Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: হৃদয়ে ঢেউ তোলা মহাপুরুষের সেরা ১০ সিনেমা

বিনোদন ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৬ অক্টোবর, ২০২০, ১২:৩২ পিএম

১৯ জানুয়ারি, ১৯৩৫ সালের নদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ভারতের টলিপাড়ার বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দুর্দান্ত অভিনয়ের মাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছেন অজস্র সিনেমা প্রেমী মানুষের হৃদয়ে। প্রায় ছয় দশকের ক্যারিয়ারে অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রগুলোকে করে তুলেছেন অমর। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সাথে সহযোগিতার জন্য সর্বাধিক পরিচিত তিনি।

১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ সিনেমায় প্রথম অভিনয় করেন সৌমিত্র। যার সঙ্গে ১৪টি সিনেমায় কাজ করেছেন এ মহাপুরুষ। এছাড়াও মৃণাল সেন, তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণা ঘোষ, অপর্ণা সেন, কৌশিক গাঙ্গুলী, অতনু ঘোষ, সৃজিত মুখার্জীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকের সমসাময়িক শীর্ষ অভিনেতাদের মধ্যে একজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দীর্ঘ ষাট বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে চলচ্চিত্রের শীর্ষ শিরোনাম ধারণ করেন তিনি। ২০১২ সালে ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পুরষ্কারেও ভূষিত হয়েছেন। ২০১৬ সাল পর্যন্ত বেশ কিছু নাটকসহ প্রায় দুইশ দশটিরও অধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন এ কিংবদন্তী।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনিত সেরা ১০টি সিনেমার কিছু অংশ দৈনিক ইনকিলাব পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো নিচে-

১. ক্লাসিক অপু : ক্লাসিক অপুর সংসার সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন কিংবদন্তী সৌমিত্র। সিনেমাটি প্রকাশ হওয়ার পর আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রথম শটেই তিনি যেন ঝলক দেখান। ‘খাওয়ার পর একটা করে, কথা দিয়েছ’; শর্মিলা ঠাকুরের সাথে তার এ সংলাপ ও রসায়ন এখনও বাঙালির মনে ঢেউ তোলে। পরে নারী মহলে ঢেউ তোলা এ সুদর্শন পুরুষকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

২-৩. সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথ (ফেলুদা চরিত্র) : ভারতের উপমহাদেশের জনপ্রিয় চরিত্র ফেলুদা। সত্যজিৎ রায় রচিত এ চরিত্রের অবলম্বনে নির্মাণ করা হয় সিনেমা। এখানে চরিত্রটিকে বড় পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন ওই গুণী অভিনেতা। যা হয়তো অন্য কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। ১৯৭৪ সালে সোনার কেল্লা এবং ১৯৭৮ সালে জয় বাবা ফেলুনাথ ছবিতে ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন টলি সিনেমার এ বৃহৎ নায়ক।

এ গল্পে সৌমিত্র একজন ২৭ বছর বয়সী যুবক, যার উচ্চতা ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। মার্শাল আর্টে বিশেষ দক্ষ তিনি। অসম্ভব ভালো বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে যে কোনো রহস্যের সমাধান করার জন্য আস্থা রাখতে ভালোবাসে সে। সিনেমায় তাকে বিভিন্ন সময় গোয়েন্দাগিরি করতেও দেখা যায়।

৪. দেবী : ১৯৬০ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত এ ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর, ছবি বিশ্বাস, অনিল চট্টোপাধ্যায়, করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এ সিনেমা সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার রাষ্ট্রপতি রৌপ্য পদক লাভ করে ১৯৬০ সালে। এছাড়াও ১৯৬২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে পালমে ডি’অর এ মনোনীত হয়েছিল সেই সময়।

৫. ফ্ল্যাট নং ৬০৯ : অরিন্দম ভট্টাচার্যের পরিচালনায় এ সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০১৮ সালে। এতে সৌমিত্র ছাড়াও অভিনয় করেছেন আবির চট্টোপাধ্যায়, তনুশ্রী চক্রবর্তী, মমতাশঙ্কর, পূজারিনি ঘোষ, খরাজ মুখোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ প্রমুখ।

সাদামাটা গল্পের এ সিনেমায় হরোর, থ্রিলার ও রোমান্স সবই আছে। সবে মাত্রই বিয়ে করে অর্ক ও সায়ন্তনী। নতুন ফ্ল্যাটের খোঁজ করতে থাকে নব দম্পতি। কিছুটা দূরে পছন্দমত একটি বাড়ি পেয়ে যায়; যার ফ্ল্যাট নং-৬০৯। পরিবেশ ভালো। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে পকেটের খরচ খানিকটা বেশি। নতুন এ ফ্ল্যাটে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে। অনেক চেষ্টা করেও কিছু করতে পারে না তারা। রোমান্সের দিকে তারা বদলে ফেলে শরীরী ভাষা।

৬. চারুলতা : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় গল্প ‘নষ্টনীড়’ এর কাহিনীর উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে এর চিত্রনাট্য। ‘নষ্টনীড়’ গল্পে দেখানো হয়েছে নব্বই দশকের (১৮৭৯) ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত এ সিনেমার সার্থকতা বয়ে আনার জন্য গল্পের কাহিনীতে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৯৬৪ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমা ইংরেজিভাষী বিশ্বে সবার কাছে ‘দ্য লনলি ওয়াইফ’ নামে পরিচিত।

১৯৬৪ সালে সিনেমাটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার বেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। এর ঠিক পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে ভারতীয় সেরা চলচ্চিত্র হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র গোল্ডেন লোটাস পুরস্কার পান। এছাড়াও একই বছর ‘ওসিআইসি’ পুরস্কারও পায় এ সিনেমা।

৭. বাক্স বদল : ১৯৬৫ সালের নিত্যানন্দ দত্ত পরিচালিত ‘বাক্স বদল’ চলচ্চিত্রটি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গীতায়োজনে প্রকাশ করেছিল ডিএম প্রডাকশন্স হাউজ। এতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও আরও অভিনয় করেছেন অপর্ণা সেন, প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য, সুব্রত সেন, এবং সাবিত্রি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। সিনেমাটি সম্পূর্ণ কমেডি ধাঁচের।

৮. কাপুরুষ : ১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কাপুরুষ’ সিনেমার মূল নাম ‘কাপুরুষ মহাপুরুষ’। দুটি পৃথক গল্পকে একত্র করে নির্মিত এ সিনেমা। প্রথম গল্পের নাম কাপুরুষ; এর মূল গল্পকার সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের জনৈক কাপুরুষের গল্প থেকে নেয়া।

৯. বেলা শেষে : ২০১৫ সালের মে মাসের ১ তারিখে কলকাতায় মুক্তি পায় এ ভারতীয় চলচ্চিত্রটি। এতে সাহিত্যপ্রেমী সৌমিত্র দুর্গা উৎসব উপলক্ষে ছেলে, ছেলের বউ, তিন মেয়ে এবং মেয়ের জামাইদের একত্র করেন। সকলের চিন্তা ভাবনা- বাবা বোধয় তার সম্পত্তির উইল পড়ে শোনাবেন তাদের; কিন্তু না। উপস্থিত সবাইকে অবাক হওয়ার মতো বার্তা শোনান সৌমিত্র। দীর্ঘ ৪৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি চান তিনি। স্ত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্তার সাথে আর একত্রে থাকবেন না। বিবাহ বিচ্ছেদ চাইছেন। তাই আদালতের দ্বারস্থ হলে তাদের ১৫ দিন একসঙ্গে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তারা আবার সেই আগের মতো শুরু করেন জীবন-যাপন।

১০. প্রাক্তন : ২০১৬ সালের ২০ মে মাসে সিনেমাটি কলকাতা ও সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে একযোগে ৯০টি সিনেমা হলে মুক্তি পায়। কলকাতার বাইরেও সিনেমাটি ভারতের অন্যান্য ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ শহর, যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি এবং কানাডার একটি শহরে মুক্তি পায়। টলি সিনেমার ইতিহাসে এটাই বিশাল মুক্তির ছবি।

এ সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আরও অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা, অপারিজাতা আঢ্য, বিশ্বনাথ বসু, মানালি দে, সাবিত্রি চট্টোপাধ্যয়, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যয় প্রমুখ।

টলি সিনেমার এ মহাপুরুষ অভিষেকের পরই যেন কেড়ে নেন লাইমলাইট। তিনি একে একে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘দেবী’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘স্বরলিপি’, ‘সমাপ্তি তিনকন্যা’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’, ‘আগুন’, ‘বেনারসি’, ‘অভিযান’, ‘শেষ প্রহর’, ‘কাচ কাটা হীরে’, ‘অশনি সংকেত’ ও ‘সাতপাকে বাঁধা’ সহ উল্লেখযোগ্য ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করে তুলেন। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে তার অনবদ্য অভিনয়ের মধ্যে রয়েছে অংশুমানের ছবি (২০০৯), হেমলক সোসাইটি (২০১২), শেষ চিঠি (২০১৭), বসু পরিবহন (২০১৮) এবং অবাক কাণ্ড (২০১৮) সিনেমাসমূহ।

দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য পঞ্চম দশকে ‘সেরা অভিনেতা’ বিভাগে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও বাঘিনী (১৯৬৮), অগ্নি সংকেত (১৯৮৮) এবং ক্রান্তিকাল (২০০৫)-এসব সিনেমায় অভিনয়ের জন্য একাধিক বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন ফেলুদা খ্যাত এ অভিনেতা।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্র অভিনেতা পরিচয়ের বাইরেও কবি ও উচ্চমানের একজন আবৃত্তিকার হিসেবে বেশ খ্যাতি রয়েছে।

২০০৪ সালে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মভূষণ পান কিংবদন্তী এ অভিনেতা। পেয়েছেন ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক একাডেমী পুরস্কার, ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার। প্রাপ্তির ঝুলিতে রয়েছে ফ্রান্সের ‘লেজিয়ঁ দ্য নর’ (২০১৮) এর মতো দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা।

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন