Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

কিডনি সুস্থ রাখতে করণীয়

| প্রকাশের সময় : ২৩ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০২ এএম

শিমের বিচির মতো কালচে বাদামি বর্ণেও কিডনি বা বৃক্ক ওজনে প্রায় ১২৫ থেকে ১৭০ গ্রাম হয়। বৃক্ক দু’টি মানবদেহের উদরগহ্বরের কটি অঞ্চলে মেরুদন্ডের উভয় পাশে পেরিটোনিয়ামের নিচে, পৃষ্ঠ প্রাচীরসংলগ্ন অবস্থায় অবস্থিত। কিডনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আমাদের দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ঘন ঘন ইউরিন ইনফেকশন, অস্বাস্থ্যকর ও অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া-দাওয়া, অতিরিক্ত ওজন ছাড়া আরো নানা কারণে কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে যা কিডনি বিকলও করতে পারে। আগে থেকে সচেতন হলে এ সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া যায়।

আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাই, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূলসহ সব খাবারেই রয়েছে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি। ভেজালের প্রক্রিয়ায় খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক, নিম্নমানের, ক্ষতিকর, অকেজো ও অপ্রয়োজনীয় বহির্জাত দ্রব্য সরাসরি মেশানো বা যোগ করা হয়। এগুলো কিডনির কার্যক্ষমতা সরাসরি কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি যকৃত, চোখ, হৃৎপিন্ড ইত্যাদির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাই বাজারের শাকসবজি ও ফলাদি কেনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন ও কেনার পর ভালো করে ধুয়ে রান্না করা উচিত এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা উচিত।

কিডনি সুস্থ রাখতে করণীয়- * পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন : প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস পানি বা তরল খাবার খাওয়া উচিত। তবে অতিরিক্ত ঘাম হলে পানি খাওয়ার পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে । পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেলে কিডনিতে পাথর হয় না এবং এর স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক থাকে।

* লবণ কম খান: খাবারে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া কিডনির জন্য ক্ষতিকর। মানুষের শরীরে প্রতিদিন মাত্র এক চা চামচ লবণের চাহিদা থাকে।

* প্রাণিজ প্রোটিন অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকুন: গরুর গোশত, খাসির গোশত, শূকরের মাংস ইত্যাদি খেলে কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। খাবার তালিকায় অতিরিক্ত প্রোটিন থাকলে কিডনির ওপর চাপ পড়ে এবং কিডনির দুর্বল কোষগুলোর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন এড়িয়ে মাছ বা ডাল জাতীয় প্রোটিন খাবার তালিকায় রাখুন।

* রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখুন: রক্তচাপ ১৪০/৯০- এর ওপরে থাকলে কিডনির সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই কিডনি ভালো রাখতে রক্তচাপ সব সময় ১৩০/৮০ অথবা এর কম রাখার চেষ্টা করুন। রক্তচাপ কমিয়ে রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করা ও লবণ কম খাওয়া জরুরি। পনির, চিপস, আচার, চানাচুর ইত্যাদি লবণসমৃদ্ধ খাবার, বিভিন্ন ফ্লেভার মেশানো খাবার, মাখন, পনির, ক্রিম, চকলেট মিল্ক, সসেজ, চিপস, আচার সয়াসস ইত্যাদি যেকোনো প্রোসেসড তৈরিকৃত খাবার অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
* ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন : ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে কিডনি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত রক্তের সুগারের পরিমাণ পরীক্ষা করান। সুগার বেশি থাকলে মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।

* ওষুধ খাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধান : কম-বেশি প্রায় সব ওষুধই কিডনির জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে ব্যথানাশক ওষুধগুলো কিডনির জন্য একেবারেই ভালো নয়। নিয়ম না জেনে নিজে নিজে ওষুধ কিনে খেলে আপনার অজান্তেই কিডনির বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* কোমল পানীয় ত্যাগ তরুন। অনেকেই পানির বদলে কোমল পানীয় বা বিভিন্ন রকম অ্যানার্জি ড্রিংকস খেয়ে থাকেন। এ ধরনের পানীয়গুলো কিডনির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

* ধুমপান ও মদপান ত্যাগ করুন : ধূমপান ও মদপানের কারণে ধীরে ধীরে কিডনিতে রক্ত চলাচল কমতে থাকে এবং এর ফলে কিডনির কর্মক্ষমতাও হ্রাস পায়। ফলে ধূমপায়ী ও মদপানকারী ব্যক্তি একপর্যায়ে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়।

* নিয়মিত কিডনির পরীক্ষা করান : উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন অথবা পরিবারের কারো কিডনি সমস্যা থাকলে কিডনি রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যাদের কিডনি রোগের ঝুঁকি আছে, তাদের অবশ্যই নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানো উচিত।

* কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষা : নিয়মিত কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন । বিশেষত পরিবারের কারো যদি এ রোগের ইতিহাস থাকে। তবে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

* ডায়াবেটিক রোগীদের কিডনিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। তাই ডায়াবেটিক রোগীদের এ বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। তাহলে ডায়াবেটিসের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন কিডনি-বিষয়ক জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

* অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিস্বরূপ, এটি কিডনিকে অকেজো করার পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য সমস্যা যেমন-হার্ট ফেইলিউর, স্ট্রোক ইত্যাদি করে থাকে। তাই নিয়মিত ও নিয়মমাফিক রক্তচাপ পরীক্ষা জরুরি। * ব্যায়াম না করা, উচ্চ ক্যালরি যুক্ত খাবার গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের জন্য ঝুঁকি কি হিসেবে কাজ করে, যা কিডনি রোগের জন্য মারাত্মক আকারে দেখা দেয়।

* ধূমপান ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকারক। এটি কিডনি রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

* অপার্যাপ্ত পানি পান কিডনির ওপর চাপ ফেলে। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পানে কিডনি থাকে সুস্থ ও সবল।

পরিবারের সব সদস্যের পাশাপাশি মেয়েদের ও গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে বুঝেশুনে ও দেখে খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মকানুন মেনে চলা এখন সময়ের চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন। প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন। খাদ্য ও পথ্য নির্দেশনা-নিয়মিত খাবেন-শাকসবজি, রসুন, ইসবগুল, পাকা বেল, কালোজিরা, মেথী, আদা, মধু, পেঁপে, লাউ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লেবুর শরবত, আমলকী, করলা, টক দধি, গাজর, শশা, সামুদ্রিক মাছ, চীনাবাদাম, শিম বীজ, কাঁচা কলা, দুধ, খেজুর, কিশমিশ, মৌসুমি ফল, তোখমা দানা, কাঁচা হলুদ ও কচি ডাব ইত্যাদি। খাবেন না-হাইব্রিড খাবার (ফার্মের ডিম ও মাংস) ও গরুর মাংস, চিংড়ী মাছ, ইলিশ মাছ, দুধ চা, কফি, বেগুন, পুঁইশাক, হাঁসের মাংস ও ডিম, ঢেঁড়স, মুশুরের ডাল, কচু ও তেলে ভাজা খাবার, চর্বিযুক্ত ও অতি মসলাযুক্ত ভূনা খাবার ইত্যাদি। নিষেধ- ধূমপান, মাদকদ্রব্য, পান, জর্দা, তামাক, অধিক যৌন সঙ্গম ও অধিক রাত্রি জাগরণ, অতি ঝাল, অতি মিষ্টি, কাঁচা লবণ। শাকসবজি বিষমুক্ত করার নিয়ম- নিম্নােক্ত পদ্ধতিতে শাক সবজি অনেকাংশে বিষমুক্ত করা যায়। ফল- অন্তত ১ ঘণ্টার জন্য পানিতে ডুবিয়ে রাখুন এতে ফরমালিনের মাত্রা কমে যাবে এবং খাবার উপযোগী হবে। সবজি- রান্না করার আগে কুসুম গরম পানিতে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন অত:পর পরিষ্কার করে রান্না করুন ফরমালিন কমে যাবে। মাছ- সাধারণত কুসুম গরম পানিতে ১ ঘণ্টা চুবিয়ে রাখলে ৬০% ফরমালিন কমে যায় এবং তা যদি লবণ পানিতে চুবিয়ে রাখা যায় তাহলে ৯০% পর্যন্ত ফরমালিন কমে যাবে। শাক সবজি- ফরমালিন মুক্ত করার আরো একটি সহজ পদ্ধতি হলো আধা বালতি পরিস্কার পানিতে এক চামচ খাওয়ার সোডা মিশিয়ে নিন। এর মধ্যে শাক বা সবজি ভালো করে ডুবিয়ে পানিটা ফেলে দিয়ে আবার আধা বালতি পরিস্কার পানিতে ধুয়ে ফেললে শাক সবজি অন্তত: নব্বই ভাগ বিষমুক্ত হবে।

ডা: মাও: লোকমান হেকিম
চিকিৎসক-কলামিস্ট, মোবা : ০১৭১৬২৭০১২০।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কিডনি-সুস্থ

আরও পড়ুন