Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

একাধিক দুর্যোগ আর করোনা সংকটেও দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে

বরিশাল ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১:৪৮ পিএম

‘মাছে ভাতে বাঙালী’র দক্ষিণাঞ্চলে মৎস্য সেক্টর একাধিক প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ করোনা সংকটের মত স্বাস্থ্য বিপর্যয় কাটিয়ে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ ও মে মাসে আরেক ঝড় ‘আম্পান’-এর পরে গত মাসে ভাদ্রের অমাবশ্যায় ভর করে ফুসে ওঠা সাগরের জোয়ার আর উজানের ঢলের সাথে অবিরাম বর্ষণে দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য সেক্টরে আরো বিপর্যয় ঘটে গেছে। এরসাথে করোনা সংকটে আহরণ ও বিপণনে প্রতিবন্ধকতা সংকটকে আরো ঘনিভূত করে। তবে প্রায় আড়াই লাখ টন মৎস্য উদ্বৃত্ত দক্ষিণাঞ্চলে এসব বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেতে মৎস্যজীবীদের প্রানন্তকর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। 

২০১৬-১৭ সালে দেশ মাছ উৎপাদনে সংম্ভরতা অর্জন করলেও দক্ষিণাঞ্চলে সে সাফল্য এসেছে আরো পাঁচ বছর আগে । গত এক যুগে এ অঞ্চলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭৫%। অথচ এসময়ে দেশে মৎস্য সেক্টরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫৩%। এসময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৭০% বৃদ্ধি পেলেও দক্ষিণাঞ্চলে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১২%-এরও বেশী। দক্ষিণাঞ্চলের ৬ জেলায় ৩ লাখ ২০ হাজার টন চাহিদার বিপরিতে মাছের উৎপাদন ছিল গত বছর প্রায় ৫.৭০ লাখ টন।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, একজন মানুষের দৈনন্দিন মাছের চাহিদা ৬০ গ্রাম হলেও আমাদের দেশে তা ইতোমধ্যে ৬২.৫৮ গ্রাম। দক্ষিণাঞ্চলে তা আরো বেশী। যা ইতোপূর্বে ছিল ৫৩ গ্রাম। এমনকি ইলিশ উৎপাদন ও আহরনে সারা দেশের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের অবদান প্রায় ৭০%-এর কাছে। সম্প্রতিককালে খাঁচায় মাছ চাষ এবং কাকড়া ও কুচিয়া সহ আরো বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তিতে মৎস্য চাষ ও উৎপাদনেও সাফল্য আসছে। আর সাম্প্রতিক করোনা সংকটে সারা দেশের মত দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য সেক্টরেও যে স্থবিরতা ঘিরে ধরেছিল, তা থেকে ইতোমধ্যে উত্তরন ঘটতে শুরু করেছে। বাজারে মাছের ক্রেতা এবং চাহিদা বাড়ায় জেলে ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে আবার আশার সঞ্চার হতে শুরু করেছে। যে যার পেশায় পুরোদমে কাজ করছেন। দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন মোকামে মাছের চালান স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
তবে গত মাসে ভাদ্রের অমাবশ্যায় ভর করে ফুসে ওঠা সাগরের জোয়ার আর উজানের ঢলের প্লাবনে দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য সেক্টরে একটি বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে। ঐ প্লাবনে দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার মৎস্য চাষীর ২৮ হাজারের বেশী পুকুর, দিঘী ও খামারের সাড়ে ৫ হাজার টন মাছ ও ৬শতাধীক টন পোনা ভেসে গেছে। এছাড়াও বিভিন্ন মৎস্য স্থাপনার অবকাঠামোরও ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের মতে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান প্রায় ৭৯ কোটি টাকা বলা হলেও বেসরকারী সূত্রে তা শত কোটিরও বেশী হবে বলে জানান হয়েছে।

কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যজীবীরা থেমে নেই। সরকারী কোন প্রনোদনা বা সহায়তা না পেলেও এ অঞ্চলের মৎস্যজীবীরা তাদের সবকিছু দিয়ে আবার মাছ চাষে নেমেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি ফসলের চেয়ে মাছ চাষে মুনাফা বেশী হওয়ায় গ্রামঞ্চলের মানুষের এ সেক্টরে আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলার ৪ লাখ ২৭ হাজার ৮৪২ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয়, প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর বদ্ধ জলাশয়, দেড় সহস্রারাধিক বেসরকারী মৎস্য খামার, ৫০টির মত সরকারী-বেসরকারী মৎস্য হ্যাচারী, ৯২০টি নার্সারি খামার ছাড়াও প্রায় ৯ হাজার চিংড়ি খামার মৎস্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করছে।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রায় ৫ লাখ জেলে মৎস্য সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল হলেও মৎস্য অধিদপ্তরের নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭২৪। তবে অধিদপ্তরের মতে, এ অঞ্চলে জেলে পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ২৮ হাজারের মত। অধিদপ্তরের অপর এক পরিসংখ্যান অনুাযায়ী দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলাতেই প্রায় সোয়া ৩ লাখ জেলে ইলিশ আহরনে জড়িত। যার ৬৫% সার্বক্ষণিকভাবে কর্মরত বলে মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে বলা হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলায় মোট জলাশয়ের পরিমান ৫৪ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টরের মত । যারমধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২৭ হাজার পুকুর ও দীঘি, ৬৬৭টি বরোপীট, ৯০টি প্রবাহমান নদ-নদী, ৪৩টি বিল, একটি বাঁওড় বা মরা নদী, প্রায় দেড় হাজার খাল ও সোয়া ৬শ প্লাবন ভূমিতে বার মাসই কমবেশী মাছরে চাষ ও আহরন হচ্ছে। এসব জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ২০০৮-০৯ সালে ২ লাখ ৯৮ হাজার টন থেকে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। যার মধ্যে ইলিশের উৎপাদন এ অঞ্চলে ইতোমধ্যে সাড়ে ৩ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।

এছাড়াও রুই জাতীয় মাছ প্রায় ৮০ হাজার টন। পাঙ্গাস, শিং-মাগুর, কৈ, তেলাপিয়া এবং চিংড়ি ছাড়াও অন্যান্য মাছের উৎপাদনও ছিল দেড় লাখ টনের কাছে। গতবছর দক্ষিণাঞ্চলের সরকারী-বেসরকারী ৫০টি হ্যাচারী ও ৯২৩টি নার্সারীতে প্রায় ৩০ হাজার কেজি রেনু ও ৩২ লাখ মাছের পোনা উৎপাদন হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলায় প্রায় দেড় হাজার খাঁচায় বর্তমানে দু হাজার টন বিভিন্ন ধরনের মাছ উৎপাদন হচ্ছে। প্রায় দেড় হাজার মৎস্য চাষী এর সুফল ভোগ করছেন। এছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কাকড়া ও কুচিয়া চাষ স¤প্রসারনেও সাফল্য আসতে শুরু করেছে। এ অঞ্চলের ৫টি জেলার ১১টি উপজেলার পুকুরে কিশোর কাকড়া চাষ, পেনে ও খাঁচায় কাকড়া মোটাতাজা করন ও সামাজিক পর্যায়ে কুচিয়া চাষ-এর ২৫টি প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর ৭৩৫টি খামারে প্রায় ১১০হেক্টর জমিতে ৩শতাধীক টন কাকড়া উৎপাদিত হচ্ছে। যা আমাদের রপ্তানি খাতকে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হচ্ছে।
এছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলের ৮টি উপজেলার প্রায় তিন হাজার মৎসজীবী সহশ্রাধীক টন শুটকী উৎপাদন করছে। যার পুরোটাই কীটনাশক মূক্ত ও রোদে শুকানোর মত লাগসই প্রযুক্তির বলে মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।

‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮’এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জিডিপি’র ৩.৫৭% এবং কৃষিজ জিডিপি’র ২৫.৩০% মৎস্যখাতের অবদান। দক্ষিণাঞ্চলে এ হার আরো বেশী বলে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশেরও বেশী মানুষ মৎস্য সেক্টর থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে।
তবে অব্যাহত নগরায়নে দক্ষিণাঞ্চলেও পুকুর, দীঘি ও খাল ক্রমাগত ভড়াট হচ্ছে। যা মৎস্য সেক্টরের জন্য একটি অশনি সংকেত বলে মনে করছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞগন।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ