Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

আওয়ামী লীগে বাড়ছে ক্ষোভ

ইয়াছিন রানা | প্রকাশের সময় : ২৩ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০২ এএম

দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেও মূল্যায়িত না হওয়া, কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী-হাইব্রিডদের কারণে ত্যাগীরা কোণঠাসা হওয়া, নেতাকর্মীদের অপকর্মের কারণে দলের বদনাম হওয়া, স্থানীয় পর্যায়ে এমপি লীগ, ভাই লীগ তৈরী হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে আওয়ামী লীগে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়া ও প্রশাসন নির্ভরতার কারণে চিন্তিত দলের হাই-কমান্ড ও শুভাকাক্সিক্ষ মহল। এছাড়া যাদের দায়িত্ব দেয়া হয় তারাই দলের চিন্তা না করে নিজের বলয় গোছানোর কারণেও প্রকট আকারে দ্ব›দ্ব বাড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। আর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিশেষত জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল আওয়ামী লীগে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দফতর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতর, দুদকে তৃণমূল থেকে আসা অভিযোগের স্তূপ জমা হচ্ছে প্রতিদিনই। কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক নেতার বিরুদ্ধে অন্য নেতার মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনও হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান সমাধান নেই, বরং দলের বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করা ব্যক্তিদের সাধারণ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষকলীগ ও মৎসজীবি লীগের কমিটি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, তৈরী হয়েছে ক্ষোভ। ত্যাগীদের বাদ দেয়া, স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের সদস্য, রাজনীতি না করেও পদ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলের ভিতরেই। মৎসজীবি লীগে গত সম্মেলনে যারা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন তাদের কাউকেই পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রাখা হয়নি। সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট হারুনর রশিদ এবং সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রেদওয়ান খান বোরহান এ অভিযোগ করেছেন। এছাড়া পদ পেতে অর্থের লেনদেন হয়েছে বলেও জানান এই দুই নেতা।

ক্যাসিনোকান্ডে অব্যহতি পাওয়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি মোল্লা আবু কাওছারের ‘ক্যাশিয়ার’ বলে পরিচিত কাজী শহীদুল্লাহ লিটনকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদ্য ঘোষিত কমিটিতে ৫ নম্বর সহসভাপতি করা হয়েছে। এছাড়া সহসভাপতি হিসেবে ঠাঁই পাওয়া দেবাশীষ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মানিক ঘোষ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোবাশ্বের চৌধুরীর বিরুদ্ধেও টেন্ডারবাজি ছাড়াও ক্যাসিনো কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া নূরে আলম সিদ্দিকী হকের বাবা রাজাকার। হাইকোর্টে জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতির সঙ্গে কাজ করার পুরস্কার পেয়েছেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে আওয়ামীবিরোধী পরিবার হিসেবে পরিচিত পরিবারের সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জহিরউদ্দিন লিমন।

কখনো আওয়ামী লীগ বা কৃষক লীগ না করেও তথ্য এবং গবেষণা বিষয়ক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন শামীমা সুলতানা। তিনি নড়াইলের প্রয়াত বিএনপি নেতা শরীফ খসরুজ্জামানের মেয়ে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ২০ অক্টোবর প্রথম ধাপের ৫৮ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা শতাধিক। নেতা বা এমপির পছন্দের প্রার্থী না হলেই তার বিপক্ষে কয়েকজনকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পৌরসভার নির্বাচন সামনে রেখেও সারাদেশে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পৌরসভার মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় গত শনিবার ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান ওরফে শুভ্রকে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এ হত্যায় জড়িত থাকতে পারে বলে শুভ্রর পরিবারের ধারণা। সম্প্রতি ময়মনসিংহ-৩ আসমের এমপি নাজিম উদ্দিনের নারী কেলেঙ্কারী নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছে।

জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়েও চলছে নেতাদের মধ্যে দ্ব›দ্ব। নোয়াখালী জেলা কমিটিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের পদ দেয়ায় আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বিরাজ করছে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে শাবাব চৌধুরীকে প্রস্তাবিত কমিটিতে যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক পদ দেয়ায় সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপক। জানতে চাইলে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র শহীদউল্লাহ খান সোহেল ইনকিলাবকে বলেন, প্রস্তাবিত কমিটিতে জামায়াত, পরে বিএনপি করেছেন- এমন লোককেও জেলা কমিটিতে রাখা হয়েছে। গত কমিটির সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক- এমনকি সম্পাদকমন্ডলীর দায়িত্ব পালন করেছে এমন অনেক ত্যাগী নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে এ কমিটি থেকে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মঈনুদ্দিন মন্ডলের ছয়জন নিকটাত্মীয়কে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে রাখা হয়েছে। মঈনুদ্দিন মন্ডলের ভাই মর্তুজা আলী সহসভাপতি, ভাতিজা পারভেজ হাসান বাবু সাংগঠনিক সম্পাদক, নাতি সামিউল হক লিটন সদস্য, শ্যালিকা রানী বেগম ও ভায়রা মেসবাহুল হক জুয়েলকে সদস্য পদে প্রস্তাব করা হয়েছে।

দলে অনুপ্রবেশকারী, স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুতেও দ্ব›দ্ব চলছে অনেক জায়গায়। তেমন একটি উপজেলা নেত্রকোনার মহনগঞ্জ। পৌর মেয়র এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লতিফুর রহমান রতন স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের সন্তান হবার অভিযোগে উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধারা তাকে এড়িয়ে চলেন। পৌর মেয়র রতনের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের জমি দখল, চাঁদাবাজি নয়, কিশোর গ্যাং তৈরী করে তাদের দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ, কিশোরদের রাজনীতিতে জড়িয়ে শিক্ষা বিমুখ করা, কিশোরদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার মতো কাজ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদ ইকবাল। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের কোন দলীয় পদে রাজাকার কিংবা তাদের উত্তরসুরীরা আসীন থাকতে পারেনা। এটি দলের জন্য অবমাননাকর, মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা কর। একজন রাজাকারের পুত্রের কমান্ড মেনে মুক্তিযোদ্ধা চলতে পারেনা।

শুধু জেলা নয়, ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। দুই একজন অনুপ্রবেশকারী, অপকর্মকারীদের কারণে দলের সৎ ভাল নেতারা বিব্রত। ফেনী সদর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও ধর্মপুর ইউনিয়নের মেম্বার নজরুল ইসলাম ২০০১ সালে নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে মঠবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ হতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি বের করে ভংচুর করেছিলেন। নজরুল ইসলামের নেতা হওয়া নিয়েও ক্ষোভ তৃণমূলে। বিএনপি থেকে হঠাৎ আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠা এই নেতাদের কাছে ত্যাগী নেতা কর্মীরাও অসহায় ও জিম্মি। নজরুলের কাছে জিম্মি তার পরিবারে সদ্যসরাও। যুবলীগের প্রভাব খাটিয়ে পারিবারিক কবরস্থান ও সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগ করেন তার আপন ভাই মামুনুল ইসলাম।

এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও, খুলনা, কক্সবাজার, সিলেট জেলা ও মহানগর, হবিগঞ্জ, রাজশাহী জেলা এবং মহানগরসহ অন্তত ২৪ জেলা সাংগঠনিক ইউনিটে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিরাজ করছে। এ সব বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অনেক কমিটিতেই বিতর্কিতরা স্থান পেয়েছে। এ নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে সবাইকে নিয়ে সমন্বয় করেই কমিটি গঠন হবে।

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন। নানা কারণে বিতর্কিতরা দলে ঢুকে পড়ে, এতে দলের অনেক নেতা জড়িত থাকে। আমরা যাচাই বাছাই করে অনুপ্রবেশকারী, বিতর্কিথ, অপরাধীদের বাদ দেয়া প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, যাঁচাই বাছাই করে শীঘ্রই জেলা কমিটি দেয়া হবে।#



 

Show all comments
  • Khairul Bashar ২২ অক্টোবর, ২০২০, ৬:২৭ এএম says : 0
    ত্যাগী নেতাদের মূলায়ন হয়না হটাৎ হাইব্রিড নেতারা পদপদবী পায় মামুর জোরে
    Total Reply(0) Reply
  • সত্য বলবো ২২ অক্টোবর, ২০২০, ৬:২৭ এএম says : 0
    এদের দলের ভেতর গণতন্ত্র নাই, এরা আবার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে।
    Total Reply(0) Reply
  • জন্মভুমি ছাতক ২২ অক্টোবর, ২০২০, ৬:২৮ এএম says : 0
    একটা দল দীর্ঘদিন বিনা ভোটে ক্ষমতায় থাকলে এটা হবেই স্বাভাবিক।
    Total Reply(0) Reply
  • সাইফুল ইসলাম চঞ্চল ২২ অক্টোবর, ২০২০, ৬:২৯ এএম says : 0
    এখনতো আর জনগণের সমর্থনে নেতা হওয়া যায় না, যার যতো মামা খালু আর লবির জোর আছে সেই নেতা হতে পারে।
    Total Reply(0) Reply
  • হিমেল ২২ অক্টোবর, ২০২০, ৬:২৯ এএম says : 0
    ক্ষমতা আর অবৈধ সম্পদের জন্য যত কাড়াকাড়ি।
    Total Reply(0) Reply
  • মোহাম্মদ জাকির হোসেন ২২ অক্টোবর, ২০২০, ১:৪৭ পিএম says : 0
    কারও ভাগে কম পরবেনা, সবাইকে পুষিয়ে দেয়া হবে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আওয়ামী লীগ

২৭ অক্টোবর, ২০২০
৩ অক্টোবর, ২০২০
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন