Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

গ্রুপিং-কোন্দলে জর্জরিত রামগতি-কমলনগর উপজেলা আওয়ামীলীগঃসাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা

রামগতি (লক্ষ্মীপুর) উপজেলা সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২১ অক্টোবর, ২০২০, ১২:৪২ পিএম

লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগর দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন-২৭৭।

উপজেলাদ্বয়ে আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রায় ঝিমিয়ে পড়েছে।তৃনমূলের নেতাকর্মীদের মতামতকে উপেক্ষা করে উপজেলা সভাপতি সম্পাদকের পছন্দের লোক দিয়ে পকেট কমিটি করায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।পাওয়া না পাওয়ার হিসাব নিকেশ নিয়েই মুলতঃ মুল দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-গ্রুপিং আর কোন্দলে জর্জরিত দুই উপজেলা আওয়ামীলীগ।ইউনিয়ন-ওয়ার্ডের অবস্থা হ য ব র ল।টাকার নিকট হেরে গেলেন দলের দুর্দিনের ত্যাগী নেতারা।পদ না পেয়ে দল থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নেন অনেকেই।হঠাৎ বসন্তের কুকিলদের আগমন ও মুল্যায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে।রামগতি-কমলনগরে আওয়ামীলীগ সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল মামুন ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ নেত্রী বেগম ফরিদুন্নাহার লাইলী নির্ভর হয়ে পড়েছে।থানা-ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভক্ত নেতাকর্মীরা। এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের মুখোমুখি অবস্থানে।অন্যদিকে এ আসনের বর্তমান সাংসদ মেজর (অবঃ) আবদুল মান্নান অন্যদলের হওয়ায় দুই উপজেলা আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতা নানা সুযোগ সুবিধা হাসিল করলেও অন্যরা হচ্ছেন বঞ্চিত।এই নিয়ে চলছে দলের মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধ। এক নেতা অন্য নেতার বিপরীতে মুখি অবস্থানে।দীর্ঘবছর বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলটির সম্মেলন-কমিটি না হওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার চলতে থাকে।

সব মিলিয়ে দু'উপজেলার ক্ষমতাসীন দলের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব।

রামগতি উপজেলা-

জেলার রামগতি উপজেলা আওয়ামীলীগের বর্তমান কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০০৩ সালে। তিন বছরের জন্য গঠিত ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালে। এরপর আজও নতুন কমিটি গঠিত হয়নি। এতে নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।প্রকাশ্যে চলছে গ্রুপিং আর কোন্দল।নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের দুজন সদস্য বলেন,বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই।ওই কমিটি দিয়েই যেনতেনভাবে চলছে দলের কার্যক্রম।দলের কাজে কোন গতি নেই।বেশির ভাগ নেতা-কর্মীর মধ্যে গা-ছাড়া ভাব।জাতীয় দিবস ও দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন,দু-চারটি আলোচনা সভা এবং মাঝেমধ্যে কার্যনির্বাহী কমিটির সভা আয়োজনের মধ্যেই দলের সাংগঠনিক তৎপরতা আটকে আছে। এভাবে চলতে থাকলে দলের বারোটা বেজে যাবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ভবিষ্যতে এ এলাকায় আওয়ামীলীগের ভরাডুবি হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।উপজেলা আওয়ামীলীগের ওই দুই নেতা আরও বলেন,গ্রাম বা ইউনিয়ন পর্যায়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের নিয়ে সমাবেশ করে দল ও সরকারের অর্জন-সাফল্য তুলে ধরেনি বর্তমান কমিটি।এ ছাড়া নিজ দল বা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ, গ্রামে-গঞ্জে জনসংযোগ করা,মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করা ও তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করা এসব কাজও হয়নি তেমনভাবে।তাদের অভিযোগ,স্থানীয় জেলা ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের দুই-একজন প্রভাবশালী নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবেই নতুন কমিটি হচ্ছে না।তিন বছরের জন্য গঠিত কমিটি ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে রামগতিতে।দলের অনেক নেতা-কর্মী এতে হতাশ ও ক্ষুব্ধ।দলীয় সূত্র জানায়,২০০৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে তিন বছরের জন্য রামগতি উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়।৬৭ সদস্যের ওই কমিটিতে মরহুম গোলাম মাওলা চৌধুরী সভাপতি ও অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে,২০১৫ সালের দিকে রামগতি উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি গোলাম মাওলা চৌধুরী মারা যান। এরপর দলের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ মুরাদ মিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন।তিনি আজও ওই পদে আছেন।উপজেলা আওয়ামীলীগের তিন-চারজন নেতা বলেন,২০০৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌর আওয়ামীলীগের কমিটি গঠিত হয়। এরপর উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের নতুন কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও ‘রহস্যজনক কারণে তা হয়নি।
রামগতি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু নাছের বলেন,গণতান্ত্রিক পদ্বতিতে কমিটি না দিয়ে পকেট কমিটি দেওয়া হয়েছে।মুলত দলের মধ্যে গ্রুপিং আর কোন্দল এই জন্যই হচ্ছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ঠিকমতোই চলছে। কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে ও তিনি জানান।

কমলনগর উপজেলা-

অপরদিকে একই অবস্হা বিরাজ করছে কমলনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে। বর্তমান কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালের আগষ্ট মাসে।তিন বছরের জন্য গঠিত ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৬ সালের আগস্টে। এরপর আজও নতুন কমিটি গঠিত হয়নি। এতে নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।কমলনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের মধ্যে বর্তমানে দুই গ্রুপের লড়াই চলছে।সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল মামুন ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ নেত্রী বেগম ফরিদুন্নাহার লাইলী।এখানে ও এই দুই নেতা নির্ভর হয়ে দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে উপজেলা আওয়ামীলীগ।দলের মধ্যে সাংগঠনিক চর্চা না থাকা, রাজপথ সরব না রাখা,সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকান্ডে প্রচারবিমুখতা, দলীয় কর্মসূচি পালন না করা,দলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর না নেওয়াসহ দলীয় কর্মকাণ্ডে ব্যাপক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।এর প্রভাব পড়েছে তৃনমুল আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে।
তৃনমুল আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা জানান,গ্রাম বা ইউনিয়ন পর্যায়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের নিয়ে সমাবেশ করে দল ও সরকারের অর্জন-সাফল্য তুলে ধরেনি এই কমিটি।এ ছাড়া নিজ দল বা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ গ্রাম-গঞ্জে জনসংযোগ করা মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করা ও তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করা এসব কাজও হয়নি তেমনভাবে। এতে ক্ষমতাসীন দলের সার্বিক অবস্থা অনেকটা তলানীতে এসে পড়েছে।তাদের অভিযোগ,স্থানীয় লক্ষ্মীপুর জেলা নেতাদের কারনেই নতুন কমিটি হচ্ছে না উপজেলা- ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে।সূত্র জানায় ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের সম্মেলনের মাধ্যমে তিন বছরের জন্য কমলনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়।৬৭ সদস্যের ওই কমিটিতে মাস্টার নুরুল আমিন সভাপতি ও এডভোকেট একেএম নুরুল আমিন রাজু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এসব বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও হাজিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ নিজাম উদ্দিন বলেন,রামগতি থেকে কমলনগর ভাগ হওয়ার পর আমি ঐ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমার হাতের কমিটিগুলো এখনো বিদ্যমান।বর্তমান নেতারা নতুন কমিটি দিতে পারেনি। তারা প্রত্যেক ইউনিয়নে সম্মেলন করে চলে যান।পরে উপজেলা সভাপতি সম্পাদক বসে পকেট কমিটি ঘোষনা করেন।এগুলো সম্পুর্ন নিয়মবহির্ভূত।উপজেলা কমিটি ওয়ার্ডের কমিটি গঠন নিয়েও হস্তক্ষেপ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতারা জানান,২০১৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে উপজেলা কমিটি গঠিত হলেও তারা ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কমিটি গঠন করতে পারেনি।তবে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড গুলোতে পকেট কমিটি করতে পেরেছে বলেও দাবী অনেকের।এরপর উপজেলা আওয়ামীলীগের নতুন কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও ‘রহস্যজনক কারণে’ তা হয়নি।কমলনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের নিষ্ক্রিয় কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়েছে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে। সেই পুরানো পকেট কমিটি দিয়েই চলছে দেশের প্রাচীনতম দল আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম।দলের মধ্যে গ্রুপিং কোন্দল এখন ওপেন। এক নেতা অন্য নেতার মুখোমুখি অবস্থানে।ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের অবস্থা আরো নাজুক।নেই চেইন অব কমান্ড।অন্যদিকে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটিগুলোতে টাকার ছড়াছড়ি নিয়েও বেশ সমালোচনা চলছে।টাকা হলেই এখন পদ পাওয়া যায় এমন গুঞ্জন রয়েছে গোটা কমলনগর জুড়ে।উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পাটারিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান এডভোকেট একেএম নুরুল আমিন রাজু বলেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারনে একটু বিড়ম্বনা হচ্ছে।নিয়মিত সাংগঠনিক কার্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছি।আমাদের চেয়ে রামগতি উপজেলার সাংগঠনিক অবস্থা আরো খারাপ, সেদিকে গণমাধ্যমকর্মীদের নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন এই নেতা।
কমলনগর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মাস্টার নুরুল আমিন বলেন,আওয়ামীলীগের মধ্যে কোন গ্রুপিং-কোন্দল নেই।আমরা সবাই এক।যেসব ইউনিয়নে সম্মেলন হয়েছে ঐ সব জায়গায় কমিটিও দেওয়া হয়েছে।তবে কিছু ইউনিয়নে কমিটি এখনো দেওয়া হয়নি তবে চেষ্টা চলছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এডভোকেট নুরুদ্দীন চৌধুরী নয়ন বলেন,দলের মধ্যে গ্রুপিং ও কোন্দল সৃষ্টিকারীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা।কেন্দ্র থেকে আমাদের কাছে চিঠি আসছে।খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রামগতি-কমলনগর উপজেলা ও তার আওতাধীন ইউনিয়নগুলোতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি দেওয়া হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আওয়ামী লীগ

২৭ অক্টোবর, ২০২০
৩ অক্টোবর, ২০২০
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন