Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

৫ দিনের রিমান্ডে তিন হোতা

এমসি কলেজে গণধর্ষণ আসামিদের পক্ষে নেই আইনজীবীরা

সিলেট ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০০ এএম

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ গণধর্ষণ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ৩ আসামিকে ৫ দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন আদালত। তবে আদালতে রিমান্ড শুনানিকালে ধর্ষক সাইফুর রহমান ও অর্জুন লস্কর নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে। এদিকে ধর্ষকদের পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি কোন আইনজীবী। শুনানিকালে আদালতকে আসামিরা জানায়, এই ঘটনা ঘটিয়েছে রাজন, তারেক ও আইনউদ্দিন। দুই ধর্ষকের স্বীকারোক্তিতে গণধর্ষণ ঘটনার সাথে জড়িত হিসেবে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে রাজন ও আইন উদ্দিন। অপরদিকে, ধর্ষণ মামলার ৫ আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদের মধ্যে ‘প্রশ্রয়দাতা’ এক নেতার ফোন ট্র্যাক করে ৪ আসামিকে আইনশৃংখলা বাহিনীর জালে আটকানো সম্ভব হয়েছে। ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে গতকালও বিভিন্ন স্থানে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। একই সাথে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।

৫ দিনের রিমান্ডে ৩ ধর্ষক : গ্রেফতারকৃত ৫ আসামির মধ্যে ৩ জনকে গতকাল সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ২ আদালতে হাজির করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহপরান থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্রাচার্য রাজন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বেলা ১১টা থেকে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশি পাহারার প্রিজন ভ্যানে করে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে সাইফুর ও অর্জুনকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ৭ দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করেন। রিমান্ড শুনানিতে অংশ নিতে আসামিদের পক্ষে কোন আইনজীবী উকালত নামা আদালতে দাখিল করেননি। শুনানিকালে আদালতের বিচারক সাইফুর ও অর্জুনের পক্ষে কোন আইনজীবী না পেয়ে তাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা দুজন আদালতকে জানায়, ছাত্রাবাসের ঘটনার সাথে আমরা জড়িত নই। আমরা কোন অপরাধ করিনি। এই ঘটনা ঘটিয়েছে রাজন, তারেক ও আইনউদ্দিন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে আদালত এই ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশ দেন। এদিকে বিকেল সাড়ে ৩টায় আসামি রবিউল ইসলামকেও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন একই আদালত। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ২য় আদালতের বিচারক সাইফুর রহমান এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) অমূল্য কুমার চৌধুরী জানান, ধর্ষণ মামলায় সাইফুর ও অর্জুন লস্করের ৫দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

ধর্ষণের দায় চাপালো ৩ সহযোগীর উপর : সাইফুর রহমান ্ও অর্জুন লস্কর গণধর্ষন ঘটনায় নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ৩ সহযোগীর নাম প্রকাশে করেছে। তারা জানায়, ছাত্রাবাসের ঘটনার সাথে আমরা জড়িত নই। আমরা কোন অপরাধ করিনি। এই ঘটনা ঘটিয়েছে রাজন, তারেক ও আইনউদ্দিন। বালিকা বধূর স্বামী মাইদুল ইসলামের শাহপরান থানায় দায়েরকৃত মামলার ( নং ২১ তা: ২৬/০৯/২০২০) এজহারে ২নং আসামি তারেকুল ইসলাম তারেক। তবে রাজন ও আইন উদ্দিনের নাম নতুন করে উঠে এলো আদালতে ধর্ষক সাইফুর ও অর্জুনের মাধ্যমে।

ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়াননি কোন আইনজীবী : গণধর্ষণ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামি সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর ও রবিউল হাসানের পক্ষে গতকাল আদালতে দাঁড়াননি কোন আইনজীবী। রাষ্ট্রপক্ষের এপিপি অ্যাডভোকেট খোকন কুমার দত্ত জানান, আদালতে রিমান্ড শুনানিকালে আসামিদের পক্ষে কোন আইনজীবী উকালত নামা দাখিল করেননি। তবে বাদী পক্ষের হয়ে বেশ কয়েকজন আইনজীবী শুনানিকালে উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এটিএম ফয়েজ বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে না নিলেও প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি- এই মামলার কোনো বিবাদির পক্ষে লড়বো না। তবে বাদিপক্ষ যদি কোনো আইনি সহায়তা চান তবে আমরা মানবিকতার দায়ে তা দিতে প্রস্তুত।

ফোন ট্র্যাকে ৪ ধর্ষক আসামি পাকড়াও : এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণে পর দুই রাত ও একদিন পর্যন্ত আত্মগোপনে ছিলেন মামলার এজাহারনামীয় ছয় আসামি। এর ঠিক পরবর্তী মাত্র ১৬ ঘণ্টায় এজাহারনামীয় পাঁচ আসামি ধরা পড়েন। এর মধ্যে চারজনকে এমসি কলেজের এক ছাত্রলীগ নেতার ফোন নম্বর ট্র্যাক করে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এমসি কলেজ ছাত্রলীগের এক নেতার ফোন নম্বর ট্র্যাক করে অবস্থান শনাক্ত সম্ভব হয় ৪ আসামির। এরপর ঝটিকা অভিযানে গ্রেফতার করা হয় ৪ জনকে। কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল আটটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এ ৩ ঘণ্টায় এমসি কলেজের এক ছাত্রলীগ নেতার মুঠোফোন নম্বরে অসংখ্যবার কল আসে। এতে পুলিশের সন্দেহ হয়। পুলিশ তার মুঠোফোন নম্বর ট্র্যাক করে। অতপর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান শনাক্ত হয়। পরে একে একে ধরা পড়েন এজাহারভুক্ত চারজন আসামি। যে ছাত্রলীগ নেতার ফোন নম্বর ট্র্যাক করে চার আসামিকে পাকড়াও করা হয়, সে ছাত্রলীগ নেতাই টিলাগড় ও এমসি কলেজ এলাকায় অভিযুক্তদের শেল্টার দিতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেই ছাত্রলীগ নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়েই রবিউল-সাইফুররা অত্র এলাকায় নৈরাজ্য চালাতো বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

যেভাবে গ্রেফতার হয় ৫ ধর্ষক : গত রোববার রাতে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করা হয় আসামি রবিউল হাসানকে (২৮)। রাতেই তাকে সিলেট মহানগর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিশেষ নির্দেশনা, গোয়েন্দা ও পুলিশ বিভাগের সমন্বিত অভিযানে রবিউলের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। রাত নয়টা থেকে ১০টার মধ্যে শনাক্ত করা স্থান থেকে রবিউল গ্রেফতার হন। রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের জগদল গ্রামে। গ্রেফতার এড়াতে সে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কাজীগঞ্জ বাজারের নিজআগনা গ্রামে এক আত্মীয়র বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলো। হবিগঞ্জে রবিউলকে ধরার প্রায় আধা ঘণ্টা আগে র‌্যাব-৯ আরেক অভিযানে জেলার শায়েস্তাগঞ্জ থেকে শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনিকে গ্রেফতার করে। তার বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাগুনীপাড়া গ্রামে। এর আগে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল পলাতক আরেক আসামি অর্জুন লস্করকে গ্রেফতার করে। অর্জুনকে গ্রেফতার করার আগে সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে গ্রেফতার হন প্রধান আসামি সাইফুর রহমান। খেয়াঘাট থেকে দোয়ারাবাজার যাওয়ার পথে গ্রেফার হয় সাইফুর।

ধর্ষকদের বিচার দাবি : সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সিলেট নগর শাখার উদ্যোগে এমসি কলেজে ধর্ষণকান্ডে জড়িতদের গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে বিচারের দাবিতে মিছিল করেছে। নগর শাখার সভাপতি সঞ্জয় কান্ত দাসের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সাদিয়া নোশিন তাসনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- নগর শাখার দপ্তর সম্পাদক পলাশ কান্ত দাশ, প্রচার সম্পাদক নিশাত কর সানি, মদনমোহন কলেজ শাখার সংগঠক সাকিব রানা প্রমুখ। এছাড়া এমসি কলেজে ধর্ষণের ঘটনায় ৭ দফা দাবি জানিয়েছে পরিবেশ ও মানবাধিকার উন্নয়ন সোসাইটি। পরিবেশ ও মানবাধিকার উন্নয়ন সোসাইটি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মো. জিল্লুর রহমান জিলু, সহ সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মহি উদ্দীন ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক মির্জা অয়েছ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল জলিল, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট শহিদুল হক, পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এহতেশাম হাসান লয়েছ ও প্রচার সম্পাদক মিন্টু কুমার ঘোষ এক যৌথ বিবৃতিতে সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় এ ৭ দফা দাবি জানান।

অপরদিকে, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের প্রতিবাদ ও দুষ্কৃতকারীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে সিলেট ইয়ুথ মুভমেন্ট। এহসানুল কারিম মাবরুরের সভাপতিত্বে ও শামীম আহমদের পরিচালনায় এ মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান আহমদ। এদিকে সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: গণধর্ষণ

১৮ অক্টোবর, ২০২০
১১ অক্টোবর, ২০২০
৬ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন