Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌
শিরোনাম

মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.) ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব

প্রকাশের সময় : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান : মাওলানা এম এ মান্নান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন একজন খ্যাতনামা মুহাদ্দিস। তিনি যখন হাদিসের দরস দিতেন ছাত্ররা চাতক পাখির মতো পিনপতন স্তব্ধতায় মনের গহিনে তার কথাগুলো গেঁথে নিতেন। তার সুযোগ্য ছাত্র ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মরহুম মাওলানা আ ন ম মোস্তাফিজুর রহমান এক আলোচনায় বলেছেন, মাওলানা এম এ মান্নান হুজুর আমাদেরকে যা পড়াতেন তা দ্বিতীয়বার আমাদের পড়তে হতো না, এটা ছিল তার কারামত। যে হাদিসটি তিনি পড়াতেন তার জীবনে হুবহু আমল পরিলক্ষিত হতো। হাদিসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিনি আইয়েম্মায়ে মুজতাহিদীনদের ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি ছিলেন অবিরাম কোরআন তিলাওয়াতকারী। তার টেবিলের পাশে থাকত বোখারি শরিফ। তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা মুফাসসিরে কোরআন, বড় বড় মাহফিলে পালকিতে চড়ে হাজির হয়ে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করতেন। কোরআন শরিফের যে আয়াত তিনি তিলাওয়াত করতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই আয়াতের তাফসির করতেন জনগণ নীরব নিস্তব্ধতায় তা শুনতেন।
তার তীক্ষè মেধার কারণে যে বিষয়ে তিনি ফতোয়া দিতেন এটাই চূড়ান্ত বলে সবাই মেনে নিত। সুন্নাতের আমলের প্রতি গুরুত্ব দিতেন সব সময়। আলেম সমাজের লেবাস পোশাক হবে উন্নত, হাতের ব্যাগটি হবে অত্যাধুনিক। শিক্ষকদের বেতন স্কেল হওয়ার পর একসঙ্গে বহু মাসের টাকা পাওয়ার পর একটি পুরনো জামা গায়ে, ছেঁড়া ব্যাগ হাতে একজন অধ্যক্ষ জমিয়ত অফিসে ঢোকামাত্রই মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি খুব ভদ্রভাবে তাকে বললেন, আপনি কি পড়েননি! বখিল জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এতগুলো টাকা পাওয়ার পরও আপনি ছেঁড়া ব্যাগ নিয়ে আমার সামনে এসেছেন। এ কথা বলে ওই অধ্যক্ষের হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার হাতে দিয়ে ব্যাগটি ফেলে দিলেন। অধ্যক্ষ মহোদয় রাগ না হয়ে বললেন, হুজুর আলেমদের ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠায় আপনার এই মানসিকতা সত্যিই আমাকে নাড়া দিয়েছে। কিছু দিন পর ওই অধ্যক্ষ মহোদয় শেরওয়ানি গায়ে লিয়াকত ক্যাপ মাথায় দিয়ে একটি সুন্দর ব্যাগ হাতে নিয়ে মরহুম মাওলানার সামনে এলে মাওলানা খুশি হয়ে তাকে আলিঙ্গন করলেন এবং গাউসুল আজম আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ইতিহাস শোনালেন। তিনি বললেন, আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি আব্বাসীয় খলিফার চেয়েও দামি জামা গায়ে দিতেন। এক ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করলে জবাবে বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এ জগতের রাজা-বাদশাহদের চেয়ে একজন আলেমেদ্বীনের মর্যাদা অনেক বেশি। তাই খলিফার সামনে তার চেয়ে দামি জামা গায়ে দিয়ে না যাওয়া হীনমন্যতার পরিচায়ক। কারণ একজন আলেমের কাছে খলিফার প্রয়োজন অনেক বেশি, খলিফার কাছে আলেমের প্রয়োজন ততটা নেই।
মরহুম মাওলানার ব্যক্তিত্ব, একজন আলেম হিসেবে তার বিচক্ষণতা এবং বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ সব যুগের আলেমদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। অনেক আলেমই মেহমানদারি গ্রহণ করেন অন্যকে মেহমানদারি করতে ততটা অগ্রগামী দেখা যায় না। মাওলানা মরহুম ছিলেন তার ব্যতিক্রম। মেহামনদারিতে তিনি ছিলেন অনন্য।
মাওলানা যখন ফরিদগঞ্জ আসতেন গাড়ি ভরে ফল নিয়ে আসতেন এবং ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে তিনি আপ্যায়ন করতেন। অকাতরে দান ছিল তার খানদানি বৈশিষ্ট্য। মরহুম মাওলানা ছিলেন রাসূলপ্রেমে ডুবে থাকা এক অনন্য আশেক, মিলাদ-কেয়ামে তার প্রেম-ভালোবাসার নিদর্শন পাওয়া যেত। বাংলাদেশের আল্লাহ ও রাসূলপ্রেমিকদের বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ও রওজা মুবারক জিয়ারত করানোর ক্ষেত্রে তার জুড়ি নেই। তিনি তার জীবনে নিজ খরচে ও ব্যবস্থাপনায় প্রায় পাঁচ হাজারেরও অধিক লোককে হজ করিয়েছেন, নিয়ে গেছেন অসংখ্য আলেমকে বড় পীর গাউছুল আজম রাদিয়াল্লাহু আনহুর দরবার বাগদাদভূমিতে। তরিকতের ইলমে, মারেফাতের আমলে, হাকিকতের রিয়াজতে তিনি ছিলেন এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনের নানা ব্যস্ততার মধ্যেও নানা অলিকুল শিরোমণি আবদুল মজিদ রহ. ও বাবা শাহ ইয়াসিন রহ.-এর শিক্ষা তার আমলে-আখলাকে ছিল সদা সুস্পষ্ট।
আজকের আলেম সমাজের এই মর্যাদা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, সাংগঠনিক ঐক্য, দ্বীন প্রতিষ্ঠার বাস্তবধর্মী চেতনার উন্মেষ সবকিছুতে রয়েছে মরহুম মাওলানার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব। তারই পথ ধরে অগ্রসরমান বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন তারই সুযোগ্য সন্তান আলহাজ এ এম এম বাহাউদ্দীনের নেতৃত্বে ইলম ও আমলের সমন্বিত ধারায় সমগ্র বিশ্বের এক বিরল সংগঠন হিসেবে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। প্রিয় নবীর মুহাব্বত, তা’জীম, আদব, সুন্নাতের অনুসরণ সাথে সাথে সাহাবা, আহলে বায়ত ও আল্লাহর অলিগণের তা’জীম-আদব-মুহাব্বতের সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ ধরে অগ্রসর হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে তারই প্রতিষ্ঠিত জমিয়াত ও ইনকিলাব। আল্লাহ আমাদেরকে তার রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালন করার তওফিক দান করুন। আমিন!
লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন



 

Show all comments
  • kasem ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১১:৫২ এএম says : 0
    i agree with u
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।