Inqilab Logo

রোববার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২২ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

ত্যাগী নেতাদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি তৃণমূলের

কুমিল্লা উত্তর বিএনপি

প্রকাশের সময় : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা উত্তর থেকে : সুবিধাভোগী ও শাসকদলের সাথে আঁতাতকারী নেতাদের অপতৎপরতায় চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি। এখানকার ৭টি উপজেলা ও ৩টি পৌরসভা বিএনপির অবস্থাও তথইবচ। বিএনপির এসব ইউনিটের সর্বশেষ সভা কবে অনুষ্ঠিত হয়েছে কেউ বলতে পারে না। কোন কোন কমিটির তালিকায় কে কোথায় আছে, তাও অনেকে জানে না। বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কুমিল্লা জেলা। সেই ’৭৯ সাল থেকে কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কুমিল্লা জেলা তথা সকল উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপিকে তিল তিল করে শেকড় থেকে সাজিয়েছেন। এরপর ৯১ সালে হোমনা থেকে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার। এই দুই নীতিনির্ধারক মিলে এ অঞ্চলের উন্নয়ন ও বিএনপির রাজনীতিকে শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং একটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেন। অবহেলিত হোমনাকে এমকে আনোয়ার এক আধুনিক শহরে পরিণত করেছেন। এদিকে ড. মোশাররফ হোসেন তিতাস উপজেলা ও দাউদকান্দি পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি এখন হযবরল অবস্থায় নিপতিত। শাসক দলের দমন-পীড়ন, দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের এলাকায় অনুপস্থিতি, তদারকির ঘাটতি, জেলা, উপজেলা ও পৌর কমিটির সিনিয়র নেতাদের গা-ছাড়া ভাব, কারও দলত্যাগ, কারও শাসক দলের সাথে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে আঁতাত এবং মিলেমিশে বিগত দিনের অর্জিত সম্পদ রক্ষাসহ নানা কারণে কুমিল্লায় বিএনপির এখন পক্ষাঘাত অবস্থা বিরাজমান। তবে তৃণমূলে মাটি কামড়িয়ে এখনো যারা বিএনপিকে ধরে রেখেছে, তারা দলের এই বেহাল দশার জন্য মূলত সুবিধাভোগী অকৃতজ্ঞ নেতাদের দায়ী করেছেন। আগামী মার্চে অনুষ্ঠিতব্য কাউন্সিলকে সামনে রেখে ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী অকৃতজ্ঞ নেতারা মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। তারা ভবিষ্যৎ সুদিনের আশায় স্বপদে বহাল থাকা অথবা দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে লবিং শুরু করেছেন। তৃণমূলের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বিএনপির শাসনামলে যে সব নেতা এমপি-মন্ত্রীদের ব্যবহার করে কাড়িকাড়ি টাকা হাতিয়েছেন, আন্দোলন সংগ্রামে তাদের মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখনও নেই। এই মহারথিদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই। অথচ উনারা এলাকায় প্রচার করে বেড়াচ্ছে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অমুক পদে, তমুক পদে অধিষ্ঠিত রয়েছে। অবস্থাটা এ রকম, গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল। কারণ তৃণমূলের সাথে তাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তারা  বিএনপিতে ভাল অবস্থান পেতে আদাজল খেয়ে নেমেছে। কুমিল্লায় বাড়ী এমন কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারক সিনিয়র নেতাদের কমিটি গঠন বিষয়ে তীক্ষè দৃষ্টি দিতে হবে। তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে জেলা, উপজেলা ও পৌর বিএনপির কমিটি সাজাতে হবে। অগ্রহণযোগ্য ও তৃণমূলের সাথে সম্পর্ক নেই, এমন ব্যক্তিদের নিয়ে বিএনপির কমিটি গঠিত হলে তারা গণরোষের শিকার হবে। এইসব চিহ্নিত ব্যক্তি দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে কোটি কোটি টাকা রোজগার করেছে। এখন আ.লীগের সাথে আঁতাত করে মামলামুক্ত থাকছে এবং দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, অবৈধভাবে গড়ে তোলা সেই সহায়-সম্পদ টিকিয়ে রাখছে। নিজ দলের প্রতি তাদের কোন দরদ নেই। কুমিল্লা উত্তর জেলা, দাউদকান্দি, মেঘনা, তিতাস, হোমনা, দেবিদ্বার, চান্দিনা ও মুরাদনগর উপজেলা এবং দাউদকান্দি, চান্দিনা ও হোমনা পৌরসভা বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ দলীয় সমর্থকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, শাসক দলের অনুগত হয়ে নিজ দলের সাথে বেঈমানী করে ব্যবসা, ধন-সম্পত্তি রক্ষা, মামলা, হয়রানি নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশের বাড়ী বৃহত্তর দাউদকান্দিতে। বিএনপি সরকারের সময়ে ওই মোনাফেকরা বিভিন্ন তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন। তারাই এখন দলের আদর্শবোধ ভুলে গেছে। এই ষড়যন্ত্রকারীরা এখন বিএনপিতে ভাল পদ দখলে নিতে কেন্দ্রে লবিং চালাচ্ছেন। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এদিকে  ৫ জানুয়ারী সরকার বিরোধী আন্দোলনের অবরোধÑহরতালের শুরুতেই জেলা ও উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা আত্মেœাগোপনে চলে যায়। এর মধ্যে অনেক নেতা ইউরোপে পাড়ি জমায়। তারা এখনও ফেরেনি। কিন্তু বিএনপির কাউন্সিলকে সামনে রেখে পদ ভাগিয়ে নিতে তদবির অব্যাহত রেখেছে বলে বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, দলের দুই শীর্ষ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও এমকে আনোয়ারের প্রতি এই দাবি জানান যে, দলের চরম দু:সময়ে যেসব ব্যক্তি বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকেছেন, আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি, পর্দার আড়ালে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, শাসক দলের সাথে আঁতাত ও নানা সুবিধা নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, চীন, ব্যাংককে পালিয়ে আয়েশে সময় কাটাচ্ছেন, অন্তত: তারা যেন বিএনপির নতুন কমিটিতে ঠাঁই না পায়। তাদেরকে বিএনপির নতুন কমিটিতে স্থান দেয়া হলে তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীরা আ.লীগ নয়, বরং এসব সুবিধাবাদী অকৃতজ্ঞ ও বেঈমানদের বিরুদ্ধেই আন্দোলন গড়ে তুলবে। তারা বলেন, শহীদ জিয়ার আদর্শে গড়া বিএনপিতে এসব ঘাড়-মোটা, মাথা-মোটা ব্যক্তিদের ঠাঁই দেয়া যাবে না। এই বসন্তের কোকিলদের বহিষ্কার কিংবা অপসারণ করা এই সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি। তাদের সরিয়ে দিলে বিএনপি হবে কলংকমুক্ত এবং অধিকতর শক্তিশালী। এরা জনবিচ্ছিন্ন। এলাকার জনগণের কাছে এদের সামান্যতম জায়গা নেই। ড. মোশাররফের নামের উপর ভর করে এতদিন দুই হাতে পয়সা কামিয়েছে, জনগণ ও প্রশাসনকে ধোঁকা দিয়েছে। তাদের ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা থেকে এলাকাবাসী মুক্তি চায়। এলাকার মানুষ ও নেতাকর্মীগণের একটাই চাওয়া- পরিচ্ছন্ন ও ত্যাগী লোকদের নিয়ে গঠিত হোক আগামী বিএনপির নেতৃত্ব। এতে দল সুসংগঠিত এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে। বাস্তবায়িত হবে শহীদ জিয়ার লালিত স্বপ্ন। বিএনপির পুনঃ গঠন বিষয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি মো: খোরশেদ আলম ইনকিলাবকে বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিগত আন্দোলন সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে অংশগ্রহণ করেছে। নতুন কমিটিতে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতেই এইসব ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। আমাদের নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং এমকে আনোয়ারের সাথে আলাপ করে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আন্দোলনে যারা শরিক হয়নি, শাসক দলের সাথে আঁতাত করে নিরাপদে থেকেছেন, এসব সুবিধাভোগী নেতাদের নতুন কমিটিতে ঠাঁই হবে না। মেঘনা উপজেলা বিএনপিসাধারণ সম্পাদক আজহারুল হক শাহিন বলেন, রাজনীতিতে সামনে আমাদের হয়তো আরো কঠিন সময় আসবে। নতুন কমিটিতে তরুণদের হাতে নেতৃত্ব দিতে হবে। এখানে তরুণদের মধ্যে অনেক যোগ্য নেতা রয়েছে। তারা আমাদের নেতা ড. মোশাররফ ও এমকে আনোয়ারের হাতেই তৈরি। এসব নেতাদের মূল্যায়ন করলে দল আরো শক্তিশালী হবে, ভবিষ্যৎ আন্দোলন আরো চাঙ্গা হবে। কুমিল্লা উত্তর জেলা জাসাস সভাপতি আরিফ মাহামুদ বলেন, বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে তরুণদের জয়জয়কার। বিএনপির আন্দোলনে তৃণমূলের তরুণ নেতাকর্মীরা তার প্রমাণ রেখেছে। আগামী আন্দোলনে সফলতা পেতে হলে নতুন কমিটিতে তরুণদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। বিএনপির প্রতিটি ইউনিটে তরুণ নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে হবে। তাহলে দল আরো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হবে। এলাকার জনগণ উপকৃত হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ত্যাগী নেতাদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি তৃণমূলের
আরও পড়ুন