Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

নদী গ্রাস করছে দক্ষিণের জনপদ

ভাঙন প্রতিরোধ কার্যক্রমে ধীরগতি

বরিশাল ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০০ এএম

বর্ষা বিদায়ের লগ্নে উজানের ঢলের প্রবল স্রোতে নদ-নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক জনপদ। দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ৭৫ ভাগ পানি সাগরে যাবার সময় গ্রাস করছে মানুষের ভিটেমাটিসহ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। সর্বশান্ত হচ্ছে দক্ষিণ জনপদের হাজার হাজার পরিবার। দক্ষিণাঞ্চলে বেশিরভাগ মানুষের জীবনের সাথেই নদী জড়িত। অনন্তকাল থেকে বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনের ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে নদীর সাথে। নদী তাদের অনেক কিছু দিলেও আবার করছে সর্বশান্ত। এখনো নদী ভাঙনে ‘সকাল বেলার আমীর ফকির সন্ধ্যা বেলা’।
কিন্তু এরপরেও নদীভাঙন রোধে দ্রত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হচ্ছে না দক্ষিণঞ্চলে। নদীভাঙন রোধে কোন সমন্বিত কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়নি। যেসব প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে তার বাস্তবায়নও হয় বিলম্বিত। অর্থের অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নদীভাঙন রোধে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ। সব ধরনের জটিলতা এড়াতে পরিকল্পনা গ্রহণ, পরিবীক্ষণ এবং বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করার দাবি উঠেছে। বরিশালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল উপক‚লীয় বাঁধ নির্মাণ ও টেকসই নিরাপত্তায় প্রয়োজন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংস্কার’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা নদীভাঙন প্রতিরোধে বোর্ড যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে না বলে জানানো হয়েছে। বরং পাউবোর প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অপরদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জনবল সঙ্কট এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ও নদী ভাঙন প্রতিরোধে যথাযথ ভ‚মিকা রাখতে না পারার দাবি করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ৪৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যায় মাত্র ৪১ কোটি টাকা। ফলে বাঁধ সংস্কারসহ নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় না বলেও বোর্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
নদ-নদীর ভাঙন রোধসহ নদী শাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোপূর্বে ৩১টি প্রকল্প মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনে পেশ করলেও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছু প্রকল্প অনুমোদন লাভ করলেও অর্থ ছাড়ের অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন শ্লথ হয়ে পড়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে টেকসই নদীভাঙন রোধসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন পাঁচ সহস্রাধিক কোটি টাকা।
বেশ কিছু নদী শাসন ও ভাঙন রোধ প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী এখনো পুনর্গঠন পর্যায়ে রয়েছে। কিছু প্রকল্প-প্রস্তাবনা ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট’ তহবিলের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। আবার কিছু প্রকল্পের নকশা প্রণয়নসহ অধিকতর যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রকল্প কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির বিবেচনাধীন বলেও জানা গেছে। আবার কিছু প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের প্রি-একনেকে বিবেচনাধীন। কয়েকটি প্রকল্প-প্রস্তাবনা বিবেচনা না করেই ফেরত দেয়া হয়েছে বোর্ড থেকে।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে বরিশাল জেলার ৮টি স্থানে নদীভাঙন রোধে প্রায় ৮৮৭ কোটি টাকা, পটুয়াখালীর ৩টি নদীভাঙন রোধ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৬শ’ কোটি টাকা, ভোলায় মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জনপদ রক্ষায় ৮টি প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা, ঝালকাঠির সুগন্ধা ও কালিজিরা নদীর ভাঙন থেকে নৌবাহিনীর আঞ্চলিক বেজ স্টেশনসহ ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২শ’ কোটি টাকা এবং বরগুনার ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪২৭ কোটি টাকার প্রকল্প-প্রস্তাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মন্ত্রণালয়সহ পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। এছাড়াও পিরোজপুর জেলার দুটি প্রকল্পের জন্যও প্রায় ৫৪ কোটি টাকা প্রয়োজন। জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার এ দুটি প্রকল্প জিওবির তহবিলসহ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে সুগন্ধা নদীর ভাঙন থেকে বরিশাল-ফরিদপুর-ঢাকা জাতীয় মহাসড়কের দোয়ারিকাতে ‘বীর শ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু’ ও সংযোগ সড়ক রক্ষায় প্রায় ৮ বছর আগে ১১ কোটি টাকার প্রকল্প-প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় এখন প্রয়োজন হবে প্রায় ২৩৫ কোটি টাকা। এ সংক্রান্ত প্রকল্প-প্রস্তাবনাটি আরো প্রায় ১০ মাস আগে একনেকের চ‚ড়ান্ত অনুমোদন লাভ করলেও এখনো দরপত্র পর্যায়ে।
২০১৭-এর নভেম্বরে বরিশাল মহানগরী সংলগ্ন চরবাড়ীয়া এলাকার কির্তনখোলা নদীর ভাঙন রোধে ৩৩১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদন লাভ করলেও তার বাস্তবায়নও বিলম্বিত হচ্ছে একর পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থ সঙ্কটে। প্রকল্পটি নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন খুলনা শিপইয়ার্ড বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় না করায় প্রকল্পের কাজ কাঙ্খিত মাত্রায় এগুচ্ছে না। গত অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ৫০ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে ৫ কোটি টাকারও কম।
মেঘনা, তেঁতুলিয়া, বলেশ্বর, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, বিষখালী ও পায়রাসহ বড় নদ-নদীগুলো উজানের পানি সাগরে নিয়ে যাবার পথে গ্রাস করছে জনপদ ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাসমূহ। কিন্তু তার প্রতিরোধ কার্যক্রমে এখনো যথেষ্ট ধীর গতি। নদ-নদীগুলোর ভাঙন আরো তীব্রতর হয়েছে।
বরিশালে মেঘনা পাড়ের মেহেদিগঞ্জের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। একই অবস্থা বাবুগঞ্জের মীরগঞ্জ ও বিমানবন্দরের উত্তর প্রান্তের সুগন্ধা নদী তীরের মানুষের। সুগন্ধার বুকে বিলীন হয়েছে বীর শ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতুর উজানে একটি স্কুল ভবন ও মসজিদ। কুয়াকাটা সাগর সৈকত ক্রমশ সংকুচিত হয়ে উপক‚লীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আঘাত হানলেও গত দশ বছর ধরে শুধু নানা ধরনের গবেষণা আর সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। অতিসম্প্রতি পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামিম সরেজমিনে কুয়াকাটা পরিদর্শন করে ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছেন। ভোলায় ভাঙন রোধে একাধিক প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হলেও অর্থের অভাবে ক্রমশ তা গতি হারাচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: স্রোত


আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ