Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

বন্যা ও নদী ভাঙনে দিশেহারা মানুষ

প্রধানমন্ত্রীর শঙ্কাই সত্য হচ্ছে

ইনকিলাব রিপোর্ট | প্রকাশের সময় : ১৮ আগস্ট, ২০২০, ১২:০০ এএম

ভাদ্রের শুরুতেই চতুর্থ দফা বন্যার কবলে দেশ। ভাদ্র মাসের এ বন্যার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগেই সতর্ক করেছেন। তাই এ বন্যা মোকাবিলায় পুরো প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। দেশের ৩৩ জেলায় চলমান বন্যা এরই মধ্যে ৫২ দিন পেরিয়ে গেছে। গত সপ্তাহে পানি কিছু এলাকায় কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহে মৌসুমী বায়ুর প্রবাহে দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাত এবং উজানে অতিবর্ষণের ফলে ব্রহ্মপুত্র-যমুনাসহ দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর পানি আবার বাড়ছে। এতে ফের বন্যার কবলে পড়ছে দেশ।
এবারের দীর্ঘ বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি নদী ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত ৩৩টি জেলা। বন্যার্তদের চোখের পানি আর বানের পানি একাকার হচ্ছে। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙনে সর্বহারা মানুষের দুঃখ-কষ্ট অবর্ণনীয়। পদ্মার তীব্র ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে- বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুলসহ আরও অনেক স্থাপনা। অনেকে বসতভিটা জমি-জমা সব হারিয়ে হয়েছে সর্বহারা। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ। মাদারীপুর ও শরিয়তপুরে পদ্মার তীব্র ভাঙনে গৃহহারা হচ্ছে অনেক মানুষ। সিরাজগঞ্জে চৌহালীতে যমুনার ভাঙনে দিশেহারা নদী তীরের মানুষ। টাঙ্গাইলেও ভাঙছে যমুনা। খুলনা এলাকায় উপক‚লের বেড়িবাঁধ ভাঙছে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তার ভাঙন দিশেহারা মানুষ। কুড়িগ্রামে ভাঙছে ধরলা নদী।
চট্টগ্রাম থেকে শফিউল আলম জানান, দেশের প্রধান নদ-নদীসমূহের উজানে অতিবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। অতিবৃষ্টিতে ভারত থেকে ক্রমাগত আসছে ঢল। খুলে দেয়া হয়েছে সেখানে অনেকগুলো বাঁধ-ব্যারেজ। ভারত ছাড়াও তিব্বতসহ চীন, নেপাল, হিমালয় পাদদেশে অতিবৃষ্টি ও ঢলের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরেও বেড়েছে বৃষ্টিপাতের মাত্রা। ১৯৯৮ সালের পর স্মরণকালের দীর্ঘতম সময় ৫২ দিন ধরে চলছে সর্বনাশা বন্যা। ঢল-বন্যা-নদী ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত ৩৩টি জেলা। দীর্ঘস্থায়ী এ ভয়াবহ বন্যার পানি ভাটির দিকে না নামতেই নদ-নদীতে আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে পানি।
ভারতের ঢলে পদ্মা ও যমুনা নদী বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। উভয় নদ-নদীর পাড়ে ফের বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। ব্রহ্মপুত্র এবং গঙ্গাসহ এর সঙ্গে যুক্ত নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়ছে কমবেশি প্রতিদিনই। তাছাড়া মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে অতিবৃষ্টিতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, ফেনী, পার্বত্য চট্টগ্রামের খরস্রোতা নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে পাউবো।
বিপরীতমুখী মৌসুমী বায়ুচাপ তীব্র হওয়ায় উত্তর বঙ্গোপসাগর এখন উত্তাল রয়েছে। এ কারণে দেশের নদ-নদীগুলো দিয়ে ভাটির দিকে সমুদ্র উপক‚লভাগ হয়ে বানের পানি হ্রাস পাওয়ার স্বাভাবিক গতি থমকে যাচ্ছে। দেশে বন্যা যতই দীর্ঘস্থায়ী ও প্রলম্বিত হচ্ছে ততই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে অনেক এলাকায় নদীভাঙন। জনবসতি, ফসলিজমি, নিজস্ব ঠিকানা হারিয়েছে হাজার হাজার পরিবার। বন্যার্তদের চোখের পানি আর বানের পানি একাকার। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙনে দিশেহারা ছিন্নমূল মানুষের এ মুহূর্তে দুঃখ-কষ্ট অবর্ণনীয়। খাদ্য, ওষুধসহ জরুরি ত্রাণ চাই, ত্রাণ নেই। নেই গৃহনির্মাণ সামগ্রী।
গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে নদ-নদীর পানি প্রবাহের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তে জানা গেছে, দেশের অনেকগুলো প্রধান নদ-নদীতে বাড়ছে পানি। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদের সবকটি পয়েন্টে পানি আরও বেড়ে গেছে। যমুনা নদে গতকাল বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে পানি আরো ৬ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। যমুনার অপর ৫ পয়েন্টে পানি বেড়ে গিয়ে স্থানভেদে বিপদসীমার ১০ থেকে ৩১ সে.মি. নিচে অবস্থান করছে।
গতকাল ব্রহ্মপুত্র নদে পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৯ এবং চিলমারীতে ৪২ সে.মি. নিচে প্রবাহিত হচ্ছে।
গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীতে গতকাল সকাল পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি পায়। আবার বিকেলের দিকে স্থিতিশীল অবস্থায় আসে। পদ্মার পানি গোয়ালন্দে আরও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১০ সে.মি. ঊর্ধ্বে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার ভাটিতে ভাগ্যকুল, মাওয়া ও সুরেশ^রে গতকাল পানি কিছুটা কমেছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আপার মেঘনা অববাহিকায় বৃহত্তর সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারাসহ নদ-নদীসমূহে পানির সমতল দুয়েক জায়গায় কিছুটা বাড়লেও সার্বিকভাবে হ্রাস অথবা স্থিতিশীল রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায় গুর, আত্রাই, ধলেশ^রী এবং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের নদ-নদীগুলোর পানি হ্রাসের দিকে রয়েছে। গুও ধলেশ^রী নদীর পানি বিপদসীমার কিছুটা ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ এবং ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ পৃথক পূর্বাভাসে জানায়, বর্ষার মৌসুমী বায়ু বর্তমানে সক্রিয় থেকে জোরাল অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার উজানভাগে উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম, অরুণাচল, সিকিম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরামে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। গতকাল ২৪ ঘণ্টায় আসামের চেরাপুঞ্জিতে ১১৮ মিলিমিটার বর্ষণ অর্থাৎ অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ অবস্থায় ভারত থেকে উজানের ঢলে-বানের তোড়ে বন্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
দেশের নদ-নদীসমূহের ১০১টি পানির সমতল পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে গতকাল ৫৩ পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি, ৪৫টিতে হ্রাস পায়। অপরিবর্তিত থাকে ৩টিতে। ৪টি নদ-নদী ৪টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা আগামী ২৪ ঘণ্টায় স্থিতিশীল থাকতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা নদীসমূহের পানির সমতল স্থিতিশীল আছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার অধিকাংশ নদীর পানির সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল এবং দক্ষিণ-মধ্য অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এরফলে এসব অঞ্চলে নদ-নদীসমূহের পানির সমতল দ্রæত বৃদ্ধি পেতে পারে।
টাঙ্গাইল থেকে আতাউর রহমান আজাদ জানান, যমুনাসহ সকল নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চতুর্থ দফা বন্যাতঙ্কে ভুগছে মানুষ। ধলেশ্বরী ও বংশাই নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বাসাইল, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর ও মির্জাপুর উপজেলার হাজার হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি রয়েছে। পানির নিচে রয়েছে অনেক রাস্তাঘাট। ফলে চলাচলে বেড়েছে দুর্ভোগ। খাদ্য সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে অনেক পরিবারের।
মুন্সীগঞ্জ থেকে মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। গত কয়েকদিন যাবৎ পদ্মা নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে উঠা-নামা করছে। নিম্নাঞ্চল থেকে পানি না নামায় শ্রীনগর এবং লৌহজংয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের প্রায় ৩ শত পরিবার বাড়ি ফিরতে পারছে না। শিশুরা বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বন্যার পানিতে রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। শ্রীনগর-দোহার, মাওয়া-কান্দিপাড়া সড়কসহ গ্রামাঞ্চলের কাঁচা-পাকা সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শরীয়তপুর থেকে মো: হাবিবুর রহমান হাবীব জানান, পদ্মা নদীর প্রবল স্রোতে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। তীররক্ষা বাঁধের তলদেশ থেকে জিওব্যাগ ও সিসি বøক সরে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন নিয়ন্ত্রণে জিওব্যাগ ডাম্পিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ঐতিহাসিক সুরেশ্বর দরবার শরীফ রক্ষা বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দরবার শরীফ ও আশপাশের বসতবাড়ি নতুন করে ভাঙনের শঙ্কায় রয়েছে। ভাঙন রোধে জিওব্যাগ ডাম্পিং চলছে।
লক্ষীপুরের রামগতি থেকে আমানত উল্লাহ জানান, মেঘনা নদী, এখন এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম। রামগতি ও কমলনগরে মেঘনা ব্যাপক ভাঙছে। মেঘনার করাল গ্রাসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে জমিজমা ও বসতভিটা। বহু মানুষ তাদের সবকিছু হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিছে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
শেরপুর থেকে মো: মেরাজ উদ্দিন জানান, এবারের বন্যায় শেরপুর জেলায় মৎস্য চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষিরা পড়েছে বেকায়দায়। অনেক চাষী ব্যাংক ঋণ ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মাছের চাষ করলেও তাদের মাছ ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। এতে অন্তত ১ কোটি ৯১ লাখ ৩২ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। মৎস্য চাষিদের দাবি- সরকার যাতে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তা করে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বন্যা

২ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন