Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ৪ কার্তিক ১৪২৭, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

পশ্চিমা গণতন্ত্রের পতন এবং রিজিম চেইঞ্জ : ত্রিপলিতানিয়া থেকে বেলারুশ

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০১ এএম

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ভোটাধিকারই হচ্ছে ক্ষমতার পালাবদলের মূল চাবিকাঠি। পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগ বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সামরিক বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের চেষ্টাকে আধুনিক গণমাধ্যম নাম দিয়েছে রিজিম চেঞ্জ। নিজ রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের লেবাসটিকে অক্ষুন্ন রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে বর্হিবিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনে ষড়যন্ত্রমূলক রিজিম চেঞ্জ পন্থা প্রয়োগ করে আসছে। সিভিল ওয়ারের আগে থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইউরোশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে নিজেদের বশংবদ সরকার প্রতিষ্ঠার অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। সেই ১৮০৫ সালে অটোমান ত্রিপলিতানিয়া বা আধুনিক লিবিয়ায় উসমানীয় খেলাফত শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেখানে মার্কিন বশংবদ সরকার বসানোর ষড়যন্ত্র শুরু হয়। উসমানিয় খেলাফতের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও আভ্যন্তরীন বিরোধকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ত্রিপলির গর্ভনর বা পাশা ইউসেফ কারামালনিকে সরিয়ে বিদেশে থাকা হামিদ কারামানলিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য সেনা কমান্ডার উইলিয়াম ইটনকে দায়িত্ব দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন। ডেমার যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ও তাদের ভাড়াটিয়া বাহিনীর সম্মিলিত শক্তির সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় উসমানিয় খেলাফতের সামরিক বাহিনীর সাথে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকটি পরাজয় ও সেনা ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেই ঊনবিংশ শতকের ঔপনিবেশিক যুগ দুইশ বছর পেরিয়ে এসে এখনো ত্রিপলিতানিয়া বা লিবিয়া পশ্চিমা মার্সেনারি শক্তি এবং আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। অন্যদিকে সিভিল ওয়ারের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি একদিনের জন্যও শান্তি ও গণতন্ত্রের পক্ষে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। তারা সর্বদাই ষড়যন্ত্র, সম্পদ লুন্ঠন, গণতন্ত্রের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বশংবদ শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে দেশে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নেটওর্য়াক ব্যবহার করে চলেছে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বেলারুশ আবার তাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বাধ্য হচ্ছে। গত ৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত বেলারুশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আলেক্সান্দর লুকাশেঙ্কো বিজয়ী হয়ে ৬ষ্ঠ বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়া ঠেকাতে তার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার নেপথ্যে কাজ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোজোটের গোপণ শক্তি। প্রতিবেশি পোল্যান্ডসহ ন্যাটোর মদদপুষ্ট আন্দোলকারিরা ব্যাপক মিডিয়া কভারেজ পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে এক সময় প্রেসিডেন্ট ভবন দখল করার প্রস্তুতি নেয়। একটি রেভ্যুলেশনারি শক্তি হিসেবে তারা প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো ও তার সহযোহিদের ফাঁসিতে ঝোলানোরও ঘোষণা দেয়। যদিও তাদের কোনো সশস্ত্র গ্রæপ ছিল না। মূলত: মিনস্কের উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর বিলাসী সন্তানরা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এজেন্ডা ভিত্তিক প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। আন্দোলনে বাইরের শক্তি তথা ন্যাটো জোটের সম্পৃক্ততা ও স্বার্থের প্রশ্নটি কোনো গোপণ বিষয় ছিল না। খুব কাছের গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং রাশিয়ান বাহিনীও নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল না। ন্যটোর স্বার্থসিদ্ধির তৎপরতা ভন্ডুল করতে তারা যে রাজনৈতিক চালের জন্য অপেক্ষমান আন্দোলনের তীব্রতা ও সহিংস অবস্থা তাদের হাতে সে সুযোগ এনে দেয়। ইতিপূর্বে ২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার সংঘাত অপরিহার্য করে তোলার মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চল ক্রিমিয়া দখলে নিতে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে ন্যাটো বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এবার ন্যাটোর রিজিম চেঞ্জ পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিতে রাশিয়ার সরাসরি সমর্থন নিশ্চিত করতে লুকাশেঙ্কো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি করে রাশিয়ার সাথে আবারো একীভুত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে বারবার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় থাকা লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে বেলারুশের নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের বিক্ষোভ এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নতোলা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। সেখানে ন্যাটো বাহিনীর ইন্ধন এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টার বিপরীতে আরেক সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি রাশিয়ার জন্য আরো বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার সাথে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দ্বিপাক্ষিক সমস্যা দ্রæত নিরসনেই শুধু প্রতিশ্রæতি দেয়নি, রাশিয়ান ইউনিয়নভুক্ত হওয়ার প্রশ্নেও সমঝোতার কাছাকাছি পৌছে গেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়। তবে লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে, আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের প্রয়াস নিরপাপত্তা বাহিনীন ব্যর্থ করে দেয়ার পর আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিলে সেখানে বড় ধরনের ক্র্যাকডাউনের ঘটনা ঘটেনি। অনেক নেতাকর্মী আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে নিরাপদে সরে গেলেও আন্দোলন থেমে যায়নি। তবে ন্যাটো বাহিনী তাদের কালার রেভ্যুলেশনের প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার দায় স্বীকার করে নিয়েছে।

প্রথম মহাযুদ্ধের সময় রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব বা কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হলে শত শত বছর ধরে চলা জারের শাসনের অবসান ঘটে। বিপ্লবের পর নতুন সরকার যুদ্ধ থেকে রাশিয়ান বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি এবং জাপানের ইম্পেরিয়াল বাহিনী রাশিয়া দখলের জন্য আক্রমন চালায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ হাজার সেনা সদস্যের সাথে ইউরোপ ও রাশিয়ার ইম্পেরিয়াল বাহিনীসহ মোট আড়াই লাখ সদস্যের বহুজাতিক সেনাবাহিনী ১৯১৮ থেকে ২০ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার উত্তরাঞ্চল ভøাডিভস্টক থেকে সাইবেরিয়া পর্যন্ত দখলের জন্য অভিযান চালায়। বিল্পবী রেড আর্মির সাথে লড়াইরত জার সমর্থিত হোয়াই আর্মিকে সহায়তা করে সেখানে পুনরায় জারের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল বহুজাতিক বাহিনীর লক্ষ্য। দুই বছরের মধ্যে বহুজাতিক বাহিনীর প্রয়াসের ব্যর্থতা নিশ্চিত হলে তারা রণেভঙ্গ দিলেও জাপানের রাজকীয় বাহিনী আরো কয়েক বছর ধরে উত্তরে সাইবেরিয়া ও শাখালিনে তাদের অভিযান অব্যাহত রেখে অবশেষে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। রাশিয়ান জনগনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে ব্যর্থ করে দিয়ে জার নিকোলাসের শাসন পুন:প্রতিষ্ঠার পশ্চিমা প্রয়াস এভাবে ব্যর্থ হয়ে গেলেও পরবর্তি চার দশকের ¯œায়ুযুদ্ধ এবং সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে তিন দশক ধরে রাশিয়া এবং তার প্রতিবেশি দেশগুলোর উপর পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এভাবেই সা¤্রাজ্যবাদী প্রতিদ্ব›িদ্বতার যাঁতাকলে নিস্পিষ্ট হয়ে ইউক্রেন, ক্রিমিয়া, বেলারুশের স্বাধীনতা জনগণের স্বার্থ বিরোধী আপসের গ্যাড়াকলে আটকে আছে। এরপর কোথায় গিয়ে তাদের চোখ পড়বে কেউ জানে না।

ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ত্রিপলিতানিয়া থেকে আজকের ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, ইরান, ফিলিস্তিন, ভেনিজুয়েলা, বেলারুশ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপের ইতিহাস ও তালিকা অনেক লম্বা। আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সময় মেক্সিকো থেকে টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়া দখল করে নিয়ে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অঙ্গীভুত করে নেয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন ফেডারেল ইউনিয়নের সাথে ক্যালিফোনির্য়ার দূরত্ব রয়েই গেছে। সাম্প্রতিক ট্রাম্প বিরোধী আন্দোলন এবং বø্যাক লাইফ ম্যাটার্স আন্দোলনের সময় ক্যালিফোর্নিয়ার সাথে মার্কিন প্রশাসনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দূরত্ব আবারো স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার আন্দোলনকারীদের হাতে ক্যালিফোর্নিয়া রিপাবলিকের যে পতাকা শোভা পাচ্ছিল তা দেড়শ বছর আগে মেক্সিকো থেকে স্বাধীন হওয়ার সেই আন্দোলনের পুরনো ইতিহাসকেই সামনে নিয়ে আসে। মেক্সিকো স্বাধীন হতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ভূমিকা কি হবে, এমন প্রশ্নের রাজনৈতিক বিচার-বিশ্লেষণও দেখা যাচ্ছে পশ্চিমা গণমাধ্যমে। তবে চেকো¯েøাভাকিয়া. কসোভো, পূর্ব তিমুর বা ইউক্রেনের আন্দোলনকারীদের পাশে মার্কিন ও ন্যাটো জোটের বহুমুখী তৎপরতার ভ’মিকা থাকলেও আপাতদৃশ্যে মার্কিন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোনো মদতদাতা নেই। তবে সাম্প্রতিক মার্কিন রাজনীতিতে, নির্বাচনে যেভাবে রাশিয়ান ও চীনা হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে এসেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার মদতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভলকানাইজেশন বা ডিস্ট্যাবিলাইজেশনের তোলপাড় নিয়ন্ত্রণহীন আন্দোলন শুরু হলে বিষ্ময়ের কিছু থাকবে না। পুলিশি নির্যাতনে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর শিয়াটলে এবং মেনিয়াপোলিসের বিক্ষোভকারিরা যেভাবে অটোনমাস জোন তৈরী করেছিল এবং এসব আন্দোলনের সাথে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের যেভাবে একাত্মতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে তাতে বিনা রক্তপাতে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের মত একদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতনের ইতিহাস রচিত হবে না তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের নেতৃত্বের স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং মার্কিন গণতন্ত্রকে বিশ্বে ও মার্কিনীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ও অনাস্থা তৈরীর কাজটি অনেকটাই করে ফেলেছেন। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল এবং তা মেনে নেয়ার প্রশ্নে এখনই নানাবিধ আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। পরাজিত হলে ফলাফল মেনে নিয়ে ট্রাম্প হোয়াইটহাউজ ছাড়বেন কিনা তা নিয়ে যে সংশয় দেখা দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো তা’ স্পষ্ট করেন নি।

সিয়াটলের আন্দোলনকারিদের রাজপথ থেকে সরাতে সেনাবাহিনীর অ্যাকশনে যাওয়ার প্রচ্ছন্ন দিয়ে টুইট করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রতিত্তোরে সিয়াটলের মেয়র জেনি ডারকেন তার টুইট বার্তায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রের জন্মই হচ্ছে প্রতিরোধ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। জমায়েত হওয়ার অধিকার, প্রতিবাদ করার অধিকার, রাষ্ট্র যখন ভুল করে তার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার আমাদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা সাদা-কালো, নেটিভ-¯েøইভদের সম্মিলিত শক্তিকে সংঘবদ্ধ করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিকে হটিয়ে স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। মার্কিন সংবিধান বিশ্বের সব মানুষের মানবিক গণতান্ত্রিক অধিকার ও মূল্যবোধের অনুকুল ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। সেই সংবিধান সংরক্ষণের শপথ নিয়ে মার্কিন শাসকশ্রেণী অনবরত শুধু সংবিধান লঙ্ঘনই করছে না বিশ্বের দেশে দেশে মানুষের অধিকার হরণ এবং গণতন্ত্রের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে একটা গেøাবাল হেজিমনিক সিস্টেম এশটাবলিশ করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা মার্কিন গণতন্ত্র এবং কনফেডারেট ইউনিয়নের ভবিষ্যৎকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বিশাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরগত ভাঙ্গনের পেছনে রয়েছে অস্বচ্ছ, ভঙ্গুর, ভোগবাদী ও সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এই অর্থব্যবস্থা এতটাই ধ্বংসাত্মক এবং আত্মঘাতী যে মার্কিন ফাউন্ডিং ফাদারদের মধ্যে শুরুতেই এ সম্পর্কে ভয় কাজ করেছিল। বিশেষত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের এখতিয়ার এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যত সম্পর্কে তাদের উদ্বেগ ও ভবিষ্যদ্বানী এখন পুরোপুরি ফলে যেতে দেখা যাচ্ছে। সেই ত্রিপলিতানিয়া দখলের যুদ্ধের সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি ব্যাংকিং ইনস্টিটিউশনগুলো আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রতিপক্ষ সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। যদি মার্কিন জনগণ(সরকার) প্রাইভেট ব্যাংকগুলোকে মূদ্রা ইস্যু করা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়, তাহলে তাদের মূল্যস্ফীতির কারসাজি এবং জনগনের সম্পদ লুন্ঠনের তৎপরতা চলতেই থাকবে। একদিন তাদের সন্তানরা ঘুম থেকে জেগে দেশবে তারা উদ্বাস্তু। দেখবে তাদের পিতা-পিতামহরা যে দেশটি গঠন করেছিল তা ইতিমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে।’ দুইশ বছর আগে জেফারসনের করা ভবিষ্যদ্বানীর আশঙ্কা এখন সত্যে পরিনত হয়েছে। মার্কিন চিন্তাবিদ-রাজনৈতিক দার্শনিকরা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ব্যর্থরাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছেন। গত দুইশ বছরে বিশ্বের দেশে দেশে মার্কিনীরা আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ চালিয়ে যেমন মার্কিনীরা অসংখ্য শত্রæ সৃষ্টি করেছে, একইভাবে কারসাজির অর্থনীতিতে ধসের শিকার নিপীড়িত বঞ্চিত মার্কিনীরাও নিজ শহরে ডেথ টু আমেরিকা শ্লোগান দিয়ে মিছিল করেছে।

সামরিক শক্তির দ্বারা হেজিমনি ও বৈদেশিক সম্পদ লুন্ঠন ও অন্যদেশের মানুষের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্র সামরিকভাবে যতই শক্তিশালী হোক না কেন তা ক্ষণভঙ্গুর। বহুমত, পথ ও বিশ্বাসের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় মাত্র ৭০ বছরের মধ্যে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতন ঘটলেও হেজিমনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখনো টিকে থাকার মূলে রয়েছে এর সংবিধান নির্দেশিত বহুত্ববাদী উদারনৈতিক মূল্যবোধের চর্চা। প্রাইভেট ব্যাংকিং ও তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট মিডিয়া ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা থেকে বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা সংক্ষোভের বিষ্ফোরণ অনিবার্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী শাসকরা নিজেদের সামরিক শক্তি ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেশে দেশে যে ডিস্ট্যাবিলাইজেশন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছে তা এখন নিজেদের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠেছে। কর্পোরেট শক্তিগুলো গুটিকতেক পরিবার ও গোষ্ঠির স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ অগ্রাহ্য-উপেক্ষিত হয়ে আসছে। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও সংগ্রামের কণ্ঠকে ধারণ করেন কর্পোরেট মিডিয়া ও মতলববাজ থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো তাদের বø্যাক-আউট করার ব্যাপারে একাট্টা। রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্সের নিয়ন্ত্রক ডিপ-স্টেট। এরা শতকরা একভাগ উচ্চবিত্ত কর্পোরেট শক্তির প্রতিভু। নিরানব্বইভাগ মানুষের স্বার্থ ও কন্ঠরোধ করার কলাকৌশলের সফল বাস্তবায়ন ছাড়া এদের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। জর্জ গ্যালাওয়ে, জেরেমি করবিন, বার্নি সেন্ডার্স বা রাল্ফ নাদেরদের রাজনীতির মঞ্চে কোনঠাসা করে ক্ষমতার প্রান্ত থেকে দূরে রাখতে যা কিছু করনীয় তারা তাই করছে। গণতন্ত্রের নামে দেশে দেশে তারই চর্চা চলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিকল্প শুধুই জো-বাইডেন, যিনি আগ্রাসী, দখলবাজ জায়নবাদী ইসরাইলের সব অপকর্মের সমর্থনের পাশাপাশি মার্কিন সামরিক-অর্থনৈতিক ও কূনৈতিক সহযোগিতার বø্যাঙ্ক চেক দিয়ে বেড়াচ্ছেন। মিথ্যা অভিযোগে ইরাকে ন্যাটোর সামরিক হামলাকে এখনো সমর্থন করছেন জো-বাইডেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার এটাই তার বড় যোগ্যতা। এর ব্যত্যয় ঘটলে আব্রাহাম লিঙ্কন বা জনএফ কেনেডির মত আততায়ির গুলিতে মরতে হবে। এটাই হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বাস্তবতা। বিশ্ব এখন এই হেজিমনিক শক্তির নিগড় থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করছে।
[email protected]



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বেলারুশ


আরও
আরও পড়ুন