক্রয় করে এরা এতিমদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আল্লাহ্‌ নিশ্চয় এইকারনে এদের প্রতি খুশী হতে পারেন না। তাই এনাদেরকে আল্লাহ্‌ সেভাবে উন্নত করেন না এটাই আমার বিশ্বাস। ৩৪ বছর আগে আমি যখন দেশে ছিলাম আমি দেখিনি কোরবানীর পশুর চামড়ার মূল্য খুব একটা কমে যেতে। প্রচুর চামড়া সরবরাহ হওয়ায় মূল্য কিছুটা কমতো যানাকি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখন যেভাবে মূল্য কমে যায় এটা ভাবাই যায়না। চামড়ার ব্যাবসায়িরা যদি এতিমদের কথা ভাবে এবং চামড়ার মূল্য নিয়ে ছিনিমিনি না করে তাহলে মহান আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি সদয় হবেন এটাই স্বাভাবিক। মহান আল্লাহ্‌র কাছে আমার প্রার্থনা তিনি যেন আমাকে সহ সবাইকে এতিমদের প্রতি সদয় হবার উপযুক্ততা দান করেন। আমিন
    Total Reply(0) Reply
  • md anwar ali ৩ আগস্ট, ২০২০, ৭:০৮ এএম says : 0
    পাঠ, ধান এবং চামড়া শিল্প শেষ, এবার আল্লাহই হলেন গরীবের শেষ রক্ষা ।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ