Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করার সুযোগ কেউ পাবে না- বিএসইসি চেয়ারম্যান

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৪:২৮ পিএম

 

# ডিএসইর আইটিতে বড় ধরনের রিফর্ম হবে

 

# দৈনিক লেনদেন হবে ৩-৫ কোটি টাকা

 

# নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে আইসিবি পুনঃগঠনের প্রক্রিয়া শুরু

 

# উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করা কোম্পানির বোর্ড ভেঙে দেয়া হবে

 

# স্বতন্ত্র পরিচালকদের ভূমিকায় বিরক্ত বিএসইসি


নিয়মনীতি না মেনে বিভিন্ন রকমের অপকর্মে লিপ্ত হয় কেউ পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আর নিঃস্ব করার সুযোগ পাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) পুঁজিবাজার নিয়ে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বলেন, আমরা ব্যবসাটাকে সহজ করে দিতে চাই। এই সহজ করে দিতে গিয়ে কিছু দুরবৃত্ত বা দুষ্টু লোক যদি আপনাদের ডিস্টাব করে বা যারা এখানে বিভিন্ন ধরনের নিয়ম-নীতি না মেনে বিভিন্ন রকমের অপকর্মে লিপ্ত হয় এবং এই অল্প ২-৫ শতাংশ লোকের জন্য বাকি ৯৫-৯৮ শতাংশ মানুষের ক্ষতি হয়, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিঃশ্ব হয়, আমরা যতদিন আছি সেই সুযোগ আর হবে না। তিনি বলেন, আমাদের এখান থেকে কেউ যাতে কাউকে ঠকিয়ে, লুট করে, জালিয়াতি করে, চালাকি করে টাকা-পয়সা নিয়ে যেতে না পারে এ কাজ আমাদের সবাইকে মিলে করতে হবে। আমরা প্রত্যেক কমিশন মিটিংয়ে এ ধরনের কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, উন্নত দেশে পুঁজিবাজারই দীর্ঘ মেয়াদী অর্থায়নের প্রধান উৎস। যেটা দিয়ে বড়, মাঝারি, ছোট সব ধরনের ব্যবসা হয়ে থাকে। সেখানে মানুষের অংশগ্রহণ থাকে ব্যাপক। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ থাকে ব্যাপক। তখনই ইকোনমিটা ভাইব্রেন্ট হয়। আমরা সেই স্বপ্নই দেখছি। আমরা চাই আমাদের ক্যাপিটাল মার্কেট সেই রকম হবে।

স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবসার মধ্যে বৈচিত্র আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আশাকরি স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবসার মধ্যে বৈচিত্র আসবে। আমাদের যারা অংশগ্রহণকারী তাদের ব্যবসার মধ্যে বৈচিত্র আসবে। সারাক্ষণ যতি আমরা সেকেন্ডারি মার্কেটে কেনা-বেচা নিয়ে থাকি, তাহলে হবে না। কারণ আমাদেরকে মার্কেটটাকে অনেক বড় করতে হবে। এক হাজার কোটি টাকা কোন লেনদেনই না। এটাকে আমাদের ইমিডিয়েট ৩০০০-৫০০০ কোটি টাকা লেনদেনের দিকে নিয়ে যেতে হবে।

এ সময় স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার ধারনের তথ্য প্রকাশ করার আহ্বান জানান বিএসইসির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, পরিচালকদের ২ ও ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারনের তথ্য প্রকাশে কোন বাঁধা নেই। আমি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) বলবো, এসব তথ্য ওয়েবসাইটে দিয়ে দেন।

ডিএসইর আইটিতে বড় ধরনের রিফর্ম করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের একটি আইটি স্পেশাল টিম ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইন্সপেকশন করছে। সেখানে অনেক তথ্যই আমাদের কাছে এসেছে। সেই তথ্য থেকে আমরা জানতে পেরেছি, এখানে বড় ধরনের রিফর্মের প্রয়োজন হবে।

আগামী রোববার তারা আমাদের কাছে রিপোর্ট জমা দেবেন। রিপোর্ট জমা দেয়ার পরেই আমরা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে বসবো। সেখানে ইমিডিয়েটলি কোন কোন রিফর্ম বা কারেকশন করা প্রয়োনজ সেগুলো ওনাদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। কারণ স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর স্টকচার ঠিক না থাকলে সেখানে কোন ভাবে ব্যবসা হবে না বলে উল্লেখ করেন প্রফেসর শিবলী।

শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বলেন, জনগণের টাকা নিয়ে যেসব কোম্পানি পারফমেন্স করতে পারছে না, সেই কোম্পানি থেকে জনগণের টাকা ফেরতে দিয়ে আমরা তাদের তালিকাচ্যুত করবো। অনেক পুরানো যেসব ডিবেঞ্চার ঠিকভবে টাকা ফেরত দেয়নি, আগামী সপ্তাহ থেকে টাকা ফেরত আসার সংবাদ আপনারা পাবেন। দেখবেন আপনাদের অনেক পুরানো টাকা ফেরত আসছে।

 

 

 

ব্রোকারেজ হাউসের শাখা প্রসারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু ঢাকা বেজ না থেকে আপনারা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েন। প্রয়োজনে বিদেশি শাখা খুলেন। এ জন্য আমাদের পক্ষ আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোম্পানির তথ্য ভালো ভাবে যাচাই করে আইপিও দেয়া হচ্ছে এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, সুশাসন যদি আমরা শতভাগ নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে একজন মানুষ কেন তার ঘাম ঝরানো অর্থ বিনিয়োগ করবেন। আমরা যদি টাকা-পয়সা বা বিনিয়োগকে নিরাপত্তা দিতে না পারি, ভালো রিটার্ন দিতে না পারি তাহলে আমাদের কথায় কেন তারা আসবেন?

আইসিবি পুনঃগঠনের উদ্যোগের বিষয় তুলে ধরে তিনি প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বলেন, আইসিবির যে কাজ, সেটা তারা সঠিকভাবে করতে পারছিল না। এ কারণে সরকারের নির্দেশে আইসিবিকে পুনঃগঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করার পর আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে আইসিবিকে পুনঃগঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তখন সরকার থেকে আইসিবিকে আরও ফান্ড দেয়া হবে। তার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আইসিবির যে ভুমিকা, সেটা রাখতে পারবে।

স্বতন্ত্র পরিচালকদের ভূমিকা নিয়ে বিএসইসি বিরক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তা এখন ভূলুণ্ঠিত হওয়ার অবস্থা। আমরা দেখেছি স্বতন্ত্র পরিচালকরা তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করেন না। তাই স্বতন্ত্র পরিচালকদের বিষয়ে আমাদের শিগগির কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনে পারমিট করলে কিছু কিছু পরিচালককে আমাদের রিমুভ করতে হবে এবং তার জায়গায় সঠিক স্বতন্ত্র পরিচালক বসানোর প্রয়োজন হতে পারে।

বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, জনগনের বিনিয়োগ নেয়ার পরে যেসব কোম্পানিতে ঠিকভাবে ফাংশন হচ্ছে না। যারা হঠাৎ করে বন্ধ করে চলে গেছেন, যাদের তালা মারা অফিস ঢাকায় এবং ফ্যাক্টরি গাজীপুরে, যারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করেছেন, সেসব কোম্পানিতে সম্ভাবত আমাদের বোর্ডও ভেঙে দিতে হতে পারে। সেখানে আমরা সতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়িয়ে চেষ্টা করবো কোম্পানি ঠিক করে ফেলতে। আইনের মধ্যে থেকেই এগুলো করা হবে। না হলে আমরা অন্য ব্যবস্থা নেব।


সিএমজেএফ’র সাধারণ সম্পাদ মনির হোসেনর সঞ্চলনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন বিএমবিএর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান। এছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন- ডিএসই’র চেয়ারম্যান ইউনুসুর রহমান, সিএসইর চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম, অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএএমসি)-এর সহ-সভাপতি হাসাস ইমাম, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) সভাপতি শরিফ আনোয়ার, ডিএসইর পরিচালক মো. রকিবুর রহমান, মিনহাজ মান্নান ইমন, ডিএসইর সাবেক পরিচালক আহমেদ রশীদ লালী, সিএমজেএফ’র সভাপতি হাসান ইমাম রুবেল প্রমুখ।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজারে গত ১০ বছরে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। এই আস্থা সংকটের কারণে বিনিয়োগকারীরা বার বার প্রতারিত হয়েছেন। বাজারে টাকার কোন সমস্যা ছিল, কিন্তু আস্থার সংকট ছিল। আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, গত ১০ বছরে যে কোম্পানিগুলোর আইপিও এসেছে অত্যান্ত মানহীন। এসব আইপিও’র ক্ষেত্রে যেসব ইস্যু ম্যানেজার, আন্ডার রাইটার, অডিটর যারা মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন তাদেরকে পুঁজিবাজার থেকে অন্তত্য তিন বছর দুরে রাখতে হবে।

বিএসইসির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কমিশনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপর কারণে দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইমন ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আপনি যে কাজ শুরু করেছেন তার যেন ছন্দপতন না হয়। ছন্দপতন হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকবে না। বারবার আস্থা হারালে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী খুজে পাওয়া যাবে না।

বিএমবিএ সভাপতি বলেন, বাজারে প্রবাসিদের অংশগ্রহন বাড়ানোর জন্য বিএসইসির উদ্যোগ নিতে পারে। বর্তমানে প্রবাসিরা যেভাবে বিনিয়োগ করে, সেটা আসলে জটিল প্রক্রিয়া। শেয়ারবাজার মধ্যস্থতাকারীরা ফরেন কারেন্সি ডিল করতে পারলে প্রবাসিদের জন্য বিনিয়োগ সহজলভ্য হবে। 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিএসইসি চেয়ারম্যান
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ