Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭, ১১ সফর ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

ইসলামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০২ এএম

উমাইয়া ও আব্বাসীয় (৭৫০-১২৫৮) যুগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ঃ উমাইয়া খলীফা মুয়ারিয়া রা. সংখ্যালঘুদের প্রতি অত্যন্ত উদার ছিলেন। তার চিকিৎসক, অর্থ সচিব ও সভাকবি ছিল খ্রিস্টান। সমগ্র উমাইয়া সাম্রাজ্যে তারা মোটামুটি সুখ-সাচ্ছন্দে বসবাস করেছিল। এ সময়ে অনেক গীর্জা মন্দির ও উপাসনালয় সংস্কার করা হয়েছিল। যোগ্য সংখ্যালঘুদের রাজকার্যের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল। উমর ইবনে আব্দুল আযীয র. তার শাসন আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেছিলেন। তিনি তাদের অধিকারসমূহ যথাযভাবে আদায় করেছিলেন।

তারিক বিন যিয়াদ ৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেন জয় করেন। তারপর প্রায় ৮ শতাব্দী এ অঞ্চল মুসলিম কর্তৃক শাসিত হয়। কুচক্রীদরে বিচ্ছিন্ন কিছু অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছাড়া দীর্ঘকাল স্পেন ছিল শান্তি ও সমৃদ্ধির দেশ। দেশটি সংস্কিৃতি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সেতুবন্ধন রচনা করেছিল। এখানে রোমান ইহুদী, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের অবস্থান ছিল, ছিল মসজিদ, চার্চ ও সিনাগগের মত অনেক উপাসনালয়। স্পেনের মুসলিম শাসনামলে মুসলিম, খিস্টান ও ইহুদীদের সহাবস্থান ছিল। এ সময় মুসলিমদের নিকট ইহুদী-খ্রিস্টান ধর্ম কোন ভিনদেশী জোরপূর্বক অনুপ্রবিষ্ট ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়নি। অপর দিকে ইহুদী-খ্রিস্টানগণ মুসলিম শাসনের শুরুতে ইসলামকে বিড়ম্বনার কারণ মনে করতো। অন্যান্য ধর্ম ও বর্ণের যারাই মুসলিমদের সংস্পর্শে এসেছে তাদের সাথে মুসলিমগণ সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করেছে। তাদের জীবন-যাত্রার মান কোন অবস্থায় অমুসলিম শাসন আমলের চেয়ে খারাপ ছিল না। মুসলিম শাসনের অধীনে তারা তাদের ব্যাক্তিগত কার্য বলী ও ধর্ম-কর্ম অব্যাহত রাখতে পেরেছিল। খ্রিস্টান সম্প্রদায় তাদের ধর্ম-কর্ম স্বাধীনভাবে তাদের উপসনালয়ে করতে পারত। এ শাসনামলে টলেডোর প্রাচীন সিনাগগে ধর্মীয় কার্যাবলি অব্যাহত ছিল। খ্রিস্টানগণ তাদের যুবকদেরকে এবং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে স্বাধীনভাবে ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষা দিতে পারত। স্পেনের তৎকালীন এ ধর্মীয় সহিষ্ণু পরিবেশ আফ্রিকা, ইরাক, সিরিয়া ও অন্যান্য দেশের অধিবাসীদেরকে স্পেনে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। যার ফলে পরবর্তীতে স্পেন ইউরোপের একমাত্র ইহুদী সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে পরিণত হয়। নতুন নতুন শহরে অসংখ্যা চার্চ ও সিনাগস স্থাপিত হয়। সাধারণ ইহুদী-খ্রিস্টানরা নিরাপত্তা কর জিযিয়া দিত, কিন্তু তাদের ধর্মগুরুদেরকে জিযিয়া-খারাজ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। তাদের স্ব স্ব ধর্ম অনুযায়ী পৃথক বিচারব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তাদের নিজস্ব ধর্মগুরু বা ধর্মযাজক ছিল যারা স্পেনের মুসলিম সরকারে প্রতিনিধিত্ব করতো। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কার্যাবলি যেমন বিয়ে, তালাক, খাদ্যভক্ষণ, সম্পদ বন্টন ইত্যাকার কার্যাবলি তাদের স্ব স্ব ধর্মানুযায়ী প্রতিপালন করার সুযোগ তারা পেয়েছিল। আন্দালুসের (স্পেনের) সংখ্যালঘুরা মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য স্থানে অবস্থানরত সংখ্যালঘুর মতই যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছিল। তারা সেখানকার মুসলিম সমাজের প্রধান ধারায় এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, তাদেরকে পৃথক করা কষ্টসাধ্য হতো। তারা কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বক্ষেত্রে সার্বিক নিরাপত্তা লাভ করেছিল। সংখ্যালঘুদের অনুকূল এ পরিবেশ মুসলিম বিজয় থেকে শুরু করে প্রায় ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত বিরাজ করেছিল। মোটকথা স্পেনের মুসলিম শাসন আমলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের ধর্ম-কর্ম পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছিল।
মুহাম্মদ ইবনে কাসিম ৭১১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জয় সিন্ধু করেন। এ বিজয়ের মাধ্যমে ভারত প্রত্যক্ষ মুসলিম শাসনাধীনে আসে। ৭১১-৭১৩খ্রি. পর্যন্ত মাত্র দু’ বছরে সিন্ধু ও মুলতানের সব এলাকা মুসলিম শাসক মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের অধীনে চলে আসে। ৭১১-৭১৪ পর্যন্ত প্রায় তিন বছরেরও অধিককাল তিনি এ অঞ্চল শাসন করেন। তিনি যখন এ অঞ্চল বিজয় করেন তখন বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের সম্পর্কে নতুন রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে এ নিয়ে সমস্যায় পড়েন। কারণ এর অধিবাসীরা ছিল সিন্ধি অথবা হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। মিসর ও সিরিয়ার মত অহলে কিতাব কেউ ছিলো না। তাছাড়া স্থানীয় বাসিন্দারা মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করে যাতে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরগুলো পুনরায় মেরামত করতে পারে এবং উপাসনা করতে পারে। মুহাম্মদ ইবনে কাসিম হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট এ সমস্যার সমাধান চেয়ে চিঠি লিখেন। জবাবে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ লিখেন, ‘তোমার পত্রখানা পেলাম। বর্ণিত ঘটনাবলি সম্পর্কে অবগত হয়েছি।
লোকরা তাদের মন্দির মেরামতের জন্য স্বীয় সম্প্রদায়ের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। তারা যখন আমাদের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে এবং খিলাফতের কর প্রদানের স্বীকারোক্তি ও দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন তাদের উপর আমাদের আর অতিরিক্ত কোন চাহিদা থাকে না। কেননা তারা এখন যিম্মীর মর্যাদায়। তাদের জানমালের উপর আমাদের কোনো হঠকারিতা চলে না, এ জন্য তাদের অনুমতি দেয়া যেতে পারে যে, তারা স্বীয় দেবতার উপাসনা করতে পারে এবং কোনো লোকের পক্ষে তাদের ধর্ম সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপন ও বিরোধিতা করা সঙ্গত হবেনা। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই তারা তাদের বাড়ি-ঘরে ইচ্ছা মাফিক বসবাস করবে। মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের শাসন আমলে ভিন্নধর্মের মানুষ অহলে কিতাবের মত অনেক সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছিল। বিজয়ী ইবনে কাসিম বিজিতদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন। কর আদায়ে তাদের পূর্বের রীতি চালু রেখে ছিলেন এবং পুরাতন কর্মচারীদের কাউকে তিনি চাকুরীচ্যুত করেননি। হিন্দু সম্প্রদায় নিজ নিজ মন্দির-উপাসনালয়ে স্বাধীনভাবে উপাসনা করতে পেরেছিলেন। ভূতি মালিকগণ পুরোহিত ও মন্দিরসমূহকে পূর্বের মতই ট্যাক্স দিতে পারতেন। সংখ্যালঘুদের উপর নামেমাত্র জিযিয়া ধার্য ছিলো। অপর দিকে মুসলমানদের উপর ধার্য ছিল যাকাত-সাদকা। আর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে মুসলমানদের তাদের সম্পদের শতকরা আড়াইভাগের অধিক, কোনো কোনো সময় সাড়ে পাঁচ ভাগ পর্যন্ত জমা দিতে হতো। অপর দিকে সংখ্যালঘুদেরকে সেখানে দিতে হত মাত্র পাঁচ দিনার। এ ছাড়া সামরিক কর্মকান্ড থেকে সংখ্যালঘুদেরকে অব্যনহতি দেয়া হয়েছিল অথচ মুসলমানদের জন্য তাতে অংশগ্রহণ করা অপরিহার্য ছিলো। প্রশাসনিক কর্মকান্ডের গুরুত্বপূর্ণ পদেও সংখ্যালঘুদের হাতে ন্যন্ত ছিলো। মুসলিম শাসকগণ কেবল সামরিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতেন। মুসলমানদের মামলা-কোমাদ্দমার ফয়সালা করতেন বিচারগণ। তবে শক্তিতে দুর্বল সংখ্যালঘুদের মামলা-মোকাদ্দমার কাজ সম্পাদনের জন্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু ছিলো। মুহাম্মদ ইবনে কাসিম এর নীতি ও ন্যায়পরায়ণতায় অনুপ্রাণিত হয়ে কয়েকটি শহর ও জনপদের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। তার আমলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এতই ব্যাপক ছিল যে, তিনি যখন বন্দী হয়ে ইরাকে প্রেরিত হন তখন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ তার জন্য ক্রন্দন করেছে। ভারত থেকে মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের ফিরে আসার পরও অন্যান্য মুসলিম শাসকদের সময়ও সংখ্যালঘুদের মর্যাদা অক্ষুন্ন ছিলো। সুলতান মাহমুদ মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন। সুলতান মাহমুদের সৈন্যবাহিনীতে হিন্দু ব্যাটালিয়ান ছিল এবং আমীর মাসউদের কয়েকজন হিন্দু জেনারেলের নাম পাওয়া যায়।
ভারতের সুলতানী আমলের (১২০৬-১৫২৬) মুসলিম শাসকগণ তাদের রাজ্যে বসবাসরত অন্যান্য জাতি হতে মাথাপিছু জিযিয়া কর আদায় করে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতেন। মুসলিম সামরিক বাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগদান কিংবা যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অন্য ধর্মের অনুসারীগণ এক বছরের জিযিয়া কর দেয়া হতে অব্যাহতি পেতেন। এমনকি দেশ জয় করার পর বিজিত অঞ্চলের ভিন্নধর্মের অনুসারীদের যতদিন পর্যন্ত জান-মালের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা না হতো ততদিন পর্যন্ত মুসলিম শাসকগণ তাদের উপর জিযিয়া আরোপ করতেন না। সংখ্যালঘু মহিলা শিশু ও সব ধর্মের বৃদ্ধ, পঙ্গু, অন্ধ এবং যারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে কিন্তু এ কর দিতে অসমর্থ তাদের জন্য এ কর মওকুফ ছিলো। এমনকি মঠধারী, সন্ন্যাসী, পুরোহিত, ধর্মযাজক যারা জীবিকা অর্জন না করে শুধু আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন তাদেরকে এ কর থেকে অব্যাহিত দেয়া হয়েছিল। মুসলমানদের পৈত্রিক সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, বিবাহ-বিচ্ছেদের মত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ের বিচারের কাজ মুসলিম আইন অনুযায়ী এবং অন্যান্য ধর্মের উক্ত বিষয়াদি তাদের স্ব স্ব ধর্মের আইন অনুযায়ী সম্পাদান করা হতো। ফৌজদারী ও সাক্ষ্য প্রদান সংক্রান্ত বিষয়ে মুসলিম আইন সব সম্প্রদায়ের উপর প্রজোয্য ছিল। মুসলিম ও অন্যান্যদের মধ্যে মোকাদ্দমার বিচার নিরপেক্ষতার নীতি অনুসারে পরিচালিত হতো। গ্রাম্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মামলার সুরাহা হতো। তাদের খুব কম সংখ্যক মামলা আদালতে বিচারের জন্য প্রেরিত হতো। এ গ্রাম্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বৃটিশ আমল পর্যন্ত চালু ছিলো।
ভারতে মোগল সরকার (১৫২৬-১৮৫৭) ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলো। শাসন প্রণালীতে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রাধান্য পাওয়ায় সম্রাটগণ বিভেদনীতি পরিহার করে জন্যসাধারণের সকল সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন। নীতির দিক থেকে মোগল শাসনধীন সকল সম্প্রাদায়ের লোক আইনের চোখে সমান ছিলো। মুসলিম ছাড়াও অন্যান্য জাতির মানুষ সরকারী গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ লাভ করতেন। সরকারী রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় হিন্দুরা নিয়োগ পেতেন। সপ্তদশ শতাদ্বীতে সার্বিক রাজস্ব ব্যবস্থা সনাতন হিন্দু রীতিনীতি ও ইসলামী পদ্ধতির উপকরণের সংমিশ্রণে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। সম্রাট আকবর জিযিয়া কর বিলোপ করেন এবং বহুসংখ্যাক সংখ্যালঘুকে সামরিক বেসামরিক পদে নিয়োগ দান করে প্রশংসনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাছাড়া তিনি সংখ্যালঘুদের উপর তীর্থকর উচ্ছেদ করেন এবং তাদেরকে নতুন নতুন উপাসনালয় তৈরি করার অনুমুতি দেন। সম্রাট আওরঙ্গযেব কখনো সংখ্যালঘুদের ধর্ম-কর্ম পালনে হস্তক্ষেপ করেননি। আকবর ও তাঁর পরবর্তী শাসকগণও জনসাধারণের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্ম-কর্ম পালনে কখনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেননি। মোগল আমলে বাংলার সমাজ ধর্মীয় ভিত্তিতে মুসলমান ও হিন্দু এ দু’ভাগে বিভক্ত ছিলো। হিন্দু আইন অনুসারে হিন্দু সমাজ এবং মুসলিম আইন অনুসারে মুসলিম সমাজ শাসিত হতো। মোগল সুবাদার বা নবাবগণ উভয় সমাজের জন্য কোনো সাধারণ আইন চাপিয়ে দেননি। তাই উভয় সমাজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো স্ব স্ব ধর্মের আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। বর্তমানকালের ভারতের মত উভয় জাতির মধ্যে কোন বিরোধ ছিল না। সে যুগে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কথাও কোন ইতিহাসে পাওয়া যায় না। হিন্দু সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার পূর্ণমাত্রায় ভোগ করতো। মুসলিম শাসকগণ তাতে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করতেন না। এ প্রসঙ্গে ডক্টর এম.এ. রহিম বলেন, “মুসলমান শাসনকর্তাগণ হিন্দুদের ধর্মীয় ব্যাপারে কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করেন। ফলে হিন্দুরা অনুষ্ঠানাদি উদযাপনে শিক্ষায় ও ধর্মপ্রচারে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে সক্ষম হয়। সমসাময়িক বৈষ্ণব সাহিত্য থেকে জানা যায যে, ব্রাহ্মণগণ বৈষ্ণবগুরু শ্রীচৈতন্যের বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারার প্রতি খুবই বিরূপ ছিলেন। তার ধর্ম প্রচারের কার্য থেকে নিরস্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয় সাহায্য লাভের অভিপ্রায়ে সুলতান শাহের নিকট বৈষ্ণবগুরুর বিরুদ্ধে নালিশ করেন। বিচক্ষণ সুলতান শ্রীচৈতন্যের কার্যাবলি সম্বন্ধে নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করে বুঝতে পারেন যে, চৈত্যন্যের বৈষ্ণব চিন্তাধারা হিন্দুদের কোনো ক্ষতিসাধন করছে না, বরং হিন্দু সমাজের উন্নতি বিধান করাই তার চিন্তাধারা ও প্রচারণার লক্ষ্য। হিন্দুদের সামাজিক জীবনে শ্রীচৈতন্যের ধর্ম প্রচারের গুরুত্বের কথা উপলিদ্ধি করে হোসেন শাহ তার ধর্ম প্রচার কার্যে কোনরূপ বাধার সৃষ্টি করেননি।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর সমগ্র বাংলায় ইংরেজ আধিপত্য সৃষ্টি হয়। তখন এ দেশের সব শ্রেণির মানুষ তাদের স্বাধীনতা হারায়। ইংরেজদের শোষণমূলক রাজস্বনীতি, চিরাচরিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, বিচারব্যবস্থায় অবাঞ্জিত হস্তক্ষেপ, দেশীয় রীতিনীতি বিরোধী কার্যকলাপ জনগণকে অতীষ্ঠ করে তুলে। এর ফলে বিভিন্ন বিদ্রোহ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য যে, এ দেশে ইংরেজদের আগমনের পূর্বে চাকমারা ছিল স্বাধীন। মোগল সরকারের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল সৌহার্দপূর্ণ। মোগল সরকারকে নামে মাত্র কর দিয়ে তারা স্বাধীনভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতো। (চলবে)
লেখক : গষেবষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সংখ্যালঘু-সম্প্রদায়

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০
আরও পড়ুন