Inqilab Logo

ঢাকা, রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৮ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সুন্দরবন ধ্বংসযজ্ঞ রুখতে হবে

প্রকাশের সময় : ১০ আগস্ট, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে দেশে যখন ব্যাপক জনমত গড়ে উঠেছে, তখন দেখা যাচ্ছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে সেখানে নানামুখী কর্মযজ্ঞ চলছে। গতকাল একটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুন্দরবন ঘিরে অন্তত ১৫০টি শিল্প প্রকল্প গড়ে উঠেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে সেখানে প্রভাবশালী মহলের জমি কেনার হিড়িক এবং এসব জমিতে ভারি শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ শিল্পগোষ্ঠী, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সুন্দরবনের পাশঘেঁষা অঞ্চলে অন্তত ১০ হাজার একর জমি কিনেছেন বলে জানা যায়। দেশের শিল্পায়ন, শিল্পবিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সকলেরই প্রত্যাশা। দেশকে আগামী প্রজন্মের জন্য আরো নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখা আরো বেশি কাক্সিক্ষত ও গুরুত্ববহ প্রত্যাশা। এ কথা সকলেরই জানা যে, একটি দেশের আয়তন ও জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে যে পরিমাণ বনভূমি থাকা প্রয়োজন বর্তমানে বাংলাদেশে তার অর্ধেকও নেই। জনসংখ্যার চাপে নগরায়ন, শিল্পায়ন ও আবাসন খাতে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমির বিলয় ঘটছে। সেই সাথে লাগামহীনভাবে বেদখল হয়ে যাচ্ছে দেশের যৎসামান্য বনভূমিও। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি এবং পরিবেশগত দূষণের ফলে এমনিতেই সুন্দরবনসহ উপকূলীয় জনপদ নোনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। কার্বন এমিশন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তবে সুন্দরবনের মতো বিরল বৈশিষ্ট্যের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এবং এর জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের উপায় ও সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।
বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন একদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোর জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যুহ, অন্যদিকে নানাবিধ বনজ, প্রাণিজ, ওষুধি ও মৎস্য সম্পদের প্রধান আধার। সারাবিশ্বেই সুন্দরবন একটি অনন্য বৈচিত্র্যম-িত ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশের জন্য ¯্রষ্টার অনন্য উপহার। একে ধ্বংসেরমুখে ঠেলে দেয়া মানে বাংলাদেশকেই ধ্বংসেরমুখে ঠেলে দেয়া। বিগত এক দশকে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের তা-বে সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সে সময় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবনের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বহু বছর লাগবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। এজন্য সুন্দরবনকে ‘ডিস্টার্ব’না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য রক্ষার কার্যকর উদ্যোগের বদলে একদিকে এ অঞ্চলকে সশস্ত্র বনদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে, অন্যদিকে গত এক দশকে সুন্দরবন সন্নিহিত এলাকাকে পরিবেশ প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর বড় বড় ভারীশিল্পের জন্য অবারিত করে দেয়া হয়েছে। সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ইসিএ বা ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এই এলাকায় ইতিমধ্যেই ১৫০টি শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নের ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সুন্দরবনসহ বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় গৃহীত আইন, সরকারি সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনাসমূহ অনেকটা কাগুজে বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের যথাযথ বাস্তবায়ন নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র পক্ষ থেকে গত সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। ভারতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা গাইডলাইন ম্যানুয়েল-২০১২ অনুসারে বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও জাতীয় উদ্যান এলাকার ২০ কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যায় না। অথচ ভারতের আগ্রহে, ভারতীয় ব্যাংকঋণে, ভারতীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে আমদানি করা কয়লাভিত্তিক এতবড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মহাযজ্ঞ চলছে। ভারত ও বাংলাদেশে বিস্তৃত বৃহত্তর সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে বা ভারতীয় উপকূলে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার বদলে বাংলাদেশে এবং সুন্দরবন অঞ্চলকেই অপরিহার্য মনে করছে কেন? সুন্দরবনের বেশিরভাগ অংশ বাংলাদেশে পড়লেও গত কয়েক দশকে আমাদের সুন্দরবনে অব্যাহত লুণ্ঠন এবং শিল্পদূষণের কারণে এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। পক্ষান্তরে ভারতীয় অংশে বাঘের সংখ্যা ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণœ থাকছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ফলে আগামী ৫০ বছর পর এখানকার অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। শুরু থেকেই সুন্দরবনে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিপক্ষে দেশের জনমত। রামপাল ছাড়াও দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনেক প্রকল্প রয়েছে। বিদ্যুতেরও অনেক বিকল্প রয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার দেশের সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, ইউনেস্কো এবং দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করছে কেন? রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সুন্দরবনের চারপাশে শিল্পায়ন অবারিত রাখার তৎপরতা ধ্বংসাত্মক ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে মনে করছে দেশের মানুষ। সুন্দরবনের ক্রিটিক্যাল অঞ্চলে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের যত আগ্রহই থাকুক, সরকারের তরফ থেকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে যত যুক্তিই দেখানো হোক, সুন্দরবনের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরনের প্রকল্প দেশবাসী দেখতে চায় না। সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প স্থান নির্বাচনের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। সেই সাথে সুন্দরবনের কাছাকাছি অঞ্চলের পরিবেশ দূষণকারী সকল ভারি ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হোক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সুন্দরবন ধ্বংসযজ্ঞ রুখতে হবে
আরও পড়ুন