Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

দাপট কমেনি শাস্তি পাওয়া জনপ্রতিনিধিদের

ত্রাণ চুরির অভিযোগে বরখাস্ত সাড়ে তিনশত জন আইনি দুর্বলতার সুযোগে পাচ্ছে

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ২৬ আগস্ট, ২০২০, ১২:০২ এএম

ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি ত্রাণ ও চাল আত্মসাত এবং প্রকল্পের অনিয়ম দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাড়ে ৩ শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছে স্থানী সরকার বিভাগ। কিন্তু এতেও দাপট কমেনি শাস্তি পাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা ও উপজেলা পরিষদ সদস্য এবং ইউপি সদস্যদের। বরং উল্টো সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে বহাল তবিয়তে অফিস করছেন তারা। আবার অনেক জেলার জনপ্রতিনিধি মামলা না করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন বলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সরকার দলীয় নেতারা। সরকার পক্ষের আইনজীবীদের আন্তরিকতার অভাব এবং আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে এসব দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধিরা বেড়িয়ে আসছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
চলতি বছর করোনাভাইরাস মহামারিতে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা হিসেবে কর্মহীনদের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদানে করা হয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম, উপকারভোগীদের ভুয়া তালিকা প্রণয়ন করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল ও খাদ্যসামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগ উঠে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। এজন্য সারাদেশে ১১৪জন বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে চেয়ারম্যান ৩৭ জন এবং ইউপি সদস্য ৭১জন।
২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের চাল আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকল্পে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে ৫৮জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর মধ্যে ২৫জন ইউপি চেয়ারম্যান উচ্চ আদালতে রীট মামলা করে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া প্রকল্পের নামে সরকারি টাকা আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে ১৪২জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যান ৫৫ জন এবং ইউপি সদস্য ৮৭জন। তাদের মধ্যে ২০জন জনপ্রতিনিধি উচ্চ আদালতে রীট মামলা করে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করে দায়িত্ব পালন করছেন। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ইনকিলাবকে বলেন, দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো হওয়ার কারণে সমাজের ভাল মানুষগুলো আর ভোটে আসার সুযোগ পাচ্ছে না। এ কারণে জনপ্রতিনিধিদের মান ও দাম দুটোই কমেছে। এ আইন করে চরমভাবে দুর্নীতি গ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ইউপি চেয়ারম্যান পদ দলীয় প্রতীকে না করা সরকারের জন্য ভাল হতো। এটি করে গ্রামে গ্রামে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। কেউ কারো কথা মানছেই না। তিনি বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা দেন, সেই টাকা জনপ্রতিনিধিরা আত্মসাৎ করে পার পাচ্ছেন কিভাবে?
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দিন আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন. ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি ত্রাণ ও চাল আত্মসাৎ এবং প্রকল্পের অনিয়ম দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাড়ে ৩শতাধিক জনপ্রতিনিধি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা ও উপজেলা পরিষদ সদস্য এবং ইউপি সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। দুর্নীতিবাজদের ছাড় নাই। সে সরকারি দলের হোক আর অন্য দলের হোক। আদালতে সরকারি আইনজীবীরা এ মামলাগুলো দেখভাল করে থাবেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ৫৮জন, করোনাকালে ১১৪জন এবং বিভিন্ন অভিযোগে ১৪২জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গত সাত মাসে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ অনুযায়ী তাদের পদ হতে সাময়িকভাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি ত্রাণ বিতরণ অনিয়ম পৌরসভার কাউন্সিলর ও ইউপি চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যদের বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন করা হয়েছে। তারা হলেন, নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার কদিমছিলান ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম রেজা। এক ইউপি সদস্য বিদেশে অবস্থান করার পর থেকে সরকারি ভাতা তুলে আত্মসাৎ করেছেন এবং এক মুক্তিযোদ্ধার জমি দখল করে নিজেই বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। তিনি তার লোক দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চালাচ্ছেন এবং অভিযোগকারিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন বলে অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি।
দুঃস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার ৫নং বানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাদি হুমায়ন কবীর এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়ম, সরকারি ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগে হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলাধীন ৬ নং রাজিউড়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ ওয়ার্ডের সদস্য জিল্লুর রহমানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
সরকারি ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও চাল আত্মসাতের অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ১২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম নেহার এবং শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার আরশীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শামসুদ্দোহাকে (ড. রতন) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম নেহারের বিরুদ্ধে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্র/নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বিশেষ ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণে অনিয়ম করে নিজের পরিবারের সচ্ছল সদস্য ও আত্মীয়স্বজনসহ ১৬ ব্যক্তির নাম ওএমএসের ভোক্তা তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পরে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এর ধারা ৩১(১) অনুযায়ী তাকে পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার আরশীনগর ইউপি চেয়ারম্যান মো. শামসুদ্দোহা (ড. রতন) মৎস্যজীবীদের ভিজিএফের ৩৫ বস্তা চাল আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে রয়েছেন।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)-কে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগে টাঙ্গাইল সদর উপজেলা সরকারি দলের নেতা ভাইস-চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা (নবীন) সরকারি জরুরি ত্রাণ তার ইচ্ছামত তালিকা বহির্ভূতভাবে তাকে প্রদান না করার কারণে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআই) কে মারধর, লাঞ্ছিতকরণ, প্রাণনাশের হুমকি, হেনস্থা ও সরকারি কর্তব্যপালনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছেন। এর আগে তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ব্রিজের টেন্ডারকাজে বাধা প্রদান ও সিডিউল বিক্রি না করার জন্য হুমকি প্রদানসহ ভূমিহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণে অবৈধ হস্তক্ষেপ ও পিআইও-র কাছে চাঁদা দাবি করেন। এছাড়াও তিনি করোনাভাইরাস জনিত বৈশ্বিক মহামারিতে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা হিসেবে কর্মহীনদের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে তালিকা প্রণয়নে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন। তাই জনস্বার্থে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার নুরপুর ইউপি›ও চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সরকারি দলের নেতা মুখলিছ মিয়া, রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার নিমপায়া ইউপি›র ৩ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. আকবর আলী এবং ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার আহাম্মদপুর ইউপি›র ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য ও সরকারি দলের নেতা মো. কামাল হোসেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ত্রাণ চুরি
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ