Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ৮ কার্তিক ১৪২৭, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

মোর্তাদ উরায়নীদের নানা অপরাধের বিস্ময়কর কাহিনী

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০১ এএম

অবাক করার মতো ঘটনা। রসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম চিন্তাও করতে পারেননি দলটি রসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করে সুবিধা গ্রহণ করার পর গাদ্দারী করতে পারে। তারা উট চালকদের অকারণে হত্যা করতে পারে, উট চুরি করে নিয়ে যেতে পারে এবং সবাই একযোগে ধর্মচ্যুত (মোর্তাদ) হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের এতগুলো অপরাধকর্মে লিপ্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল, চুরির শাস্তি হাত কর্তন, হত্যার বদলা হত্যা এবং মোর্তাদের শাস্তি হত্যা, এ রূপ শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার ঘটনা এটাই ছিল ইসলামে প্রথম। হাদীস গ্রন্থে এ ঘটনা ও শাস্তির বিবরণ রয়েছে। কঠোর বা নিষ্ঠুর শাস্তির মধ্যে একে গণ্য করা হলেও অপরাধে যে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা হয়েছিল, সে অনুপাতে অপরাধী চক্রকে দেয়া শাস্তিকে কঠোর বলা যায় না।

আরবের ‘উক্ল’ ও ‘উরায়না’ সম্প্রদায়ের একদল লোক মদীনায় রসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে ইসলাম গ্রহণ করে। সেখানে কিছু দিন অবস্থান করার পর তারা হজরত (সা.)-এর নিকট অভিযোগ করে যে, মদীনার আবহাওয়া তাদের অনুক‚ল হচ্ছে না। রসূলুল্লাহ (সা.) তাদের ‘বায়তুল মেলান’ নামক তৃণলতা আচ্ছাদিত একটি স্বাস্থ্যকর স্থানে অবস্থান করার অনুমতি দান করেন। স্থানটি মদীনাবাসী মুসলমানদের উট চারণের জন্য নির্ধারিত ছিল।

এ সকল নবদীক্ষিত লোক সেই স্থানে অবস্থান করার পর শক্তি ও স্বাস্থ্য লাভ করে মুসলমানদের উট অপহরণের জন্য ষড়যন্ত্র করতে থাকে এবং একদা সুযোগ মতো মুসলমান উট চালকদের হত্যা করে উটপালসহ পালিয়ে যায়। মদীনার মুসলমানগণ এই সংবাদ পেয়ে দ্রুত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং তাদেরকে ধরে ফেলেন ও বন্দি করে মদীনায় হজরত (সা.)-এর খেদমতে পেশ করেন। চুরি, ডাকাতি, বিশ্বাসঘাতকতা ও নরহত্যার অভিযোগে এ সকল লোককে হজরত (সা.) কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহতাআলা এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং জগতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদেরকে শুলবিদ্ধ কর অথবা তাদের হস্তসমূহ ও তাদের পদসমূহ বিপরীত দিক হতে কর্তন কর, কিম্বা তাদেরকে দেশ হতে বহিষ্কার কর। এটাই তাদের পার্থিব প্রতিফল এবং পরকালে তাদের জন্য ভীষণ শাস্তি রয়েছে।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াত: ৩৩)

এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কোরআনের তফসিরকারগণ বলেন যে, শত্রুর আক্রমণ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিদ্রোহ-বিপ্লব, চুরি-ডাকাতি ও অন্যায়-অত্যাচারে দেশের শান্তিভঙ্গ এবং লোকের ধন, প্রাণ বিপন্ন হলে প্রয়োজনবোধে দেশের শান্তি, অখন্ডতা, ধন-প্রাণ প্রভৃতি রক্ষার জন্য তার সমস্ত বিধিই অবলম্বিত হতে পারে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.) প্রমুখ এই মত সমর্থন করেন।

জঙ্গে বদরের পর মক্কা ও মদীনার যে সকল অবিশ্বাসী ও মোনাফেক মনে করত যে, ‘আমরা বেঁচে গেছি, অতঃপর আমাদের কোনই অনিষ্ট হবে না।’ আল্লাহতাআলা তাদেরকে ভবিষ্যদ্বাণী স্বরূপ শুনিয়ে দেন যে, ‘তোমরা কখনই বাঁচতে পারবে না, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে অবিশ্বাস ও কপটতার শাস্তি ভোগ করতে হবে। বদর যুদ্ধে শত্রুদল পরাস্ত এবং মুসলমানেরা বিজয়ী হলেও তাদের অবস্থা নিরাপদ এবং সুরক্ষিত ছিল না। যে কোন মুহূর্তে প্রবল পরাক্রান্ত শত্রুদল কর্তৃক তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা ও সম্ভাবনা ছিল। তাই আল্লাহতাআলা মুসলমনাদের আদেশ করলেন যে, ‘তোমরা নিজেদের শক্তি অনুসারে যতদূর সম্ভব যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও এবং অস্ত্র-শস্ত্র ও অশ্ব সংগ্রহ কর। তাহলে আল্লাহর এবং তোমদের শত্রু, অবিশ্বাসী দল তোমাদেরকে আক্রমণ করতে ভীত হবে এবং তোমাদের অপরিজ্ঞাত গোপন শত্রু, কপট বিশ্বাসীগণ তোমাদের অনিষ্ট সাধন হতে বিরত থাকবে।’ তাই আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ও সমর সজ্জার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে আল্লাহতাআলা বলেন, ‘এবং অবিশ্বাসকারীরা যেন এরূপ ধারণা না করে যে তারা অগ্রগামী, নিশ্চয় তারা অতিক্রম করতে পারবে না।’ ‘এবং তোমরা সাধ্য পক্ষে যতদূর সম্ভব তাদের জন্য প্রস্তুত হও এবং অশ্বগুলোকে সম্মুখে বেঁধে তা দ্বারা আল্লাহর শত্রুকূল ও তোমাদের শত্রুকূলকে ভয় প্রদর্শন কর এবং তা ব্যতীত অন্যান্যদেরকেও, যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন।’ (সূরা: আনফাল, আয়াত: ৫৯,৬০)

ওহোদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িকভাবে অচিন্তনীয় পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহতাআলা ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন যে, ‘যদিও অবিশ্বাসীরা ধন-বল ও জনবলে প্রবল, তথাপি সত্য ধর্মের বিরুদ্ধাচরণের ফলে আমি তাদের অন্তরে এরূপ ভীতির সঞ্চার করব যে, মুসলমানদের সম্মুখ হতে তারা ভীত ও কম্পিত হয়ে পলায়ন করবে।’ কোরআনে আল্লাহতাআলা এ দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘যারা অবিশ্বাস করেছে, আমি সত্বর তাদের অন্তরসমূহে ভীতি সঞ্চার করব, যেহেতু তারা আল্লাহর সাথে সেই বিষয়ের অংশী স্থাপন করেছে, যে বিষয়ে তিনি কোনো প্রমাণ অবতরণ করেননি এবং নরকাগ্নি তাদের স্থান এবং তা অত্যাচারীগণের নিকৃষ্টতম বাসস্থান।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৫১)

মদীনার ইহুদীগণ যখন ইসলামের প্রবল পরাক্রান্ত শত্রু অবিশ্বাসী কোরেশদের সাথে সম্মিলিত হয়ে ইসলাম ধ্বংসের জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন, ‘দুঃখ প্রদান ব্যতীত তারা তোমাদের কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না এবং যদি তোমাদের সাথে সংগ্রাম করে, তবে তোমাদের সম্মুখে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে, অতঃপর তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ এবং মানুষের কাছে আত্মসমর্পণ ব্যতীত তারা যেখানেই অবস্থান করুক, লাঞ্চনায় আক্রান্ত হয়েছে, আল্লাহর কোপে নিপতিত হয়েছে এবং দারিদ্র্যে আক্রান্ত হয়েছে, তা এই জন্য যে, তারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি অবিশ্বাস করেছিল এবং অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করেছিল, যেহেতু তারা বিরুদ্ধাচরণ ও সীমা অতিক্রম করেছিল।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১১১-১২)

হজরত রসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ববর্তী হজরত মূসা, ইউসা প্রমুখ যে সব নবী আল্লাহর অনুগত ধর্মপ্রাণ লোকদের সাথে সত্য ধর্মের বিরোধী, অবিশ্বাসী কাফেরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন, আল্লাহতাআলা তাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুসলমানদের বলেছেন যে, ‘ঐ সকল প্রভূভক্ত লোক ধর্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়ে, আপদ-বিপদ ও বিঘ্ন-বিড়ম্বনায় ভীত কিম্বা বিচলিত হননি, তারা সর্বদা অসীম ধৈর্য্যরে সাথে নিজেদের কর্তব্য পালন করে গেছেন। অতএব, তোমরাও যদি ধৈর্য্যাবলম্বন করে তোমাদের রসূলুল্লাহ (সা.) এর অনুসরণ করতে পার, তবে তোমরাও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে, যেহেতু আল্লাহ ধৈর্য্যশীলগণকে ভালবাসেন।’ আল্লাহ বলেন, ‘এবং এমন নবীগণ ছিলেন যাদের সহযোগে প্রভূভক্ত লোকেরা যুদ্ধ করেছিল, পরন্তু তাতে তারা নিরুৎসাহ ও শক্তিহীন হননি এবং বিচলিত হননি এবং আল্লাহতাআলা ধৈর্য্যশীলগণকে ভালবাসেন এবং এ ছাড়া তাদের কথা ছিল না- তারা বলত হে আমাদের প্রভূ, প্রতিপালক! আমাদের অপরাধ ও আমাদের অতিরিক্ত কার্য্য ক্ষমা এবং আমাদের চরণ সুদৃঢ় কর ও অবিশ্বাসীগণের উপর আমাদেরকে সাহায্য কর।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৬-৪৭)

অন্যত্র আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘নাছরুমমিনাল্লাহি ওয়া ফাত হুন কারিব’, অর্থাৎ- আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী, মোমেন মুসলমানদের জন্য এটাই সুসংবাদ। কোরআনের উদ্ধৃত আয়াতসমূহ উরায়নীদের বিস্ময়কর ঘটনার আলোকে অবতীর্ণ হয়েছে বলে বিভিন্ন তফসিরী ভাষ্য হতে জানা যায়। বোখারী ও মুসলিমে হজরত আনাস (রা.)-এর বর্ণনাটি এরূপ যে, রসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বনি উকল বা বনি উরায়নার কতিপয় লোক আসে। ওরা দুর্বলতার কারণে প্রায় মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছিল এবং ওরা ইসলাম গ্রহণ করে এবং মদীনার আবহাওয়া প্রতিক‚ল না হওয়ায় রসূলুল্লাহ (সা.) ওদেরকে নির্দেশ দেন, ওরা যেন জাকাতের উটগুলোর কাছে গমন করে এবং সেগুলোর প্রস্রাব (ওষুধ হিসেবে) এবং দুধ পান করে। ওরা এ নির্দেশ মতো কাজ করে এবং সুস্থ হয়ে যায় ও মোটা তাজা হয়ে উঠে। অতঃপর ওরা মোর্তাদ হয়ে যায় এবং রাখালকে হত্যা করে ও উটগুলো নিয়ে পলায়ন করতে থাকে। খবর পেয়ে রসূলুল্লাহ (সা.) ওদের পশ্চাতে লোক প্রেরণ করেন। ওরা তখনো বেশি দূর অতিক্রম করতে পারেনি, ওদেরকে পাকড়াও করা হয় এবং রসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির করা হলে তাঁর নির্দেশে ওদের হাত, পা কর্তন করা হয়, ওদের চোখ ফুড়ে দেয়া হয়। অতঃপর ওদেরকে কয়েদ করার নির্দেশ দেন, সেখানে ওরা মারা যায়।

আবু কালাবা বলেন, উরায়নীরা চুরি করেছিল এবং হত্যা করে ও ঈমান আনার পর কাফের হয়ে যায় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ কারণেই এ ধরনের কঠোর শাস্তি ওদের প্রদান করা হয়। মোসান্নাফে আবদুর রাজ্জাকে সাঈদ ইবনে মোসাইয়্যেব এবং আবু উবায়দার কিতাবে মোহাম্মদ ইবনে সীরীন বলেন। এ ঘটনা রসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সূরা মায়েদার আয়াত ‘আল্লাজিনা ইউহারেবু নাল্লাহা ওয়া রাসূলাহু’ নাজেল হওয়ার পরের ঘটনা। এতদসংক্রান্ত আয়াতগুলোর অর্থ পূর্বে প্রদত্ত হয়েছে। বোখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় ওদের সংখ্যা ৮ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওরা রাখালদের চোখ ফুড়ে দিয়েছিল। আনাস (সা.)-এর বর্ণনায়; তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘চোখ কীভাবে ফুড়ে দেয়া হয়েছিল?’ তিনি বলেন, ‘লোহার শিক গরম করে তা নয়ন যুগলের নিকট এমনভাবে ধরা হতো যে, তা পানি হয়ে বয়ে যেতো।



 

Show all comments
  • Jack Ali ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১:০৬ পিএম says : 0
    Since liberation what about all the government who ruled our Beloved Country against the Law of Allah-- aren't they murtard/taghut??????????????
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ