Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

ভেজাল নকলের মাত্রা বেড়েছে করোনায়

বিএসটিআইয়ের তদারকি কার্যক্রম ও অভিযানের দুর্বলতা

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৮ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০০ এএম

করোনায় ভেজাল ও নকলের মাত্রা বেড়েছে। রাজধানীসহ সারাদেশেই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য এবং বাহারি নকল পণ্য। পুরান ঢাকার চকবাজার, লালবাগ ও কেরানীগঞ্জের অলিগলিতে প্রস্তুতকৃত নকল ও নিম্নমানের হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ডেটল, স্যাভলন, সাবান, মাস্ক, চন্দন, মেছ্তা-দাগ নাশক ক্রিম, নানা প্রসাধনী, তেল, পারফিউম সবকিছুই পাইকারী ও খুচরা বিক্রি হচ্ছে। একই সাথে বিক্রি হচ্ছে নকল চানাচুর, বিস্কুট, গুঁড়োদুধ, চাপাতা, ঘি, দই থেকে শুরু করে পানের জর্দাও। এসব ভজাল ও নকল সামগ্রীর প্যাকেট বা বোতলে সাঁটানো বিভিন্ন ব্রান্ডের লেভেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় মান সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) তদারকি ও ভেজালবিরোধী অভিযান দুর্বল হয়ে পড়ায় দিন দিন ভেজাল ও নকলের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এতে একদিকে জনস্বাস্থ্য যেমন হুমকীর মুখে পড়ছে, তেমনি ক্রেতা বা ভোক্তারা নকল জিনিস কিনে ঠকছেন।

জানা গেছে, রাজধানীর সব ধরণের মার্কেট ও বাজারে এখন নকলের বাহার। গত বছর ভেজাল ও নকলের মাত্রা কিছুটা কমলেও করোনার পর থেকে এর মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে করোনায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অবাধে নকল হচ্ছে হ্যান্ড স্যানটাইজার, স্যাভলন, ডেটল, মাস্ক, স্প্রে মেশিন, হ্যান্ড গ্লাভসসহ বিভিন্ন সুরক্ষা পণ্য। একইভাবে করোনার মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান বন্ধ থাকার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ভেজাল কারবারীরা। শিশুদের চকলেট ও গুঁড়া দুধ, ঘি, আটা, তেল, সাবান, মধু, মসলা, দই, মিষ্টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী, নিত্যব্যহারের কসমেটিকস, এনার্জি সেভিং বাল্ব, মোবাইল ফোন, টিভি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, গাড়ি ও কম্পিউটারের পার্টস সবই নকল হচ্ছে। নকল সামগ্রী মানেই কোনো ব্রান্ডেড কোম্পানীর সামগ্রী হুবুহু প্যাকেট করে বাজারজাত করা। চোখ ধাঁধানো নকল সামগ্রীর ঝকমকে প্যাকেটের সামনে আসল পণ্য পাত্তাই পায় না। হাইটেক সামগ্রীসহ সব ধরনের নকল পণ্য রাজধানীর ফুটপাতেও পাওয়া যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধও। রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে নকল কারখানায় তৈরি ওরস্যালাইনে হাটবাজার, ফার্মেসী সয়লাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, নকলের প্রবণতা বন্ধ করতে হলে আইনের সঠিক প্রয়োগসহ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। ভোক্তারা যদি সচেতন হয়ে সংঘবদ্ধভাবে নকল পণ্য বা ভেজাল খাদ্যকে বর্জন করে তাহলে এর দাপট আর থাকবে না। যারা অধিক মুনাফার আশায় এগুলো তৈরী করছে তারা নিরাশ হতে হতে একদিন এই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখন চীনের তৈরী খেলনা সামগ্রী থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সব সামগ্রীর নকলের মহোৎসব চলছে। ঢাকার বাইরে এগুলো বিক্রি হয় বেশি। চকবাজার থেকেই পাইকাররা সেগুলো কিনে নিয়ে যায়। দেশের গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে ‘চায়না’ বলেই বিক্রি হয় এসব। পুরান ঢাকার নকল কারখানাগুলোর দিকে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালিত হওয়ার পর অনেক নকল কারবারী সেখান থেকে কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু কারখানা কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়েছে। আবার সেখানেও নিরিবিলিতে ধরা পড়ার ভয়ে কেউ কেউ যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও মুগদার ব্যস্ত ও ঘিঞ্জি এলাকাকে বেছে নিয়েছে। যাত্রাবাড়ীর মীরহাজিরবাগে অনেক আগে থেকেই আছে নকল ফ্যানসহ ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি তৈরীর কারখানা। রায়েরবাগে আছে নকল খাঁটি গাওয়া ঘি, মধু, দই ও মিষ্টির কারখানা। যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা এলাকাতেই নকল ক্যাবল তৈরীর কারখানা আছে কমপক্ষে ৫০টি। দনিয়া ও পাটেরবাগ এলাকায় নকল মশার কয়েল, ঘি, গুড়, হারপিক, খাবার স্যালাইন, ভিটামিন ওষুধ, সুইচ, ছকেট, হোল্ডার কারখানা আছে বেশ কয়েকটি। আছে শতাধিক নকল মিনারেল ওয়াটারের কারখানা। মুগদাতে নকল সোয়াবিন তেল থেকে শুরু করে নকল ডিটারজেন্ট পাউডার পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে অবাধে। পুরান ঢাকার নর্থ সাউথ রোডের অলিতে গলিতে তৈরী হচ্ছে নকল টিভি, ফ্রিজ, এনার্জি সেভিং বাল্ব, মোটর, ফ্যান, এয়ারকন্ডিশন মেশিনসহ বিভিন্ন দামী ইলেকট্রিক সামগ্রী।

জানা গেছে, একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা জেনে শুনেই অতি লাভের আশায় নকল পণ্য বিক্রি করেন। প্রতারিত হন ব্যবহারকারী বা ক্রেতারা। থাইল্যান্ডের বিখ্যাত হেড অ্যান্ড শোল্ডার, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যান্টিন প্রো-ভি শ্যাম্পু ও ডাভ ক্রিম বা ভারতের গার্নিয়ার শ্যাম্পুসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের ক্রিম, লিপস্টিক, লোশন দেদারছে বিক্রি হচ্ছে রাজধানীর চকবাজার ও মৌলভীবাজারে। সেখানকার শতাধিক পাইকারি দোকানে এসব পণ্য মূল দামের অর্ধেক দামে বিক্রি হয়। তবে এগুলো সবই নকল। পণ্যের প্যাকেট বা বোতল ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করেও আসল-নকল বোঝারও উপায় থাকে না। ভুক্তভোগীদের মতে, বিএসটিআই-এর নির্লিপ্ততাই নকল সামগ্রীর দাপটের জন্য দায়ী। শিল্প মন্ত্রালয়ের অধীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি যুগ যুগ ধরে জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে চলছে। ভুক্তভোগীরা মনে করেন, বিএসটিআই’র অভিযান অব্যাহত থাকলে নকল পণ্যের দাপট কমতে বাধ্য।

এদিকে, দেশে খাদ্যদ্রব্য, বিভিন্ন পণ্যে সেবা ও ভেজালের মাত্রা বাড়লেও জাতীয় মান সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) তদারকি কার্যক্রম দিন দিন দুর্বল হচ্ছে। বিগত চার বছর তিন মাসে বিএসটিআই পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের সংখ্যা, জরিমানার পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে এই চিত্র ফুটে ওঠে।

পরিসংখ্যান বলছে, বিগত চার বছর তিন মাসে জরিমানাকৃত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে ৮১ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট এক হাজার ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কমে হয় ৮৯৮টি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কমে হয় ৩৯৮টি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে হয় ৩৭৪টি ও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জরিমানাকৃত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১৩টি। তবে বিগত চার বছর তিন মাসে বিএসটিআই খাদ্যদ্রব্য ও বিভিন্ন পণ্যে ভেজাল ও মানহীন শনাক্ত হওয়ায় ১৯৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময় ৯৮টি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করা হয়েছে।

বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিএসটিআই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৭৮১টি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৬৪৫টি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আরও কমে হয় ৩৪৬টি, তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ৪২৪টি হলেও চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়। বিগত পাঁচ বছরে মামলা দায়েরের সংখ্যাও কয়েকগুণ কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মামলা হয়েছে এক হাজার ৬২টি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯১০টি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৯৫টি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭০টি ও চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১৮টি। বিএসটিআইয়ের অভিযানে দেখা গেছে, অনুমোদনবিহীন পণ্য উৎপাদন করায় বেশিসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিগত চার বছর তিন মাসে জরিমানার পরিমাণও কমে এসেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জরিমানা করা হয়েছে প্রায় চার কোটি ৯৮ লাখ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার কোটি ৮৩ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে হয় প্রায় চার কোটি তিন লাখ টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে হয় দুই কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক কোটি প্রায় ১৮ লাখ টাকা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: করোনাভাইরাস


আরও
আরও পড়ুন