Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

দায় স্বীকার করে রবিউলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

ইউএনওর ওপর হামলা

দিনাজপুর অফিস | প্রকাশের সময় : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০০ এএম

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছেন মালি রবিউল ইসলাম। হামলা সে একাই করেছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক ইমাম জাফর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আদালতে রবিউল ইসলাম হামলার ঘটনায় নিজের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি দেয়ার পর তাকে দিনাজপুর জেল কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এর আগে সকাল ১০ টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রবিউলকে আদালতে আনা হয়। সরাসরি তাকে জবানবন্দি গ্রহনের জন্য বিচারকের খাস কামরায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিধি মোতাবেক তাকে সুস্থ মস্তিস্কে চিন্তা ভাবনার জন্য সময় দেন মাননীয় বিচারক। ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত ইউএনও ও তার বাবাকে হত্যা চেষ্টার ঘটনাটি নিয়ে র‌্যাব, পুলিশ, সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্তে নামে। ঘটনার একদিন পরেই আইন শৃংখলা বাহিনী ঘোড়াঘাট পৌর যুবলীগের আহবায়ক জাহাঙ্গীল, যুবলীগ কর্মী আসাদুল, নবিরুল, নৈশ প্রহরী নাজিম হোসেন পলাশ ও সেন্টুসহ আরো একাধিক ব্যাক্তিকে গ্রেফতার করে। গত ৪ সেপ্টেম্বর র‌্যাব-১৩ রংপুর কার্যালয়ে স্বীকারোক্তি মোতাবেক হামলাকারী হিসাবে আসাদুলকে উল্লেখ করে আসাদুল, সেন্টু ও নবিরুলকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর।

তবে অসুস্থতার কারণে আসাদুলকে একদিন পর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পর দিন ওই দিন র‌্যাব কর্তৃপক্ষ জাহাঙ্গীর ও পলাশকে ছেড়ে দেয়ার কথা জানায়। যদিও জাহাঙ্গীর বাসায় ফিরলেও পলাশকে পাওয়া যায়নি। হস্তান্তরের পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর তদন্তকারী কর্তপক্ষ গোয়েন্দা পুলিশ প্রথমে নবিরুল ও সেন্টুকে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। একদিন পর আসাদুলকেও আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইলে তারও ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

এর পর ১২ সেপ্টেম্বর পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্রাচার্য উপজেলা পরিষদের মালি রবিউলকে আটকের কথা জানান। প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, ইতিপূর্বে ইউএনও’র ব্যাগ থেকে টাকা চুরি এবং পরে তা ফেরত প্রদান করে। টাকা ফেরতের পরও তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এই ক্ষোভেই সে ইউএনওর উপর হামলা চালায়। ইতিপূর্বে র‌্যাব পুলিশ সকল পক্ষ থেকেই সিসিটি ফুটেজ অনুসারে হামলাকারী দুজন বলা হলেও এখন হামলাকারী একাই রবিউল বলে পুলিশ উল্লেখ করেছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে আর কাউকে আটকের কথা বলা হয়নি। ডিআইজি প্রেস ব্রিফিং শেষ করার কিছুক্ষণ পরেই আদালতে মোট চার জনকে হাজির করা হয়। গনমাধ্যম কর্মীরা মূলত আসাদুল, রবিউল এবং র‌্যাবের ছেড়ে দেয়া নৈশ প্রহরী পলাশকে দেখতে পায়। অপর আরো একজন খোকন নামে জুয়ারীকে সেদিন আদালতে হাজির করা হয়। এর মধ্যে খোকন আইপিএল জুয়া খেলার কথা স্বীকার করে এবং রবিউল তাকে জুয়ার জন্য ৪৮ হাজার ৫’শ টাকা দেয় বলে স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। পুলিশের ভাষ্য মতে হামলার পর রবিউল ইউএনও’র ঘর থেকে ৫০ হাজার থাকা একটি খাম নিয়ে আসে এবং ওই টাকার মধ্যেই আইপিএলে টাকা লগ্নি করে।

তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ আসাদুল ও পলাশের ব্যাপারে কোনো আবেদন না করে রবিউলকে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বিজ্ঞ বিচারক ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ৬ দিনের রিমান্ড শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর রবিউলকে আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন জানান। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আনজুমান আরা’র আদালতে জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য নেয়া হলেও রবিউল স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ জবানবন্দির আবেদন প্রত্যাহার করে পুনরায় ৭ দিনের জন্য রিমান্ড আবেদন করে। আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

এদিকে,গতকাল সকাল থেকে আদালত পাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এক পর্যায়ে গণমাধ্যমকর্মীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সকাল ১০টার দিকে রবিউলকে আদালতে হাজির করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং রবিউলের ভাইদের অভিযোগ, আগে ছয় দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করার সময় সে সুস্থ ছিল। তবে গতকাল তাকে একেবারে মুমূর্ষ অবস্থায় দেখা গেছে। রবিউলকে আনার পর থেকেই আদালত ভবনের মূল গেটে পোশাকধারী পুলিশ ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় জবানবন্দি প্রদান শেষে রবিউলকে নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যায়।

এ সময় প্রশ্নের উত্তরে তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি’র পরিদর্শক ইমাম জাফর জানান, তাকে জেল কারাগারে নেয়া হয়। এসময় তিনি কোনো প্রশ্ন নয় বলে জানান, রবিউল একাই হামলা চালিয়েছে বলে স্বীকারোক্তি প্রদান করেছে। চাঞ্চল্যকর এই হামলা মামলার ঘটনায় তদন্তের প্রাথমিক সমাপ্তি ঘটে।

অপরদিকে প্রথম দফায় রবিউলের স্বীকারোক্তি প্রদানে অস্বীকৃতি ও তার পরিবারের দাবী ঘটনার রাতে রবিউল বাড়ীতেই ছিল। তাকে কোন মহলের চাপে অথবা অন্য কাউকে আড়াল করতেই রবিউলকে ফাঁসানো হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে আইনি লড়াই করবে বলেও জানানো হয়েছে। এদিকে ঘটনার চাক্ষুস কোনো স্বাক্ষী বা সহযোগী কাউকে না পেলেও পুলিশ অন্তত ৫ জনকে স্বাক্ষী হিসাবে আদালতে জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সাইকেল গ্যারেজে সাইকেল রেখে সেলুনে অবস্থান, ঘোড়াঘাট মুদি দোকানে বসে অপেক্ষা এবং জুয়ায় টাকা লগ্নি করা। অর্থাৎ এদের তথ্য এবং সিসিটিভি’র ফুটেজের ভিত্তিতেই পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে রবিউলই হামলাকারী এবং সেই মোতাবেক জিঙ্গাসাবাদ শেষে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়। রবিউল স্বইচ্ছায় হামলার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।

উল্লেখ্য, গত ২ সেপ্টেম্বর দিনগত রাতে ইউএনও ওয়াহিদার সরকারি বাসভবনের ভেন্টিলেটর ভেঙে বাসায় ঢুকে ওয়াহিদা ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে ইউএনও ও তার বাবাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে ইউএনওকে প্রথমে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (রমেক) নিয়ে ভর্তি করা হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে তাকে ঢাকায় আনা হয়। পরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। অপরদিকে গত ১২ সেপ্টেম্বর তার বাবাকেও রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। পরে তাকেও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে মেয়ে ও বাবার চিকিৎসা চলছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইউএনও

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন