Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ৪ কার্তিক ১৪২৭, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যার নানা দিক-১

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০২ এএম

বাংলাভাষায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত একটি শব্দ, আত্মহত্যা। এর মূল ফার্সি হচ্ছে ‘খোদ কুশি’, যা উর্দুতেও স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছে। পবিত্র কোরআনে সূরা ‘কাওসারে’ বলা হয়েছে: ‘ফাসাল্লিলি রাব্বিকা ওয়ানহার’। অর্থাৎ নামাজ পড়–ন আপনার প্রভুর জন্য এবং কোরবানি করুন। এখানে আমাদের আলোচনা ‘নহর’ শব্দ নিয়ে।
আরবিতে বলা হয় ‘নাহারা’/‘ইয়ানহারু’, অর্থাৎ সে কোরবানি করেছে বা করবে। শাব্দিক অর্থে ‘নাহরুন’ বলা হয় উটের গলায় বর্ম বা ছুরি দিয়ে জবাই করা বা সামনা সামনি করা। এর বহুবচন ‘নুহুর’। বলা হয়‘ ইয়াওমুন নুহুর বা ইয়াওমুন নাহ্রে। অর্থাৎ হজ্জ্বের সময় কোরবানির দিন ১০ জিলহজ্জ্ব। ‘নাহরুন’ শব্দটির রূপান্তরিত বহুদিকের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ইন্তেহার’। এর আভিধানিক অর্থ হলো আত্মহত্যা করা, একে অপরের গলা চিপে ধরা, লাঠিদ্বারা প্রহার করা ইত্যাদি। আধুনিক আরবিতে আত্মহত্যা করার অর্থ ‘ইন্তেহার’ ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

এ সংক্ষিপ্ত তাত্তি¡ক পটভ‚মিকার আলোকে আত্মহত্যার নানা দিক আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করব। কেননা আত্মহত্যা কেবল আমাদের জাতীয় সমস্যা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে একটি জটিল সমস্যাও বটে। যেহেতু আত্মহত্যা কোনো জাতি বিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, জাতি-সম্প্রদায় নির্বিশেষে তা সারা বিশ^বাসীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক অসমাধানযোগ্য সমস্যারূপে আবহমানকাল হতে বিদ্যমান। এর বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো সুরাহা করা সম্ভব হয়েছে বলেও দাবি করার উপায় নেই। এমনকি, ইতিহাসে বিভিন্ন বিজ্ঞানী, মনীষীর আত্মহত্যা করে প্রাণ বিসর্জন দেয়ার দুঃখজনক ঘটনারও অভাব নেই।

মুসলমান হিসেবে আত্মহত্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে হলে ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন না করে গত্যন্তর শেষ নেই। দুনিয়ার সমস্যাবলির মধ্যে আত্মহত্যা কেবল একটি জটিল সমস্যা নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে মহাপাপও বটে। এ পাপ হতে আত্মরক্ষার বাস্তব উপায়ও ইসলাম বাতলে দিয়েছে। এ পর্যায়ে প্রথমে আমরা ইতিহাস হতে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে চাই, যাতে আত্মহত্যার স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যেহেতু আমাদের আলোচনার মূল বিষয় আত্মহত্যার গর্হিত পাপ রূপটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করা। এ ক্ষেত্রে আমরা ‘ওহোদ’ যুদ্ধে সাইয়্যুদুশ শোহাদা হজরত আমির হামজা (রা.)-এর হত্যাকারী ওয়াহশীর ইসলাম গ্রহণের পর শেষ জীবনে আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ এবং হজরত উমর (রা.)-এর ওপর প্রাণঘাতী হামলাকারী কুখ্যাত ফিরুজ আবু লুলুর আত্মহত্যার কাহিনীর কথা স্মরণ করতে চাই। দুটি ঘটনাই ইতিহাসখ্যাত, সকলের জানা।

ইমলামী ইতিহাসে দ্বিতীয় যুদ্ধ ‘ওহোদ’ সংঘটিত হয় হিজরি তৃতীয় সালে। কাফেরদের সাথে এ যুদ্ধে রসূলুল্লাহ (সা.)-এর অতি প্রিয় আপন চাচা হজরত আমির হামজা (রা.) ওয়াহশীর হাতে শাহাদত বরণ করেন এবং তাঁর লাশের প্রতি চরম অবমাননা করা হয়। হুজুর (সা.) এতে অত্যন্ত ব্যথিত ও শোকাহত হন। পরবর্তীকালে নানা কৌশলে ওয়াহশী ইসলাম গ্রহণ করে। রসূলুল্লাহ (সা.) তার সম্পর্কে বলে রেখেছিলেন, ওয়াহশী যেহেতু ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার সম্পর্কে বলার কিছু নেই, কিন্তু সে যেন হুজুর (সা.)-এর সামনে না আসে। তাকে দেখলে হুজুর (সা.)-এর চাচা ওহোদের শহীদ হজরত আমির হামজা (রা.)-এর কথা মনে পড়ে এবং এতে তিনি খুবই মর্মাহত হন।

হিজরি দ্বাদশ মোতাবেক ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদার বনি হানিফার কুখ্যাত মোসায়লামাতুল কাজ্জাব ‘হাদিকাতুল মওত’ (মৃত্যুর বাগান নামে খ্যাত) যুদ্ধে নিহত হয়। হত্যাকারীদের মধ্যে ওয়াহশীর নামও বর্ণিত হয়ে থাকে। ওয়াহশী গর্ববোধ করে বলত, সে ইসলামের সেরা ব্যক্তিত্বের (হজরত আমির হামজা রা.) যেমন হত্যাকারী, তেমনি কোফরের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মোসায়লামাতুল কাজ্জাবকে হত্যা করে পাপের প্রায়াশ্চিত্য করেছে। কিন্তু ওয়াহশীর কপাল মন্দ, শেষ জীবনে সে কোনো কারণবশতঃ আত্মহত্যা করে জীবনের সর্বনাশ করেছে বলে ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে।

দ্বিতীয় আত্মহত্যাকারীর নাম ফিরুজ আবু লুলু। দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর উপর মারাত্মক হামলা করে ধরা পড়লে আত্মহত্যা করে এবং দুনিয়ার শাস্তি হতে সে রক্ষা পেয়ে গেলেও জাহান্নামবাসী হয়ে যায়।
ওয়াহশী ও আবু লুলু, এ দুই কমবখতের আত্মহত্যার ধরণ ও কারণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও, মুসলিম নামধারী প্রত্যেক আত্মহত্যাকারীকে বিভিন্ন হাদীসের মাপকাঠিতে তুলনা করতে হবে। বিশেষত রসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাদানী জীবনে আত্মহত্যার বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ করলে আত্মহত্যার কারণ ও প্রতিকারের সঠিক উপায় উদ্ভাবন করা সহজ। তাই পরবর্তী আলোচনায় আত্মহত্যা সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীসের অর্থ উদ্ধৃত করার আশা রইল।



 

Show all comments
  • দর্শন ই ইসলাম ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২৩ এএম says : 0
    আত্মহত্যা থেকে বিরত থাকতে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন এবং আত্মহত্যার পরিণামে কঠোর শাস্তির বর্ণনা দিয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু এবং যে কেউ সীমা লঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করব; এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯-৩০)
    Total Reply(0) Reply
  • Yeasir Arfat ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২১ এএম says : 0
    আত্মহত্যা নিঃসন্দেহে মারাত্মক অপরাধ। ইসলামি শরিয়তে আত্মহত্যা করা হারাম।
    Total Reply(0) Reply
  • মেহেদী ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২২ এএম says : 0
    আত্মহত্যা করা কবিরা গোনাহ। আর কবিরা গোনাহ তাওবার দ্বারা মাফ হয়। কিন্তু আত্মহত্যাকারীর জন্য যদিও তাওবার সুযোগ নেই। তাওবা করতে না পারলেও আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে ঈমানদার হওয়ার কারণে দীর্ঘ শাস্তি ভোগের পর নিজ রহমতে আত্মহত্যাকারীকেও মাফ করে দিতে পারেন।
    Total Reply(0) Reply
  • তোফাজ্জল হোসেন ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২৩ এএম says : 0
    ইসলামে আত্মহত্যা মহাপাপ ও অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ হওয়া সত্ত্বেও এমন অনেক লোক আছে, যারা জীবনযাপনের কঠিন দুঃখ-দুর্দশা ও ব্যর্থতার গ্লানি থেকে পরিত্রাণের জন্য অথবা জেদের বশবর্তী হয়ে বেছে নেয় আত্মহননের পথ।
    Total Reply(0) Reply
  • বাতি ঘর ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২৩ এএম says : 0
    ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা ও দৃঢ় আস্থা থাকলে কারও আত্মহত্যার মতো ক্লেশকর পথে পা বাড়াতে হয় না।
    Total Reply(0) Reply
  • গাজী মোহাম্মদ শাহপরান ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২৪ এএম says : 0
    আজকাল আত্মহত্যার ঘটনা প্রায়ই সংঘটিত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এমন প্রবণতা বেশি। বখাটেদের উৎপাতের কারণে কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে, আবার মা-বাবার সামান্য বকুনির কারণেও আত্মহননের মতো ঘটনা ঘটছে। পারিবারিক বিপর্যয়, মানসিক অশান্তি, সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গেও জড়িত আছে আত্মহত্যার মতো ধ্বংসাত্মক ঘটনা। এসব আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ। ফলে ভারসাম্য হারিয়ে তা সহ্য করতে না পেরেই আত্মহননের মধ্য দিয়ে দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিরা মুক্তি খোঁজে।
    Total Reply(0) Reply
  • সাইফুল ইসলাম চঞ্চল ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২৪ এএম says : 0
    আত্মহত্যা একটি ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি। মাঝেমধ্যেই পত্রিকার পাতায় আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশিত হতে দেখা যায়। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হতাশ নারী-পুরুষ বেছে নেয় আত্মহননের দুর্ভাগ্যজনক পথ।
    Total Reply(0) Reply
  • তাসফিয়া আসিফা ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৩:২৫ এএম says : 0
    ইসলামের ওপর বিশ্বাসী সব আত্মহত্যাকারীকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করুন। মুসলিম উম্মাহকে আত্মহত্যার মতো বড় অপরাধ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

১৬ অক্টোবর, ২০২০
১৬ অক্টোবর, ২০২০
১৬ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ