Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামাতে ফের প্রতিশ্রুতি ভারতের

সম্মেলনে ১৪ বিষয়ে সম্মত বিজিবি-বিএসএফ নতুন কাঁটাতারের বেড়া বসাতে চায় ভারত ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোনো আস্তানা বাংলাদেশে নেই : ডিজি বিজিবি

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০১ এএম

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যার হার আবারও শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা। বৈঠকের আলোচ্য সূচির এক নম্বরে ছিল সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি/হত্যা/আহত করা। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সম্মেলন শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গতকাল শনিবার এ কথা জানান বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের ৫০তম সীমান্ত সম্মেলন শেষে যৌথ বিবৃতিতে এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

একইসঙ্গে বিজিবি ডিজি সা¤প্রতিক সময়ে ভারতের মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের (পাগল) অনুপ্রবেশ বা জোরপূর্বক পুশ-ইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানান। পরে যৌথে ঘোষণাপত্রে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের জাতীয়তা যাচাই করতে এবং একে অপরের সহযোগিতায় তাদের হস্তান্তর ও গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। সে কারণে হত্যার ঘটনা ঘটছে। এই ব্যর্থতা বিজিবির কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে সাফিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। নদীনালা, পাহাড়-পর্বত আছে। তারপরও এখন ৫ কিলোমিটার পরপর সীমান্ত চৌকি আছে।

বিএসএফের মহাপরিচালক বলেন, হত্যাকান্ডের বেশির ভাগ ঘটনা ঘটছে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যে। তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন, হত্যাকান্ডের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। এ জন্য বিজিবি-বিএসএফ সীমান্তে যৌথ টহল দেবে এবং এলাকার লোকজনের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। সম্মেলনে বাংলাদেশ ও ভারত ১৪ দফা সিদ্ধান্ত নিলেও সংবাদ সম্মেলনজুড়ে বারবারই সীমান্ত হত্যার প্রসঙ্গ আসে।
২০০০ সালের পর থেকে হত্যাকান্ডের ঊর্ধ্বগতি কেন? বিএসএফ বরাবর বলে আসছে তারা আক্রান্ত হলেই কেবল গুলি ছোড়ে। তাহলে গুলি কি দেহের ওপরের অংশে? ঠাকুরগাঁওয়ে স¤প্রতি সকাল ১০টায় মাছ ধরার সময় গুলি করে বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনা কেন ঘটল? এসব প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। একপর্যায়ে বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যার বাইরের ইস্যুতে প্রশ্ন করার পরামর্শ দেয়া হয়।

বিএসএফের মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে যৌথ টহল বন্ধ থাকায় অপরাধ কিছুটা বেড়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বলা হয়েছে ননলেথাল উইপনস (মৃত্যু ঘটায় না এমন অস্ত্র) ব্যবহার করতে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালেই তাদের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিএসএফের ওপর দল বেঁধে হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনাতেই তদন্ত করা হয়েছে। শুধু যে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন তা নয়। ভারতীয় নাগরিকরাও ওই সব ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

বারবার একই প্রতিশ্রæতি দেয়া ও সীমান্তে হত্যাকান্ড চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রাকেশ আস্থানা বলেছেন, তিনি বিএসএফে নতুন যোগ দিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। বিএসএফের মহাপরিচালক ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে মাদক বাংলাদেশে ঢোকার কথা স্বীকার করেছেন। মাদক নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন। মাদকসহ যেকোনো পাচারের ইস্যুতে দুই পক্ষ নিয়মিত তথ্য বিনিময়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
১৪ বিষয়ে সম্মত : বিজিবি ও বিএসএফয়ের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫০তম সীমান্ত সম্মেলনে ১৪ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই বাহিনী। এগুলো হচ্ছে, সীমান্তে উভয় দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা, আহত, মারধরের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ঝুঁঁকিপূর্ণ সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথ টহল বৃদ্ধি, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও বেগবান এবং প্রয়োজনমাফিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণসহ সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন।

ঝুঁঁকিপূর্ণ সীমান্তে যৌথ টহল পরিচালনাসহ সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ এবং সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা আইনের বিধি-বিধান সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সীমান্তে হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে।

সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা-সিবিএমপির ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সিবিএমপি বাস্তবায়ন এবং উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপকৃত হবে এমন তাৎক্ষণিক ও দরকারি তথ্য বিশেষ করে অধিকতর তদন্তের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র চোরাকারবারিদের ডিজিটাল ফটোগ্রাফ উভয় বাহিনীর মধ্যে শেয়ার করতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে।

উভয় পক্ষই সীমান্তে অপরাধ দমন এবং আন্তর্জাতিক সীমানার অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের আশ্বাস দিয়েছেন। মানবপাচার ও অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়। উভয় বাহিনীর মহাপরিচালক যার যার দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মানবপাচারে ক্ষতিগ্রস্তদের যত দ্রæত সম্ভব তাদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের সুবিধার্থে সহায়তা করতেও সম্মত হয়েছেন।
উভয় পক্ষই আর্ন্তাতিক সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া কেটে অপসারণ, বেড়ার ক্ষয়ক্ষতিরোধে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত এবং নিয়মিত যৌথ টহল পরিচালনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন। উভয়পক্ষই অবৈধভাবে সীমানা অতিক্রম, সীমানা লঙ্ঘন থেকে সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে বিরত রাখতে সম্মত হয়েছে এবং একই সঙ্গে উভয় বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন।

এতে আরো বলা হয়েছে, সা¤প্রতিক সময়ে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ, জোরপূর্বক পুশইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের জাতীয়তা যাচাই এবং একে অপরের সহযোগিতায় তাদের হস্তান্তর, গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে।
উভয়পক্ষই পূর্ব অনুমোদন ছাড়া ১৫০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ না করার বিষয়ে পারস্পরিক সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। উভয়পক্ষই বন্ধ থাকা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ যত দ্রæত সম্ভব সমাধানের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।

যৌথ নদী কমিশনের অনুমোদন অনুযায়ী সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণে সহায়তা প্রদান এবং অননুমোদিতভাবে অভিন্ন সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ না করতে উভয়পক্ষই সম্মত হয়েছে। উভয়পক্ষই বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করে বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট ও রিট্রিট সেরিমনি উপলক্ষে দর্শক গ্যালারি নির্মাণে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে।
বিএসএফ মহাপরিচালক সন্দেহভাজন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবি ও বাংলাদেশের অন্যান্য বাহিনীর গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা এবং বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ধ্বংস করতে বিজিবির অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে নতুন ডিজাইনের একসারি বিশিষ্ট কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়ে পয়েন্ট উত্থাপন করেন। এ প্রেক্ষিতে বিজিবি মহাপরিচালক জানান যে, নতুন ডিজাইনের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ না করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

উভয়পক্ষ সীমান্তে অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক দ্রব্য, মাদক, স্বর্ণ এবং জালমুদ্রা পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয়েছেন। সীমান্তে চোরাচালানী দ্রব্যসহ আটক ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য এবং উভয় বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিবেদন বিনিময়ের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছেন।

এছাড়া বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফ মহাপরিচালককে আসন্ন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিজিবি এয়ার উইংয়ের দুটি হেলিকপ্টারের অধিকতর ট্রেনিং ও অপারেশনাল ফ্লাইটের বিষয়ে অবহিত করেন এবং যে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা ভুল বুঝাবুঝি এড়াতে তাকে তার বাহিনীর প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত অবহিত করার অনুরোধ জানান। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, এ ব্যাপারে বিজিবি কর্তৃক বিএসএফের মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদেরকে পূর্বেই অবগত করা হবে।

বিএসএফ মহাপরিচালক বিজিবি থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রাপ্তির পর স্থানীয় বিএসএফ ইউনিটকে এ বিষয়ে নির্দেশ প্রদানের আশ্বাস দেন। বিজিবির ডিজি মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নেন। বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানার নেতৃত্বে ভারতের ৬ সদস্যের প্রতিনিধিদল ডিজি পর্যায়ের ৫০তম সীমান্ত সম্মেলন অংশ নেন।



 

Show all comments
  • সৈয়দ আদনান ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:৩৯ এএম says : 0
    ভারত কে বিশ্বাস আর গোখরা র সাথে বসবাসের সমান।
    Total Reply(0) Reply
  • saif ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৯:৪২ এএম says : 0
    এখনও যারা ভারতের এই মিথ্যে আশ্বাসে বিশ্বাস করেন এবং করতে বলেন, তারা হয়তো ভারতেরই পালিত......... আর নয়তো নিছক নির্ভোদ অন্ধ মুর্খ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার শবছেয়ে বড় শত্রু, যাদেরকে নব্য রাজাকার বলাযায়।
    Total Reply(0) Reply
  • Nannu chowhan ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৭:২০ এএম says : 0
    Eaishob proti sruti millohin karon ageo eairokom dipakkhik boithoker por varotiora eai rokomoi montobbo koresilo,er por dinoi shimante bangladeshi hotta kora hoy..
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিজিবি

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন