Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

ইরফান ও তার দেহরক্ষী জাহিদ ৩ দিনের রিমান্ডে

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০২ এএম

নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধর ও হত্যার হুমকির মামলায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০নম্বর ওয়ার্ডের বরখাস্তকৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা অতিরিক্ত মহানগর মুখ্য হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের আদালতে রিমান্ড শুনানি হয়। ধানমন্ডি থানার পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আশফাক রাজিব হাসান সকাল ১০টায় আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করেন। পরে তিনদিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধানমন্ডি থানা হেফাজতে নেয়া হয়েছে আসামিদের। গতকাল দুপুরে দুই আমামিকে আদালত থেকে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

অন্যদিকে নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলে পুরান ঢাকাকে নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব চালিয়েছেন হাজী সেলিমের ছেলে কাউন্সিলর ইরফান সেলিম। ৭০জনের বেশি সদস্যের এক শক্তিশালী গ্যাং রয়েছে ইরফানের। ওয়াকিটকি মাধ্যমে তাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান যোগাযোগ রক্ষা করতেন। নিজের চলাফেরার জন্য সব সময় পাশে রাখতেন ১২ জন দেহরক্ষী। মামলার শুনানি চলকালিন সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী শ্রী প্রাণ নাথ আদালতকে বলেন, মারামারির জন্য রিমান্ড নেয়া কি দরকার। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাজা পাবে, নই তো খালাস পাবে। রিমান্ড চাওয়ার কিছু নেই। রিমান্ডে নেওয়া হলে হয়রানি ছাড়া কিছুই নেই। রিমান্ড নেয়া হলে আসামির অবস্থা কি হবে? মারামারি জন্য রিমান্ডে যে যায় এ ধরনের কোনো নজির নেই।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরই আব্দুল্লাহ আবু ও আজাদ রহমান মামলার এজাহারের কথা তুলে ধরে রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। বিচারক উভয়পক্ষের শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। এর আগে এ মামলায় এরফান সেলিমকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ধানমন্ডি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশফাক রাজীর হাসান বলেন, মঙ্গলবার দুই আসামি ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত দুই আসামির তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে ধানমন্ডি থানা হেফাজতে তিনদিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে।

ইরফানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা ডিবিতে
ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী জাহিদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল মামলাটি হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান ধানমন্ডি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশফাক রাজীব হাসান।

গত রাতে তিনি জানান, মামলাটির তদন্তভার ইতোমধ্যে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার নথি-পত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে আদালতের অনুমতি চাওয়া হবে। আদালতের নির্দেশক্রমে ধানমন্ডি থানা হেফাজতে থাকা দুই আসামিকে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

৭০ জনের শক্তিশালী গ্যাং
নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলে পুরান ঢাকাকে নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব চালিয়েছেন ইরফান সেলিম। ৭০ জনের বেশি সদস্যের এক শক্তিশালী গ্যাং আছে ইরফানের। ওয়াকিটকি মাধ্যমে তাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান যোগাযোগ রক্ষা করতেন। নিজের চলাফেরার জন্য সব সময় পাশে রাখতেন ১২ জন দেহরক্ষী।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ দেহরক্ষীরই অবৈধ অস্ত্র আছে। ব্যবহারের চেয়ে ভয়ভীতি দেখানোর কাজে ব্যবহার করা হত। এই অস্ত্রগুলো অবৈধ পথে বিদেশ থেকে নিয়ে আসা। মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর তার দেহরক্ষী জাহিদুলের কাছ থেকে এমনই এক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে র‌্যাব। দেহরক্ষীদের সঙ্গে নিয়মিত মদ পান করেন ইরফান। ঘটনার দিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহম্মেদ খানকে যখন মারধর করা হয় তখনও তিনি মাদক সেবন করেছিলেন। মদ খেয়ে মাতাল অবস্থাতেই মারধর করেন তিনি। ঘটনার পর বাসায় ফিরে নিজের ভুল বুঝতে পারেন ইরফান। এই মারধরের পরিণাম ভাল হবে না ভেবে আবার দাদা বাড়ীর চারতালায় নিজের বারে ঢুকে সারারাত মদ পান করেন। অভিযান শুরু হলে র‌্যাবকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। নিজের মদ পানের কথাও স্বীকার করেন। অভিযান চলাকালীন সময়েই তার ডোপ টেস্ট করে র‌্যাব। সেটার রেজাল্টও পজিটিভ আসে।

র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইরফানের বাংলাটা খুব একটা ভালো না। সে ইংরেজি বলতে ও লিখতে অভ্যস্ত বলে মনে হয়েছে। আদালতের আদেশের নিজের নাম বাংলা লিখতেও অপারগতা প্রকাশ করেন। অভিযান চলাকালীন সময়় ইরফানের কন্ট্র্রোল রুম থেকে ২৪ অক্টোবরের তারিখ দেয়া পাঁচ লাইনের একটি চিরকুট উদ্ধার করে র‌্যাব। চিরকুটে লেখা আছে, ‘৭৮/ ১ মৌলভীবাজারের ভাঙ্গার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য চকবাজার মডেল থানা আমাদের আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছে। যার কারণে আমরা নিশ্চিন্তে এবং নির্বিঘেœ শামীম স্টোরের দখলে থাকা বিল্ডিং ভাঙ্গা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং উক্ত কাজে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য চক-বাজার মডেল থানার ওসি মহোদয়কে উপহার স্বরূপ।

অবশ্য এই চিরকুটের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন চকবাজার থানার ওসি মওদুত হাওলাদার। তিনি বলেন, আমার এই ধরনের কিছু মনে পড়ছে না। এটি অনেক আগের হলেও হতে পারে। আমি তাদের এ ধরনের কোনও কাজে সহযোগিতা করিনি। উপহারের তো প্রশ্নই আসে না।

গত ২৫ অক্টোবর রাতে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমদ খান বাদী হয়ে ইরফান সেলিমসহ (৩৭) চার জনের নামে এবং দুই-তিন জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে ধানমন্ডি থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইরফান ছাড়া বাকি তিন অভিযুক্ত হলেন- ইরফানের সহযোগী এবি সিদ্দিক দিপু (৪৫), ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মো. জাহিদ (৩৫) ও গাড়িচালক মো. মিজানুর রহমান (৩০)। মামলার পর ২৬ অক্টোবর রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার থানাধীন দেবিদাস ঘাট লেন হাজী সেলিমের পৈত্রিক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ইরফান ও তার দেহরক্ষী জাহিদকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। অভিযানে তাদের বাসা থেকে বিদেশি মদ ও অবৈধ ৩৮টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। পরে অবৈধ ওয়াকিটকি ও মাদক রাখার দায়ে ইরফান সেলিমকে দেড় বছরের এবং ওয়াকিটকি বহন করার দায়ে তার দেহরক্ষী জাহিদকে ছয় মাসের কারাদন্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মিজানুর রহমানকে ইতোমধ্যে এক দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। গত ২৭ অক্টোবর ইরফান সেলিমকে কাউন্সিলর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এর ২ ও ১৩ ধারার অধীনে নৈতিক স্খলন ও অসদাচরণের বিধানে কাউন্সিলর ইরফানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় এই আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন