Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০২ কার্তিক ১৪২৬, ১৮ সফর ১৪৪১ হিজরী

শোকাবহ আগস্টে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা

প্রকাশের সময় : ১২ আগস্ট, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১:২১ এএম, ১২ আগস্ট, ২০১৬

মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি : বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় শোকাবহ আগস্ট মাস। আগস্ট মানেই জাতির বেদনা বিধুর শোকের মাস। ১৯৭৫-এর এ মাসের ১৫ তারিখে কালোরাতে শুধু বঙ্গবন্ধুকেই ষড়যন্ত্রকারী নরপশুরা হত্যা করেনি, ঘৃণ্য নরপশুরা একে একে হত্যা করেছে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামালকে। জঘন্যতম এই হত্যাকা- থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, কর্নেল জামিলসহ ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন।
অন্যদিকে ২০০৪ সালের এ মাসের ২১ তারিখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশের উপর গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। আল্লাহর রহমতে প্রাণে বেঁচে যান জননেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু ঘাতকদেও গ্রেনেডের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান। সে হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হন।
এবার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৪১তম শাহাদাতবার্ষিকী পালন করবে জাতি। একাত্তরের পরাজিত শক্তির সুগভীর ষড়যন্ত্রে প্রাণ হারাতে হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতিকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে খুনিচক্র বাঙালি জাতির আত্মাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যাকা-ের পর ১৫ আগস্টই ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। এ ঘটনার মাধ্যমে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বাঙালি জাতির ঘাড়ে চেপে বসে।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। সেরা মুক্তি সংগ্রামী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক। জননন্দিত নেতা হিসেবে তার তুলনা তিনি নিজেই ছিলেন। দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা ও দায়বোধ তাকে মহীরূহে পরিণত করেছিল। ব্যক্তি শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অস্তিত্বের শত্রুরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেই হত্যা করতে চেয়েছিল। ১৫ আগস্টের ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের যে কালো অধ্যায়ের সূচনা করে তার পরিণতিতে বারবার বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে যে সাম্প্রদায়িকতা ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিভেদ নীতিকে বাংলাদেশের মানুষ কবর দিয়েছিল, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলে ১৫ আগস্টের পর থেকে।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ থেকে ১২ বছর আগে ২১ সে আগস্ট ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য কওে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের হত্যার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে যে এ হামলা চালানো হয় তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কিন্তু গ্রেনেড হামলায় মহান আল্লাহর রহমতে প্রাণে রক্ষা পান শেখ হাসিনা। দলের নেতাকর্মীরা মানবঢাল রচনা কওে গ্রেনেড হামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে যেভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন তা বিশ্বে দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে। গ্রেনেড হামলায় দলের সিনিয়র নেত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভী রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন দলের সিনিয়র নেতাসহ শতাধিক আওয়ামী লীগের এবং সহযোগী সংগঠনের সাহসী এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা।
এ আগস্ট মাসে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি যে, ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বেশ কয়েকজনের রায় কার্যকর হয়েছে। যারা পালিয়ে আছে আশা করি তাদের রায়ও কার্যকর হবে। তবে ষড়যন্ত্রকারী অনেকে এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাদের ব্যবস্থাও হবে।
২১ আগস্টেও গ্রেনেড হামলার দ্বাদশ বার্ষিকীতে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক তারা যেন প্রাপ্য শাস্তি পায়। হত্যা ও ষড়যন্ত্রের যে রাজনীতি ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় মদদ জুগিয়েছে, তার শিকড় উপড়ে ফেলাও দেশের সব গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের কর্তব্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। আরেকটি ১৫ বা  ২১ আগস্টের উদ্ভব যাতে কোনো দিন না হয়, তা নিশ্চিত করতেই হত্যা ও ষড়যন্ত্রের হোতাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের শিকড় সমাজ ও দেশ থেকে উচ্ছেদ করা আজ সময়েরই দাবি।
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় প্রাণে বাঁচাসহ নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। নানা সঙ্কটময় পরিস্থিতি ও বিরোধী দলের উত্তাল আন্দোলনের মাঝেও দক্ষ হাতে সরকার পরিচালনা করছেন। শেখ হাসিনা নিজেকে শুধু দক্ষ রাজনৈতিক হিসেবেই গড়ে তোলেননি, আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালনাতেও অনুকরণীয় যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তার দূরদর্শী পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন সঙ্কট সিংহভাগই কেটে গেছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ, খাদ্য সমস্যা দূরীকরণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার কৃতিত্ব তিনি দেখিয়েছেন। তার যোগ্য নেতৃত্বে কৃষি খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। দারিদ্র্যবিমোচনে শেখ হাসিনা সরকার চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান সরকার দেশের ইপ্সিত প্রবৃদ্ধির ভিত্তি রচনা করতে সক্ষম হয়েছে।  রেমিট্যান্স প্রাপ্তির হারও কয়েক গুণ এগিয়ে নিয়েছে। শিশু-মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ জাতিসংঘ পুরস্কার পেয়েছে। শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও বিচক্ষণ পরিকল্পনায় বর্তমান সরকারের আমলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের উন্নয়ন বিস্ময়।
পরিশেষে বলছি, এখনো প্রতিক্রিয়াশীল সেই অপশক্তি দেশ থেকে উৎখাত হয়ে যায়নি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা শুধু ব্যক্তিকে হত্যাপ্রয়াস ছিল না, ছিল জাতির স্বাধীনতার শক্তিকে হত্যার অপচেষ্টা। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে খুন করে তারা একটি আদর্শকে খুন করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অর্জন স্বাধীনতাকে যারা মেনে নিতে পারেনি, তাদের ব্যাপারে সদা সজাগ থাকতে হবে। যাতে করে আর কোনো শোক বাংলার মানুষের ওপর শত্রুরা চাপিয়ে দিতে না পারে। বেদনা বিধুর শোকের মাসে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর নিহত পরিবারবর্গকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।   
লেখক : আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক মন্ত্রী বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ