Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

গাড়িচালকদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৪ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০২ এএম

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বহু লেখালেখি হলেও তা ঠেকানো যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য হয়েই রয়েছে। প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। পত্র-পত্রিকার পাতায় এ সংক্রান্ত খবর উল্লেখযোগ্য স্থান জুড়ে থাকে। গতকালকের পত্রিকার খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর হিসাব অনুযায়ী, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনার হার আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালে ১৭.৭৫ ভাগের চেয়ে বেড়ে হয়েছে ৫১.৫৩ ভাগ। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এ বছরের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা গড় হিসাবের অর্ধেকে নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, এ হার বৃদ্ধির ফলে তা অর্জন করা কঠিন হবে বলে সংস্থাটি মনে করছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এ বছর করোনালকডাউনের মধ্যেও সড়ক দুর্ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এমন কোনো দিন নেই যেদিন সড়কে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে সড়ক শৃঙ্খলায় কার্যকর তদারকি এবং সচেতনতা সৃষ্টির অভাব ও ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। বছর দুয়েক আগে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকার আইন সংশোধন এবং কার্যকর করলেও তাতে যে খুব একটা কাজ হয়নি তা প্রতিদিনের দুর্ঘটনায় মানুষের নিহত-আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে চালকদের অসতর্কতা এবং বেপরোয়া মনোভাব অন্যতম। চালকদের এই আচরণের মধ্যে তাদের মাদকাসক্তি মূল ভূমিকা পালন করছে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গাড়িচালক মাদকাসক্ত। এ চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২০ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সব চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সড়কে পথচারীদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো উল্লেখ করে ব্যাপক প্রচারের তাকিদ দিয়েছেন।

সড়ক দুর্ঘটনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিষফোঁড়া হয়ে রয়েছে। এক হিসাবে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর জিডিপির ২ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। দুর্ঘটনায় নিহত হওয়াদের বেশিরভাগই উপার্জনক্ষম, যারা অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সড়ক দুর্ঘটনা এমনই যে এতে শুধু ব্যক্তিই আহত বা নিহত হয় না, তার পুরো পরিবারই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ক্রমাগত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন কত পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। তবে প্রতি বছরের দুর্ঘটনার গড় হিসাব থেকে নিহত হওয়া মানুষের সংখ্যা থেকে এর একটি ধারণা পাওয়া যায়। বহুদিন ধরেই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। পরিসংখ্যানেও তা তুলে ধরা হচ্ছে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের পেছনে মাদকাসক্তি মূল কারণ তা হাইকোর্টের নির্দেশনা থেকেই বোঝা যায়। গত বছরের ২০ জুন হাইকোর্ট এক আদেশে নির্দেশ দিয়েছেন, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ডোপ টেস্ট ও দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করতে হবে। আদালত ছয় মাসের মধ্যে এমন সিস্টেম চালু করার জন্য সরকার, বিআরটিএ এবং পুলিশকে নির্দেশ দেন। এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এমন সিস্টেম চালু করা হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে এর আগে আদালত মহাসড়কে ধীরগতির থ্রি হুইলার নসিমন, ভটভটি, রিকসার মতো যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ এবং ফুটপাতে দোকানপাট বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। আদালতের কোনো নির্দেশই আজ পর্যন্ত প্রতিপালিত হয়নি। চালকদের ডোপ টেস্ট করা নিয়ে আদালতের নির্দেশের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই টেস্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পালন করে কিনা। উন্নত দেশগুলোতে ড্রাইভারদের অত্যন্ত কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। শুধু গাড়ি পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে গাড়ির অবস্থানে সামান্যতম হেরফের হলে লাইসেন্স দেয়া হয় না বা স্থগিত করা হয়। অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল হওয়া থেকে শুরু করে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। পার্শ্ববর্তী ভারতে চালক মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে কিনা তার তাৎক্ষণিক পরীক্ষার জন্য পুলিশের কাছে পোর্টেবল হ্যান্ডি মেশিন রয়েছে। এ মেশিন চালকের নিঃশ্বাসের কাছে ধরলেই মাদক সেবনের বিষয়টি সাথে সাথে ধরা পড়ে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আমাদের দেশে যেখানে চালকদের মধ্যে ব্যাপক হারে মাদকাসক্তি রয়েছে, সেখানে অনতিবিলম্বে ডোপ টেস্ট চালু করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তা নাহলে, সড়কে মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের অসতর্কতা এবং মানসিক সুস্থ্যতার অভাব এবং অবসাদগ্রস্থতা দায়ী। চালক যদি মানসিকভাবে সুস্থ না থাকে, তাবে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে চালকদের বিরামহীন গাড়ি চালনাও অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কয়েক বছর আগে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, চালকদের একনাগাড়ে গাড়ি চালাতে না দিয়ে বিশ্রাম দিয়ে গাড়ি চালাতে। এজন্য মহাসড়কের পাশে বিশ্রামাগার তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তার হদিস পাওয়া যায় না। সর্বশেষ তিনি চালকদের ডোপ টেস্ট করার জন্য বলেছেন। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। এজন্য বিআরটিএসহ পরিবহন সংশ্লিষ্ট মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। তাদের বিবেচনায় নিতে হবে কার হাতে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের দায়িত্ব তুলে দেয়া হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, গাড়ির চালক যদি সুস্থ থাকে তবে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া যাত্রী ও পথচারীদের যেমন সতর্ক হতে হবে, তেমনি তাদের সতর্ক করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও বিভিন্ন প্রচারণামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ডোপ-টেস্ট
আরও পড়ুন