Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে তিনশ নির্বাচনী আসনে সিনেপ্লেক্স জরুরী-হাবিবুল ইসলাম হাবিব

বিনোদন ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৫ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০১ এএম

দেশীয় সিনেমার সবচেয়ে বড় দুঃসময় এখন চলছে-এ কথাটি সিনেমার সাথে জড়িত সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন। তাহলে কি অদূর ভবিষ্যতে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প এই দুঃসময়ে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে? এই প্রশ্ন এখন দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারি এসে প্রশ্নটাকে আরো জোরালো করে তুলেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোন মহামারী মানব সভ্যতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, করোনা দুর্যোগও একসময় থেমে যাবে, এটা আশা করা যায়। তবে করোনা থিতু হলে সিনেমা কি রমরমিয়ে চলবে? মনে হয়, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। এর অন্যতম কারণ, আমাদের দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে কমতে যেভাবে তলানীতে এসে ঠেকেছে, তা সিনেমা শিল্পের জন্য অশনি সংকেত। হলই যদি না থাকে সিনেমা হবে কি করে? কোথায় তা প্রদর্শন করা হবে? নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল এক হাজার চারশ’ পয়ত্রিশটি। দুই দশকে কমতে কমতে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে একশ’র কাছাকাছি। মাঝেমধ্যে নানা উৎসব উপলক্ষে কালেভদ্রে ৪০-৫০টি ভাঙ্গাচুরা অস্বাস্থ্যসম্মত সিনেমা হল যুক্ত হয় খোলা হয়। গত দুই দশকে দেশে নতুন সিনেমা হল নির্মিত হওয়ার নজির খুব কমই রয়েছে। সিনেমা হলেই যদি না থাকে তাহলে ভাল সিনেমা না মন্দ সিনেমা হচ্ছে, তা দর্শক জানবে কি করে? হাটে, মাঠে-ময়দানে প্রদর্শনের জন্য তো সিনেমা নির্মাণ করা হয় না। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিনোদনের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় মাধ্যম সিনেমা। এই বড় মাধ্যমটির উদ্ভব হয় ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর লুমিয়ের ব্রাদার্সের মাধ্যমে। তারা সর্বপ্রথম সিনেমা দর্শকদের সামনে নিয়ে আসেন। এই ঘটনার পরপরই মাত্র এক দশকের মধ্যেই সিনেমা এক বিশাল বিনোদন শিল্পে পরিণত হয়। নির্বাক থেকে সবাক, সাদা কালো থেকে রঙ্গীন হয়ে পাড়ি দিয়েছে অনেকটা পথ। সিনেমার এই পথ চলায় অবিভক্ত ইংরেজ শাসিত ভারতও খুব একটা পিছিয়ে থাকেনি। সিনেমার যাত্রা শুরুর পরের বছর ভারতের দর্শকরা সিনেমার সাথে পরিচিত হয়। ১৮৯৬ সালে তৎকালীন বোম্বে শহরের ওয়াটসন হোটেলের বিরাট হল ঘরে লুমিয়ের ভাইদের সিনেমা ‘দ্য অ্যারাইভাল অব এ ট্রেন অ্যাট দ্য স্টেশন’ প্রদর্শিত হয়। ১৮৯৮ সালে কলকাতায় প্রথম সিনেমা প্রদর্শন করা হয়। জে স্টিভেনসন নামে এক ইংরেজ স্টার থিয়েটারে প্রদর্শিত করেন নির্বাক সিনেমা। এ সূত্র ধরে সারাবিশ্বে সিনেমা নির্মাণের জোয়ার সৃষ্টি হয়। অবশ্য এর পেছনে প্রেরণা হিসেবে ছিল বানিজ্যিক মুনাফা অর্জন। বিশাল দর্শকের মুগ্ধ হয়ে বিনোদনের অভিনবত্ব উপভোগ করার আগ্রহকে পুঁজি করে সিনেমা এগিয়ে চলতে শুরু করে। পূর্ব বাংলায় ১৮৯৮ সালে পাটুয়াটুলি এলাকায় ক্রাউন থিয়েটারে প্রথম সিনেমা প্রদর্শিত হয়। প্রথাগত সিনেমা হল নির্মিত হয় ১৯১৫ সালে। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল চলছে। লেজার নামের এক ইংরেজ নবাব ইউসুফ খানের কাছ থেকে জায়গা কিনে আরমানিটোলায় সিনেমা হল নির্মাণ করে নাম দেন পিকচার হাউজ। লেজার সেটি পরে বিক্রী করে দেন উদ্ভবজী ঠাকুর নামের এক মারোয়ারি ব্যবসায়ির কাছে। অনেক পরে পিকচার হাউজ নাম বদলে হয় শাবিস্তান। সারাদেশে সিনেমার জনপ্রিয়তার কারণে একের পর এক গড়ে উঠে সিনেমা হল। দেশ ভাগ হয়ে আমরা যখন পূর্ব পাকিস্তান তখন অনেকের মাথায় আমাদের নিজেদের সিনেমা বানানোর ভাবনা শুরু হয়। ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করতে এগিয়ে আসেন আব্দুল জব্বার খান। ফরিদপুরে সংগঠিত এক ডাকাতির কাহিনী নিয়ে তিনি নেমে পড়েন বাংলার প্রথম সিনেমা বানাতে। ১৯৫৩ সালে নির্মাণ কাজ শুরু করে ১৯৫৬ সালে মুক্তি দেন বাংলার প্রথম সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’। সিনেমাটি দর্শকদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল। সিনেমাটি নির্মানে ব্যয় হয়েছিল চৌষট্টি হাজার রুপী। প্রথম দফাতেই সিনেমাটি আয় করে ৪৮ হাজার রুপী। সেই থেকে সিনেমা আর থেমে থাকেনি এই বাংলায়। পয়ষট্টির যুদ্ধের পর ভারতীয় সিনেমা নিষিদ্ধ হলে লাহোর করাচীর সিনেমার সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলে পূর্ব বাংলার সিনেমা। আজ সেই সিনেমা ভয়াবহ দুর্দশায় নিপতিত। বাংলাদেশের বহু জেলায় এই সময়ে কোনো সিনেমা হল নেই। পর্যটন নগরী কক্সবাবাজারে বিনোদনের জন্য কোনো সিনেমা হল নেই। আগে এই শহরে দুটি সিনেমা হল ছিল। পর্যটনের আরেক শহর রাঙ্গামাটির অবস্থাও তাই। আগে এই শহরে তিনটি সিনেমা হল ছিল। ঢাকার পাশে নরসিংদী শহরে ছিল তিনটি সিনেমা হল। এখন একটিও নেই। একই অবস্থা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরেও। সেখানে তিনটি সিনেমা হলের সবকটিই বন্ধ। সিনেমা হল নেই নড়াইল, ঝালকাঠি, পঞ্চগর, মুন্সীগঞ্জ জেলায়। একের পর এক বন্ধ হয়ে সেখানে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন ও মার্কেট। এজন্যই চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে সিনেমা হল জরুরী। বলা হয়, মানস¤পন্ন সিনেমা না থাকাতে সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শক। অস্বীকার করার উপায় নেই, মানস¤পন্ন সিনেমা তৈরি না হওয়ার পাশাপাশি মানসম্পন্ন পরিবেশ সমৃদ্ধ সিনেমা হলও দেশে নেই বললে চলে। যা আছে তার সংষ্কার নেই, নেই আধুনিক বিলাসের সুযোগ সুবিধা। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রথাগত সিনেমা হলের এখন সংজ্ঞা বদলে গেছে। সিনেমা দেখার প্রচলিত ধারণা বদলে অন্যরূপ ধারণ করেছে। সিনেমা দেখা, কেনাকাটা, খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি মিলিয়ে প্যাকেজ বিনোদনের সময় এখন। মানুষের পরিবর্তিত এই জীবনধারার সঙ্গে মিল রেখে এখন সিনেপ্লেক্স গড়ে তোলার বিকল্প নেই। নব্বই দশক পর্যন্ত সিনেমা দেখাটা ছিল পারিবারিক বিনোদনের অন্যতম উৎস। অবস্থাটা বদলে যেতে থাকে আকাশ সংষ্কৃতির উদ্ভব হওয়ার মধ্য দিয়ে। এর আগে টেলিভিশনে চ্যানেল বলতে একটিই ছিল বিটিভি। আকাশ সংষ্কৃতি নাগরিক জীবনে বহু চ্যানেল চব্বিশ ঘন্টা দেখার সুযোগ করে দেয়। তার মধ্যে আবার বিদেশী চ্যানেল রয়েছে। তাতে আরও যোগান দেয় বাংলা সিনেমার অধগতি। সে সময় বহু নির্মাতাকে বলতে দেখা গেছে, তাদের নির্মিত সিনেমা নি¤œবিত্তরা দেখলেই তারা টিকে যাবে। সেজন্যই হয়তো অশ্লীল সিনেমা জায়গা করে নেয়। মেধা ও মননের চর্চার এই পতনে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করে বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্তকে। তারা বিনোদনের উৎস হিসেবে আঁকড়ে ধরে টিভিকে। দর্শক কমতে থাকায় লোকসানের বোঝা টানতে টানতে প্রথাগত সিনেমা হলগুলো বন্ধ হতে থাকে। নিভু নিভু করে কিছু সিনেমা হল টিকে থাকলেও সংস্কার ও পরিবেশের অভাবে দর্শককে বিমুখ করে দেয়। সিনেমা দেখার পরিবেশ তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তাহলে কি আকাশ সংস্কৃতির বিকাশ সিনেমার এই দুর্দশার জন্য দায়ী? এই প্রশ্নে বিতর্ক চলতে পারে, অনেকেই এই প্রশ্নে সমর্থন জানাতে পারেন। তবে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিচার করা হলে দেখা যাবে, আকাশ সংস্কৃতির বিকাশ সিনেমাকে হটাতে পারেনি বরং তা সহায়ক হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, সেখানে বলিউডের সিনেমার রমরমা অবস্থা। এমনকি দেশটির আঞ্চলিক সিনেমাও ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। সেখানে সিনেমার হিট বিচার হচ্ছে প্রথম সপ্তাহে সেল শত কোটির বিচারে। দেশটিতে আকাশ সংস্কৃতির বিকাশে রয়েছে তিনটি মাধ্যম। ক্যাবল টিভি, ডিটিএইচ, আইপি টিভি। রয়েছে আঞ্চলিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক মিলিয়ে সহস্র টিভি চ্যানেল। অথচ সেখানের সিনেমা ঠিকই ব্যবসা করছে এবং প্রসারিত হচ্ছে। তাই আমাদের সিনেমা না চলার জন্য শুধু সিনেমার গুণমানই দায়ী নয়। এর জন্য মানসম্মত, নিরাপদ ও উন্নত পরিবেশের সিনেমা হল না থাকাও দায়ী। সিনেমার এই দুঃসময়ে যদি প্রতিটি সংসদীয় আসনে একটি করে সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়, তবে তিনশ’ সিনেমা হল হবে। এর মাধ্যমে হল সংকট যেমন কাটবে, তেমনি নির্মাতারাও সিনেমা নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
লেখকঃ চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: চলচ্চিত্র

৫ নভেম্বর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন