Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

তদন্তে পিবিআই

সিলেটে রায়হান হত্যা মামলা

সিলেট ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ১৪ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০১ এএম

সিলেটের পুলিশী নির্যাতনে নিহত রায়হান হত্যা মামলা হস্তান্তর করা হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) । এছাড়া এ ঘটনার সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর লাপাত্তা হয়ে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনও বন্ধ। অপরদিকে, পুলিশের উর্ধ্বতন পর্যায়ের তদন্তে রায়হানের মৃত্যু নিয়ে ফাঁড়ি পুলিশের ছিনতাই ও গণপিটুনির কথিত বক্তব্যের মিথ্যাচার কাহিনী বেরিয়ে এসেছে। এদিকে, মৃত্যু ঘটনা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে এক রিট আবেদন করেছেন এক আইনজীবী। পুলিশী নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যু ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে সুজন। এছাড়া মানববন্ধন, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে জড়িতদের দ্রæত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে ছাত্র-জনতাসহ বিভিন্ন সংগঠন।

রায়হান হত্যা মামলার তদন্তে পিবিআই:
গতকাল রায়হান হত্যা মামলার তদন্তভার ন্যস্ত করা হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই)। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পলিুশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, সকালে পুলিশ সদর দফতর থেকে রায়হান আহমদের মারা যাওয়া ঘটনায় হওয়া মামলা পিবিআইতে স্থানান্তর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রায়হান মৃত্যু ঘটনার পর তার স্ত্রী গত রোববার দিবাগত রাত আড়াইটায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কতোয়ালী মডেল থানায় দায়ের করেন একটি হত্যা মামলা। অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে দায়ের করা হয় এ মামলা। কিন্তু মৃত্যু ঘটনার পর রায়হানের পরিবার বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির উপর অভিযোগ তুলেছিল।

লাপাত্তা পুলিশের আলোচিত এস আই আকবর :
ছিনতাইকারী সাজিয়ে, গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে রায়হানের বলে প্রচার করে বিয়য়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। পরবর্তীতে তার দাবি মিথ্যাচারে রূপ নেয় রায়হানের পরিবারের প্রতিবাদের মুখে। গঠন করা হয় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি তদন্ত কমিটি। হত্যা ঘটনায় বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ি সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসে তদন্তে। এরপরই সোমবার বিকেলে বরখাস্ত করা হয় ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবরসহ ৪ পুলিশ সদস্যকে। আরো ৩ পুলিশ সদস্যকে করা হয় প্রত্যাহার। এরপর থেকে লাপাত্তা ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনও বন্ধ।

গনপিটুনির কাহিনী মিথ্যাচারে পরিণত হলো যেভাবে :
রায়হান মৃত্যু ঘটনা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যকে প্রথম থেকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল তার পরিবার। পরিবারের দাবিসহ সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে পুলিশের উর্ধ্বতন পর্যায়ের তদন্ত কমিটি মাঠে নামে ঘটনার সত্যতা প্রমাণে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায় এ সংক্রান্ত গঠিত তদন্ত কমিটি। বন্দরবাজার ফাঁড়িতে এ নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও এমন তথ্য উঠে আসে ইনচার্জ আকবর হোসেন ভ‚ইয়াসহসহ ৭ পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদে। কমিটির একটি সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ সে সময় দায়িত্বে থাকা ৭ পুলিশ সদস্যকে।
ইনচার্জ আকবর প্রথমে রায়হানকে ফাঁড়িতে নেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। পরে সিলেট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত কমিটি। সেই ফুুটেজ দেখানোর পর সবাই মুখ খুলতে শুরু করেন। ফুটেজে শনিবার রাত ৩টা ৯ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে দেখা যায়, দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে এসে থামে। সামনের অটোরিকশা থেকে তিন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে রায়হানকে দেখা যায়। তিনি হেঁটে হেঁটেই পুলিশের সঙ্গে ফাঁড়িতে প্রবেশ করেন। এর প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল ৬টা ২২ মিনিটে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা আসে বন্দর ফাঁড়ির সামনে। এর দুই মিনিট পর ৬টা ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে দুই পুলিশের কাঁধে ভর করে রায়হানকে সেই অটোরিকশায় তুলতে দেখা যায়।
ইনচার্জ আকবরসহ অন্যরা তদন্ত কমিটিকে জানান, শনিবার রাত আড়াইটার দিকে দু’জন লোক সোবহানীঘাট থেকে কাস্টঘর রোড দিয়ে যাচ্ছিল। পথে সুইপার কলোনির গেটের পাশে তাদের আটক করে ছিনতাইকারীরা। চাকু দিয়ে টাউজারের পকেট কেটে তাদের টাকা-পয়সা নিয়ে পাশের সুইপার সুলাইলালের ঘরে ডুকে যায় ৩ ছিনতাইকারী। এরপর ছিনতাইয়ের শিকার লোকজন মহাজনপট্টি দিয়ে বের হয়ে নগরীর বন্দরবাজারের মশরাফিুয়া রেস্টুরেন্টে দুই পুলিশকে (কোতোয়ালি থানার মুন্সি ও এক অপারেটর) নাশতা করতে দেখে। তারা পুলিশকে ছিনতাইয়ের বিষয়টি জানায়। পুলিশ ইকো-১-কে মোবাইলে কল দিয়ে এ খবর জানায়। এরপর ইকো-১-এর ওয়্যারলেস অপারেটর কনস্টেবল আবু তাহের এএসআই আশিক এলাহীর টিমকে খবর পাঠায়। সেই টিমে ছিলেন, কিনস্টেবল তৌহিদ মিয়া ও হারুনুর রশিদ। তারা গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে ভিকটিমের উপস্থিতিতে রায়হানকে আটক করে। তার সঙ্গে থাকা দু’জন দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে রায়হানকে ফাঁড়িতে নিয়ে আসা হয়। এ সময় এএসআই আশিক এলাহী ছিনতাইয়ের শিকার লোকের নাম-পরিচয় রাখেননি বলে তদন্ত কমিটিকে জানান। ইনচার্জ আকবর চুপ থাকলেও অন্যরা কমিটিকে জানান, ফাঁড়িতে নিয়ে আসার পর এসআই আকবরের নেতৃত্বে রায়হানকে নির্যাতন করা হয় নির্মমভাবে। তার নির্দেশেই তৌহিদের ফোনে রায়হান তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন। যদিও পুলিশের পক্ষ বলা হয়েছিল, নগরীর কাস্টঘরে ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে রায়হানের।

প্রত্যক্ষদর্শী সুইপার সুলাইলের বর্ণনায় রায়হান ছিলেন সুস্থ :
কোন গনপিটুনির ঘটনা ঘটেনি সিলেটের কাস্টঘরে। সুস্থ অবস্থায় রায়হান ও আরও এক জনকে ধরে এনেছিল পুলিশ। তারা দু’জন পুলিশের তাড়া খেয়ে নিজেকে বাঁচাতে কাস্টঘর এলাকার সুইপার কলোনির সুরাইলালের ঘরে প্রবেশ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী সুরাইলাল। সুরাইলাল আরো জানায়, রাত আনুমানিক ৩টা। এসময় বাইরে থেকে কেউ আমার ঘরের দেয়ালে ধাক্কাচ্ছে আর দরজা খোলার জন্য ডাকছে শুনে আমি দরজা খুলি। দরজা খুলতে না খুলতে দুইজন মানুষ আমার ঘরের ভিতরে ঢুকে গেছে এর পিছনেই পুলিশ এসেছে। তারপর পুলিশ আমার ঘর থেকে রায়হানকে সুস্থ অবস্থায় হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় কোন গণপিটুনি হয়নি। কেন ধরে নিয়ে গেছে জানি না তাও।

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট :
রায়হানের মৃত্যু ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। গতকাল মঙ্গলবার জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন আইনজীবী সৈয়দ ফজলে এলাহী। রিটে বিবাদী করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, সিলেটের পুলিশ কমিশনার, সিলেটের ডিসি-এসপিসহ সংশি-ষ্টদের। রিট আবেদনে সংযুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন। বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের বেঞ্চে এ রিট আবেদনটি শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন ওই আইনজীবী।
এছাড়া রায়হান হত্যা ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেটের সভাপতি ফুারুক মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রায়হান উদ্দিনকে অন্যায়ভাবে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই বর্বর নির্যাতন ১৯৭১ সালের পাক হানাদারদের নির্যাতনকেও হার মানিয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় যাদেরকে বরখাস্ত ও প্রত্যাহার করা হয়েছে তাদেরকে অনতিলম্বে গ্রেফতার করতে হতে হবে। এই ঘটনায় পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কোন ভাবে দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। পুলিশের কতিপয় লোকের কারণেই এই বাহিনী আজ ক্ষতিগ্রস্ত।

প্রতিবাদে উত্তাল সিলেট :
পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে দিনভর উত্তাল ছিল সিলেট। মানববন্ধন, বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও, নিন্দা বিবৃতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছে সিলেটের প্রতিবাদী মানুষ। গতকাল দুপুরে নগরীর জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সম্মুখে এক মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান প্রজন্ম। অপরদিকে ‘সিলেটের সাধারণ ছাত্র জনতা’ নামের এক ব্যানারে রাজপথে নেমে আসেন প্রতিবাদী মানুষ। প্রথমে সিলেট নগরীর চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারপর একটি বিক্ষোভ মিছিল সহকারে সিলেটের বন্দর আজার পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে অবস্থান নেন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা। এ সময় বিক্ষোভকারীরা রায়হান আহমদ হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে, রায়হান হত্যায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেফতার দাবি জানিয়েছে সিলেট নাগরিকবৃন্দ। বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে বর্বরোচিত নির্যাতনে রায়হান হত্যার প্রতিবাদে এবং হত্যায় জাড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সিলেটে নাগরিকবৃন্দের উদ্যোগে বিকেল সাড়ে ৪টায় কোর্ট পয়েন্টে এই বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে এ দাবি জানান তারা। এছাড়া রায়হানের আখালিয়া এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে গতকাল বিকেল এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: হত্যা মামলা

১৪ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ