Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭ আশ্বিন ১৪২৭, ০৪ সফর ১৪৪২ হিজরী

৫ আগস্টকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজয় দিবস হিসাবে দেখছে বিজেপি

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৬ আগস্ট, ২০২০, ৭:১২ পিএম | আপডেট : ৭:১৩ পিএম, ৬ আগস্ট, ২০২০

গত সাত দশক ধরে কাশ্মীর ইস্যুটি মূলত রাজনৈতিক বিষয় হিসাবেই থেকেই গেছে। ভারত সমর্থক, স্বাধীনতাপন্থী বা পাকিস্তানপন্থী সব রাজনৈতিক দলগুলোই কাশ্মীর সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই কাশ্মীরের বিষয়ে জাতিসংঘের সুরক্ষা কাউন্সিলের (ইউএনএসসি) রেজোলিউশনের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যরা হয় ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বা ভারতীয় সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে সমাধান চেয়েছে।

এর মানে হচ্ছে সব দলই কাশ্মীরকে একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে দেখছেন, যার একটি ন্যায্য সমাধান দরকার। অবশ্যই, সম্ভাব্য সমাধানের রূপরেখা নিয়ে প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন মতামত ছিল। যাইহোক, গত বছরের ৫ আগস্টে যা ঘটেছে তার ফলে, অঞ্চলটি নিয়ে বাস্তবতা এবং রাজনীতির উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন ঘটেছে। এখন কাশ্মীর ইস্যুতে আদর্শ, পরিচয়, ডেমোগ্রাফি, আধিপত্য, মর্যাদা এবং বেঁচে থাকা, সব কিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

কাশ্মীরের ভারত-সমর্থক রাজনীতিবিদরা মানতে রাজি নয় যে, জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে এবং এই অঞ্চলটিকে দ্বিখণ্ডিত করে দুটি কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করার ‘একতরফা, অবৈধ এবং অসাংবিধানিক’ সিদ্ধান্ত নিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একটি মাষ্টার স্ট্রোক দিয়ে এর ‘মূলধারাকে হত্যা’ করেছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদটি বাতিল করার পরে একটি বছর কেটে গেছে। ৩৫-এ অনুচ্ছেদে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভার হাতে অঞ্চলটির স্থায়ী বাসিন্দাদের সংজ্ঞায়িত করা, তাদেরকে জমি ও স্থাবর সম্পত্তি কেনা এবং কর্মসংস্থান ও সহায়তার মতো নির্দিষ্ট অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। কোনও ভারতীয় নাগরিকের জন্য সেখানে জমি কিনতে বা স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে বসতি স্থাপনের অনুমতি ছিল না। ৩৫-এ ধারা বাতিল হওয়ায় সমস্ত ভারতীয় নাগরিকরা এখনই সেখানে বসতি স্থাপন করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণের পরে সেখানে জমি ও সম্পত্তি কিনতে পারবেন।

এর বাইরে বিভিন্ন আইনের নতুন সংশোধনীগুলো ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জম্মু ও কাশ্মীরের যে কোনও অঞ্চলকে ‘কৌশলগত’ হিসাবে ‘অবহিত’ করার এবং সেখানে স্থায়ী নির্মাণকাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে। কাশ্মীরে ভিত্তিক সমস্ত রাজনৈতিক সংগঠনগুলো একে ‘ইস্রায়েলি ধাঁচে জনবসতি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা হিসাবে অভিহিত করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক সুবিধা বাতিলের সাথে সাথে ন্যাশনাল কনফারেন্স (জেকেএনসি) এবং পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) মতো আঞ্চলিক দলগুলো অপমানিত এবং বিশ্বাসঘাতকতা বোধ করছে। ব্যক্তিগতভাবে তারা স্বীকার করে যে, তারা কাশ্মীর ইস্যুতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

সর্বদলীয় হুরিয়াত সম্মেলন (এপিএইচসি), স্বাধীনতাপন্থী এবং পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, আইনজীবি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ভারতের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, সেখানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার অবাধ আন্দোলনে অভূতপূর্ব বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক কর্মী, আইনজীবী, সুশীল সমাজের সদস্য এবং যুবকসহ কয়েক হাজার কাশ্মীরিকে কারারুদ্ধ করেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে টলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সেখানে ৭ হাজার ৩৫৭ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে, শ্রীনগরে অবস্থিত বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠন জম্মু ও কাশ্মীর কোয়ালিশন ফর সিভিল সোসাইটির (জেকেসিসিএস) মতে, গত এক বছরে ১৩ হাজারেরও বেশি কাশ্মীরিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বেশ কয়েক মাস ধরে পুরো উপত্যকা সম্পূর্ণ অবরোধ করে রাখা হয়েছিল এবং গণতন্ত্র ও উন্নয়নের নামে সমস্ত নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত করা হয়েছিল। সকল ধরণের যোগাযোগ সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কেউ যাতে অত্যাচারের কথা প্রকাশ করতে না পারেন তার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া ইতালীয়ান ইহুদি প্রিমো লেভি তার ‘ইফ দিস ইজ ম্যান’ বইয়ে তার ঘটে যাওয়া সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বন্দী শিবির আউশভিটসে তাকে পানি খেতে দেয়া হতো না। প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তিনি জানালার বাইরে বরফ জমে থাকতে দেখেন। সেখান থেকে তিনি একটি বরফের টুকরা ভেঙ্গে নিতেই একজন গার্ড ভেতরে ঢুকে তার হাত থেকে সেটি ছিনিয়ে নেন। তিনি জার্মান ভাষায় তাকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন? গার্ড তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে উত্তর দিয়েছিল, ‘এখানে কেন বলে কিছু নেই।’

লেবির শক্তিশালী চিত্রায়ন সহজেই আজকের কাশ্মীরে হতাশার অবস্থা ব্যাখ্যা করতে পারে। এটি বোধগম্য যে, হতাশাগ্রস্থ কাশ্মীরিরাও পাকিস্তানের প্রতিও অসন্তুষ্ট। তাদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, পাকিস্তান যদি তাদের পক্ষে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতে না যায়, তবে কীভাবে তারা বন্দী অবস্থা থেকে স্লোগান, পাথর এবং অব্যাহত আত্মত্যাগের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তিধর সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করবে?

মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, চরম ভয়ের মধ্যে থাকলে মানুষের সামনে কেবল তিনটি উপায় থাকে। পালানো, ভয়ে জমে যাওয়া এবং লড়াই। কাশ্মীরের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, গত এক বছরে জনগণ এবং রাজনীতিবিদরা ভয়ে জমে যাওয়া অবস্থায় রয়েছেন। কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে তা নিয়ে অনেকেই অনিশ্চিত। জর্জ অরওয়েল ১৯৮৪ সালে তার মহাকাব্যিক উপন্যাস যেভাবে কল্পনা করেছিলেন তার থেকে কাশ্মীরের পরিস্থিতি আলাদা নয়। আক্ষরিক অর্থেই নির্বাচিত কয়েকজন আমলা এবং উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এই অঞ্চলের আইন ও ভাগ্য নিয়ন্ত্রক। শ্রীনগর ভিত্তিক প্রভাবশালী বাণিজ্য সংস্থা কাশ্মীর চেম্বার অব কমার্সের (কেসিসিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে কাশ্মীরের ৫৩০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্যটন খাতের সাথে যুক্ত কয়েক হাজার তরুণ তাদের চাকরি হারিয়েছে এবং অনেকগুলো বিনিয়োগকারীরা সংস্থা মূলধন হারিয়েছে।

ভারত সরকার কাশ্মীরের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর মুখও বন্ধ করে দিয়েছে। সংবাদপত্রগুলো ৫ আগস্টের পদক্ষেপের পর থেকে আর কাশ্মীরের জ্বলন্ত পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ, সম্পাদকীয় এবং মন্তব্য কলাম লেখার সাহস পায়নি। নেতৃত্বের সংকটের মতো, স্থানীয় গণমাধ্যমের আত্মসমর্পণও ছিল হতাশার। এ বিষয়ে একজন প্রবীণ সাংবাদিক কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘কাশ্মীরের একমাত্র রাজনৈতিক দল হচ্ছে পুলিশ।’

সদ্য চালু হওয়া জম্মু ও কাশ্মীরের মিডিয়া পলিসি ২০২০ এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কফিনে চূড়ান্ত পেরেক ঠুকে দেয়া হয়েছে। খুন হয়েছে সাংবাদিকতা। নীতিমালায় জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসনের তথ্য ও জনসংযোগ দফতরের একজন কেরানী বা আমলাকে যে কোনও সম্পাদক, সংবাদপত্রের স্বত্বাধিকারী এবং সাংবাদিককে ‘অনৈতিক, দেশবিরোধী, রাষ্ট্রদ্রোহী’ লেখার জন্য দায়বদ্ধ করা ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের অবারিত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক ডজন সাংবাদিককে নিয়মিত রিপোর্ট করার জন্য বিভিন্ন থানায় তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অবৈধ কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন এবং ভারতীয় দন্ডবিধির (আইপিসি) বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে পুরষ্কারসহ বিজয়ী মহিলা ফটো সাংবাদিক মাসরাত জেহরাসহ ছয়জন বিশিষ্ট কাশ্মীরি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।

এদিকে, ভারতের ক্ষমতাসীন কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি স্বাধীনতা দিবসের (১৫ আগস্ট) চেয়ে ৫ আগস্টকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। গেরুয়া দলটি এই দিনটিকে ভারতীয় ও কাশ্মীরি মুসলমানদের উপর হিন্দুদের বিজয়ের দিন হিসাবে দেখছে। গত বছরের ৫ আগস্ট কাশ্মীর ‘বিজয়ে’র পর চলতি বছরের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জায়গায় বিতর্কিত রামমন্দির নিমার্ণের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কাশ্মীরের অনেকে মনে করেন যে, করোনা মহামারি ও অন্যান্য বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও এই অনুষ্ঠানের জন্য ৫ আগস্ট বেছে নেয়া ইচ্ছাকৃত। তাদের দৃষ্টিতে, বিজেপি কাশ্মীরের পরে এবার একই দিনে সমগ্র ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিজয়ের আরেকটি বার্তা দিচ্ছে। সূত্র: ডন।



 

Show all comments
  • aakash ৬ আগস্ট, ২০২০, ৮:৩৭ পিএম says : 0
    Jay sree Ram
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ