Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১১ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

কুড়িগ্রামে খাদ্য বিভাগে বস্তা কেলেঙ্কারি, ৩৭জনকে বদলী

কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২৯ অক্টোবর, ২০২০, ৫:৫৬ পিএম

সরকারিভাবে ধান, চাল ও গম সংরক্ষণে কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য বিভাগে ছেঁড়াফাটা ও নি¤œ মানের প্রায় ৮লাখ বস্তা ক্রয়ের দুর্নীতির অভিযোগ প্রাথমিক ভাবে প্রমাণিত হওয়ায় নতুন করে ২৩জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে বদলীর আদেশ জারী করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মিজানুর রহমান। বুধবার দিবাগত রাতে এ আদেশ জারী হলেও বৃহস্পতিবার কর্মস্থলে এসে কর্মচারীরা জানতে পেরে হতাশ হয়ে পড়ে। অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীরাও এখন আতংকে দিনাতিপাত করছে কখন বদলীর আদেশ আসে। এক কথায় অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটছে সময়। নতুন বদলীকৃতদের ২নভেম্বরে পদায়নকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে
একযোগে ১৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারিকে শাস্তিমুলক বদলী করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩ জন ভারপ্রাপ্ত গুদাম কর্মকর্তা (ওসিলএসডি) ও ৬ জন পরিদর্শক রয়েছেন। রংপুর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে গত ২১ অক্টোবর থেকে বুধবার পর্যন্ত পৃথক ৬টি অফিস আদেশে এদের বদলী করা হয়। তাদেরকে ১নভেম্বর পদায়নকৃত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ফলে সবাই এখন দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বদলী হওয়া কর্মচারীরা সবাই উপজেলা এলএসডি’র নীরাপত্তা প্রহরী । তারা হলেন, রাজারহাট এলএসডি’র ইসমাইল হোসেন ও ফারুক মন্ডল, নাগেশ্বরীর এলএসডি’র গোলাম রব্বানী, তৌহিদুল হক, মাহাবুর রহমান ও নুরুজ্জামান নয়ন, ফুলবাড়ীর এলএসডি’র আবু বকর ছিদ্দিক, নুর ইসলাম ও আব্দুল গফুর, রৌমারী’র এলএসডি’র আবু জোবায়ের ও হাবিবুর রহমান, চিলমারীর এলএসডি’র মাঈদুল ইসলাম ও সোহরাব হোসেন দুদু, কুড়িগ্রাম সদর এলএসডি’র হেলিম উদ্দিন তালুকদার, মরিয়ম বেগম, মাহবুবা শবনম, জাহিদ হাসান, জিয়াউর রহমান, জেসমিন বেগম ও মোস্তাফিজার রহমান, উলিপুর এলএসডি’র নুরে আলম সরকার, ভুরুঙ্গমারী জয়মনিরহাট এলএসডি’র রমজান আলী এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী শাহ আলমকে বিভিন্ন উপজেলা এলএসডিতে বদলী করা হয়।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মিজানুর রহমান বলেন, ইতি পূর্বে খাদ্য অধিদপ্তর ঢাকা’র প্রশাসনিক বিভাগ এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক রংপুর কার্যালয়ের লিখিত নির্দেশনা এবং সর্বশেষ বুধবার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুস সালামের টেলিফোনিক নির্দেশনায় রাতেই এ বদলী আদেশ জারী করা হয়। ২বছরের বেশী সময় যারা একই কর্মস্থলে অবস্থান করছিল তাদের বদলী করা হয়েছে। এটি রুটিন ওয়ার্ক। জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। এর আগে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক রংপুর কার্যালয় থেকে একযোগে ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারিকে বদলী করা হয় বলে স্বীকার করেন। তবে ঠিক কি কারণে তাদের বদলী করা হয়েছে তা তিনি জানাতে পারেননি। বস্তা ক্রয়ের দুর্নীতির সাথে এই গণবদলীর সম্পর্ক আছে কীনা তা জানাতে রাজী হননি তিনি।
উল্লেখ্য পূর্বের বদলী হওয়া কর্মকর্তারা হচ্ছেন, কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা, ভুরুঙ্গামারী খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা প্রণব কুমার গোস্বামী, ফুলবাড়ি খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম, চিলমারী উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক মাইদুল ইসলাম মাহি, উলিপুর উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক গোলাম মোস্তফা, নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক রবিউল আলম কাজল, ফুলবাড়ী উপজেলার খাদ্য পরিদর্শক মনোয়ারুল ইসলাম, রাজারহাট উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক নুর মোহাম্মদ, কুড়িগ্রাম সদর খাদ্য পরিদর্শক (কারিগরী) মিজানুর রহমান। এছাড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী ইউসুফ আলী, কম্পিউটার অপারেটর আলমগীর হোসেন, স্প্রেম্যান নবিউল ইসলাম ও জিয়াউর রহমান, নিরাপত্তা প্রহরী আরিফ মিয়া। তাদেরকে লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে বদলী করা হয়। রংপুর আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা আব্দুস সালামের দেয়া আদেশে তাদেরকে ১ নভেম্বরের মধ্যে স্ব স্ব কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়। অন্যথায় পরদিন থেকে তাদেরকে কর্মবিমুক্ত বলে গণ্য করা হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বোরো মৌসুমে কুড়িগ্রামের জন্য প্রায় আট লাখ নতুন বস্তা ক্রয়ের জন্যএকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে খাদ্য বিভাগের চুক্তি হয়। ওই প্রতিষ্ঠান বস্তা সরবরাহের সময় চুক্তি ভঙ্গ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে আট লাখ পুরনো নিম্নমানের ও ছেঁড়া-ফাটা বস্তা কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ি ও ভুরুঙ্গামারী খাদ্যগুদামে সরবরাহ করে। ওই সময় রংপুর ও নীলফামারীতে বস্তার সংকট দেখা দিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কুড়িগ্রাম সদর খাদ্য গুদাম থেকে সদ্য ক্রয়কৃত ২ লাখ বস্তা সেখানে পাঠানো হয়। ওই বস্তা রংপুর ও নীলফামারীতে পাঠানোর পর পুরাতন বস্তা রিসিভ না করে সংশ্লিষ্ট এলএসডি’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নি¤œমানের ছেড়া-ফাঁটা বস্তা উল্লেখ করে লিখিত চিঠি দিয়ে ফেরত পাঠায়। ফলে দুর্নীতির ঘটনা ফাঁস হয়। এ সুত্রধরে বিভিন্ন মিডিয়ায় ২৫ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম খাদ্য বিভাগের দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়। শুরু হয় খাদ্য বিভাগে তোলপাড়। স্থানীয় ভাবে গঠন করা হয় ২টি তদন্ত কমিটি। এ কমিটি দুর্নীতির সত্যতা নিশ্চিত করে রিপোর্ট দাখিল করে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে গত ৫-৮অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো: মজিবর রহমানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি সরেজমিন তদন্ত করেন। এর পর বস্তা ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে গণবদলীর আদেশ জারি করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন বস্তার টেন্ডারে দর ছিল (৩০ কেজির বস্তা) ৬০ টাকা এবং (৫০ কেজির বস্তা) ৮০টাকা। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাইরে থেকে ১৫-১৬ সালে ব্যবহৃত পুরাতন বস্তা ১০-১২ টাকা দরে কিনে নেয়। আর এসব বস্তা উল্টে স্টেনসিল ব্যবহার ও ক্যালেন্ডার করে নতুন বস্তা হিসেবে সরবারহ করে। বস্তার গায়ে নতুন করে লেখা হয় ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’। সংশ্লিষ্ট গুদাম কর্মকর্তারা ওই সব পুরাতন ছেঁড়াফাটা বস্তা গ্রহণের সময় নতুন হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বস্তা প্রতি ১৬- ২০ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন। এতে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মোট ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য করে বলে অভিযোগ ওঠে।
এদিকে এই গণবদলীর খবর ফাঁস হবার পর খাদ্যবিভাগে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতংক সৃষ্টি হয়েছে। দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বস্তা ক্রয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার পরেও অনেকের বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্থা না নেয়া হলেও ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা না থাকলেও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারি এমনকি রিপত্তা প্রহরীদের গণহারে বদলী করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি জেলা খাদ্য বিভাগ গঠিত দুটি তদন্ত কমিটি প্রাথমিক তদন্তের দুর্নীতি হয়েছে মর্মে প্রতিবেদন দিলেও রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত কমিটির দুই পরিদর্শককেও বদলী করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কারো কারো ঘাড়ে ঘটনা ফাঁস হওয়ার দায় চাপানো হয়েছে বলে খাদ্য বিভাগের একটি সুত্র জানায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘারে চাপানো হচ্ছে।’ কারণ এ দূর্নীতির সাথে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাজের সম্পর্ক। এর বাইরে অন্যদের কোন সম্পৃক্ততার সুযোগ নেই। কিন্তু বদলী করা হচ্ছে গণহারে। বাদ যায়নি ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীরাও। এতে করে ভুল বার্তা যাচ্ছে সবার কাছে। চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে সবার মাঝে।
#

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুর্নীতি


আরও
আরও পড়ুন