Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১২ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

উবায়দুর রহমান খান নদভী | প্রকাশের সময় : ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০২ এএম

নবুওয়ত কোনো শিক্ষা, যোগ্যতা কিংবা অর্জনযোগ্য পদবীর নাম নয়। মেধা বা প্রতিভার জোরে নবী হওয়া যায় না। চর্চা, অধ্যবসায়, অনুশীলন ও সাধনা দ্বারা দুনিয়ার সব কিছু অর্জন সম্ভব হলেও এসব দিয়ে নবুওয়ত বা রিসালত লাভ করা যায় না। নবুওয়ত সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ পাকের মনোনয়ন। আল্লাহর পয়গাম মানবজাতির কাছে বহন করে আনা এবং তা প্রচার করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ পাক নবী-রাসূল মনোনীত করে থাকেন। ‘আল্লাহ ফেরেশতা এবং মানবকূল থেকে রাসূল মনোনীত করেছেন।’ এ আয়াতে যে সত্যটি ফুটে ওঠে সেটিই পূর্ণরূপে বিকশিত হয় আল্লাহপাকের এ উক্তিতে, ‘প্রত্যাদেশকৃত ওহী ভিন্ন তিনি (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মন থেকে কোনো কথা বলেন না।’

আল্লাহপাকের মনোনয়ন ও ওহীর মাধ্যমে পরিচালনার বৈশিষ্ট্যে নবী-রাসূলগণের সত্ত্বা বা ব্যক্তিত্ব অতুলনীয়। বিশ্বের সকল মনীষী, কৃতিপুরুষ, বিজয়ী বীর, রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ধর্মপ্রবর্তক ও সংস্কারকের জীবনে তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনা ও সুনিপণ কর্মকৌশলের ভূমিকা অনুপাতেই তাঁর সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু নবী-রাসূলগণের জীবন ও আদর্শের আলোচনায় এ বিষয়টি মুখ্য হয়ে আসে না। এখানে আসে প্রতিটি কর্মসাধনা, ঘটনা ও পরিবর্তনের পেছনে খোদায়ী প্রত্যাদেশের বর্ণনা আর প্রত্যাদিষ্ট কর্মপদ্ধতির আলোকে পরিচালিত নবুওতি আন্দোলন তথা তৎপরতার সার্থক রূপরেখার বিবরণ।

আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মের পূর্ব থেকেই তাঁর আবির্ভাব ও জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ধর্মগ্রন্থ ও ধর্ম প্রচারক কর্তৃক বিবৃত হয়েছে ভবিষ্যৎ বার্তা। পূর্ববর্তী নবীগণও সংবাদ প্রদান করেছেন শেষ নবীর আগমনের। অতএব, আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব ছিল পূর্ণরূপে পরিকল্পিত ও খোদায়ী ব্যবস্থাপনায় বিভূষিত। পরিবেশ, পরিস্থিতি, সময় ও সমাজ একজন সাধারণ অথচ অনন্য প্রতিভাধর ব্যক্তিকে এখানে নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি, যা অন্যান্য কৃতিপুরুষ বা মনীষীদের বেলায় ঘটে থাকে।

মাতৃ উদর থেকেই পিতৃহীন অবস্থায় পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়া, বালক বয়সে বিদেশ-বিভুঁয়ে বিজন মরুপ্রান্তরে মাতৃহারা হওয়া, দাসীর কোলে চড়ে পিতামহের গৃহে পৌঁছা, অল্পকালের ব্যবধানে পিতামহের মৃত্যু ঘটায় দরিদ্র পিতৃব্যের সংসারে অনাথ অবস্থায় নীত হওয়া ইত্যাদি পথ পরিক্রমায় শিশু-কিশোর ও তরুণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যে মনো-দৈহিক বিকাশ সাধিত হয় তা নিঃসন্দেহে তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের কর্ম সাধনা ও তৎপরতার জন্য অতি উপযোগী সূচনাপর্ব। একটি অনন্য আদর্শ জীবন সংগ্রাম ও সর্বপ্লাবী একটি যুগ বিপ্লবের সুদৃঢ় ভিত্তিমূল। মহান প্রভূর প্রত্যক্ষ পরিচালনায় প্রাকৃতিক নিয়মেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পার্থিব দিবস-রজনী, চল্লিশটি বর্ষ পরিক্রমণ করে একটি পরিণত মানবের রূপদান করে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবুওয়তের দায়িত্ব লাভের সময় দুয়ারে উপনীত করে।

বুদ্ধি-বিবেচনা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও মেধা মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর প্রেরিত-পুরুষ নবী-রাসূলগণও উত্তম গুণাবলীর অধিকারী মানুষ। তাঁদের ব্যক্তিগত জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও চেতনা সকল মানুষের চেয়ে বেশি বিশুদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ। তদুপরি তাঁরা খোদায়ী নির্দেশনায় ধন্য। ব্যক্তি বা মানুষ হিসেবে নবী-রাসূলগণের প্রাক নবুওয়ত জীবনও অনুপম বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল। আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যৌবনে নিজ জাতি ও সমাজের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তিনি নিজ নৈতিক আধ্যাত্মিক ও মানবিক গুণাবলীর দ্বারা সমাজকে আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করেছেন। কাবাগাত্রে কৃষ্ণ কালো পাথার স্থাপন আস্থা এবং তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ সমাধানের প্রতি গোটা আরব সম্প্রদায়ের সানন্দ সমর্থন ও অংশগ্রহণ থেকে আমরা মানুষ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মকৌশলের অনুপম নৈপুণ্যের প্রমাণ পেতে শুরু করি।

নবুতয়ত প্রাপ্তির আগে গোত্রীয় দাঙ্গা-হাঙ্গামায় বিশেষত ফিজার যুদ্ধোত্তরকালে তরুণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমাজসেবা ও সাংগঠনিক সমাজকল্যাণ কর্মসূচী থেকেও আমরা তাঁর গণমুখিতার নীতির প্রমাণ পাই। যুদ্ধবিধ্বস্ত গোত্র, পর্যুদস্ত জনগোষ্ঠী ও অনাথ পিতৃহীনদের পুনর্বাসন, সংস্কার ইত্যাদি তো তিনিই সর্বপ্রথম আরবদেরকে শিখিয়েছেন। ‘হলফুল ফুজুল’ বা ফজলগণের অঙ্গীকার তাঁর সামাজিক কর্মসাধনারই দৃষ্টান্ত। এসব কি বিশ্বাস, আস্থা, ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তার লাইম লাইটে উঠে আসা একজন উদীয়মান জননেতা ও যুব ব্যক্তিত্বের সুচিন্তিত কর্মকৌশলের প্রমাণবহন নয়?

হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতৃব্য আবু তালিবের ঘরে দিনযাপন করলেও ব্যক্তিগত কর্ম ও দায়িত্ব থেকে তিনি কখনও পিছিয়ে থাকেননি। চাচার ঘরোয়া কাজে অংশগ্রহণ এবং তার পেশাগত দায়িত্বে সহযোগিতা ইত্যাদি হযরতের মানবিক নৈতিকতারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ। চাচার সহযোগী হয়ে অখন্ড শামের উদ্দেশ্যে বাণিজ্য যাত্রাও তরুণ মুহাম্মদের সমাজ ও জীবন ঘনিষ্ঠতারই বহিঃপ্রকাশ। এরপর যখন চাচার সংসারের জানালা দিয়ে তিনি চোখ রাখলেন বাইরের বিশাল ভুবনে, দেখলেন জীবন সংসারের আরো বিস্তৃর্ণ ময়দান। বিত্তবান ব্যবসায়ী খাদীজা বিনতে খোয়াইলিদের বাণিজ্য কাফেলার ব্যবস্থাপক নিযুক্ত হয়ে গেলেন বাণিজ্যে- শাম দেশে। সুন্দর ব্যবস্থাপনা, সুদক্ষ পরিচালনা আর বিপুল বিশ্বস্ততায় প্রচুর লাভ হলো বাণিজ্যে। বাণিজ্যকর্মীদের রিপোর্ট শুনে হযরত খাদীজা যুবক মুহাম্মদের সাথে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন তাঁর অভিভাবক চাচা আবু তালিবের কাছে। বিয়ে হলো। হযরত এবার চাচার বাড়ি থেকে বিবি খাদীজার ঘরে স্থানান্তরিত হলেন, সাথে নিয়ে এলেন আদরের ছোট ভাই আলীকে। এবার তিনি হযরত খাদীজার ব্যবসায় নির্বাহী অংশীদার। হযরত খাদীজা হলেন যুবক মুহাম্মদের নবুওয়ত পূর্বকালীন কর্মতৎপরতার একনিষ্ঠ সহায়ক। এভাবে কাটলো দেড় দশক। খাদীজার দেয়া ক্রীতদাস যায়েদ ইবনে হারিসা এখন নবীজির পুত্র বলে পরিচয় লাভ করেন। মা খাদীজা, হযরত আলী আর যায়েদ ইবনে হারিসা ঘরের ভেতর সর্বাগ্রে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ঈমান এনে নতুন দীনের প্রথম মহিলা, কিশোর ও ক্রীতদাস সদস্যরূপে ইতিহাসে আসন লাভ করেন। আর বাইরের পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ঈমান আনয়নকারী ব্যক্তি, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বাপেক্ষা বিশ্বাসী বন্ধু হযরত আবু বকর রাযি.। স্বাবলম্বী হওয়া, ঘর বাঁধা, জীবিকার উপায় অবলম্বন আর সামাজিক প্রতিষ্ঠার ভিত গড়ার এ ধারাক্রম কি সুন্দর পরিকল্পনা আর উত্তম কর্মকৌশলের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না?

রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়ত প্রাপ্তির পর সর্বপ্রথম আদিষ্ট হলেন, ‘আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।’ ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য তিনি তাই নিজ গৃহে খানার দাওয়াত দিয়ে জমায়েত করলেন কুরাইশী হাশেমী নেতৃবর্গকে। কথা পাড়লেন অতি বিনয় অথচ আত্মবিশ্বাসী বলিষ্ঠতার সাথে। কাজ হলো না বটে তবে কম্পন সৃষ্টি হলো। আবু কুবায়স পর্বতে চড়ে পরবর্তী ঘোষণা দিলেন। ইসলামে প্রকাশ্য আহবান প্রচারের এ সূচনা লগ্নেও ব্যবহার করলেন ভাষা-বক্তৃতার এক নিটোল কৌশল। ‘আমি যদি বলি এ পর্বতের পেছন থেকে এক শত্রুদল ধেয়ে আসছে তোমাদের তছনছ করে দিতে, তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে না?’ আরো বললেন, ‘এক জীবন কাটিয়েছি আমি আপনাদের হয়ে, আমাকে তো আপনারা সত্যবাদী ও বিশ্বাসী রূপেই দেখেছেন।’ এভানে মনো-চৈতনিক ক্ষেত্র তৈরি করে তবে দিয়েছেন নতুন বার্তাটি। এ সবই ছিল নবীজির কাজের সৌন্দর্য, প্রাণপূর্ণ কর্মকৌশল।

ইসলাম প্রচারে বাধাবিঘ্ন যখন চরমে। আরকাম ইবনে আরকাম রাযি. এর ঘরে গোপনে তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিশন চলছে। রাতের আঁধারে নতুন মুসলমানেরা সমবেত হয় এই ঘরে। আবার ফর্সা হওয়ার আগেই ফিরে যেতে হয় নিজ নিজ ঠিকানায়। হুযুর দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, খাত্তাবের পুত্র উমর অথবা আবুল হিকাম উমর, এদের একজনকে আমার সাথে কাজে লাগিয়ে দিন।’ প্রভাবশালী ব্যক্তির উত্থান ছাড়া শান্ত, নিরীহ ও সরল মানুষের এ ছোট্ট কাফেলাটি অবরোধ ভাঙতে পারছে না, আঁচ করতে পেরেই হুযুর এ দোয়া করেছিলেন এবং খাত্তাবপুত্র ইসলাম গ্রহণ করে আরকামের ঘরের গোপন নামাযকে নিয়ে কায়েম করে দিয়েছিলেন কাবা প্রাঙ্গনে।

হিজরতের প্রাক্কালে নিজের বিছানায় হযরত আলী রাযি. কে শুইয়ে রেখে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, যেন কেউ এ কথা বলতে না পারে যে মুহাম্মদ আমাদের গচ্ছিত আমানত, টাকা-পয়সা, গয়না-গাটি সাথে নিয়ে বিদেশ চলে গেছে। আর মদীনায় যাওয়ার প্রকৃত পথটি মক্কা থেকে উত্তর দিকে চলে গেলেও হুযুরের হিজরতের রাস্তাটি ঐতিহাসিকেরা স্থির করেছেন দক্ষিণমুখী রূপে। মজার বিষয় হলো, সওর গিরি গুহায় ঘুরপথে গিয়ে আশ্রয় নেয়ার লক্ষ্যে হুযুর বেছে নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাস্তা। মনে হয় যেন, তিনি ইয়ামন বা হাদ্রামাউত যাবেন বলে মক্কা ছাড়ছেন। কর্মকৌশলতো এসব ঘটনায়ও আমরা দেখতে পাই।

মদীনার পথে এক লোক হযরত আবু বকর রাযি. কে বলে, ‘আপনার সাথের লোকটাকে তো চিনলাম না।’ সিদ্দীকে আকবার খুবই সাবধানতার সাথে সতর্ক জবাব দিলেন, ‘ইনি? ইনি আমার রাহবর। পথ দেখানো তাঁর কাজ।’ শংকা কেটে গেলে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু হেসে হযরত আবু বকরের রাযি. এ রহস্যময় উত্তরে হর্ষ প্রকাশ করলেন। লোকটি বুঝতে পেরেছে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোধহয় হযরত আবু বকর রাযি. এর মরু ভ্রমণের পেশাদার পথপদর্শক। আর হযরত আবু বকর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে নিরাপদে মদীনা পৌঁছানোর শত ব্যাবকুলতায়ও কত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রিয়নবীর মূল পরিচয়। ইনি তো সত্যিই রাহবর। সত্য পথের দিশারী। বাচনিক কৌশলের এ ঘটনার প্রতি ব্যক্ত সমর্থন থেকেও আমরা নবীজির আদর্শের প্রাণময়তার সন্ধান পাই।

মদীনায় হিজরতের বহু পূর্বেই মুসআব ইবনে উমায়র রাযি. কে ইসলামী আদর্শ প্রচারের লক্ষ্যে প্রেরণ করা হয়। এবং হজ মওসুমে মদীনা থেকে আগত ব্যক্তিবর্গের সাথে চুক্তির মাধ্যমে যখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্ণ পরিচিতি ও তাঁর আনুগত্যের প্রস্তুতিপর্ব সমাপ্ত হয় তখনই আল্লাহ পাকের নির্দেশে তিনি মুসলিম জনগোষ্ঠীসহ সে নগরীতে হিজরত করেন। হিজরতের পর বিভিন্ন গোত্র ও বংশের পাড়ায় আবাস গ্রহণের জোরদার আবেদন, একটি সমস্যা রূপে দেখা দিলে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংকট নিরসনে উটের গতি বা ইচ্ছার সাহায্য নেন। তিনি বলেন, ‘এর পথ ছেড়ে দাও। লোকজন আসবে, বৈঠক হবে, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে উপরের কোঠায় থাক।’ মসজিদে নববী নির্মাণের জন্য যে জায়গাটি ক্রয় করা হয় এটি সাহল ও সোহায়ল ভ্রাতৃদ্বয় বিনা পয়সায় দিতে চাইলেও হুযুর তা গ্রহণ করেননি। পিতৃহীনদের দান দিয়ে ইসলামের প্রথম কেন্দ্রীয় মসজিদ নয়। এটা টাকা দিয়েই কিনতে হবে। সাহল ও সোহায়ল বিনিময় গ্রহণ করলো।

গোত্রীয় অসন্তোষ নিরসনে উটের ইচ্ছার উপর জোর দেয়া, বসবাসের জন্য আবু আইয়ুব আনসারী রাযি. এর গৃহের বহির্মুখী ও নিচের অংশ নির্ধারণ এবং মসজিদে নববী নির্মাণে অনাথদের জমি নগদমূল্যে ক্রয় ইত্যাদি কর্মকৌশল নিঃসন্দেহে নিপুণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।

হিজরত-উত্তর কালে মদীনায় ইসলামী সমাজ কায়েমের সূচনাপর্ব ছিল মুহাজিরদের পুনর্বাসন। মদীনাবাসী আনসারীদের একজনকে একজন মুহাজিরের দায়িত্বভার দেয়ার সুন্দর ও সহজ নিয়মে যে চিরন্তন ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধন রচিত হয় তার প্রভাব গোটা ইসলামী যুগেই তার সুফল প্রসব অব্যাহত রাখে। এতে করে মদীনা শরীফে কোনো শরণার্থী শিবির বা সমাজবিচ্যুত অভিবাসন গড়ে ওঠেনি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অদ্বিতীয় এক ঘটনা। মদীনার প্রাচীন গোত্রগুলো, নানা ধর্মাবলম্বী নাগরিক, বিভিন্ন পেশাজীবী অধিবাসী নিয়ে হুযুর একটি ঐতিহাসিক ‘সমঝোতা স্মারক’ রচনা করেন, যা ‘মদীনা সনদ’ নামে আখ্যা পায়। এই সামাজিক সংবিধান ছিল দল, গোত্র, ধর্ম, স্বার্থ, পেশা ও নীতি-আদর্শ নির্বিশেষে সকল মদীনাবাসীর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দলিল। এই কাজটিকেও আমরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম কর্মকৌশলের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন রূপে উল্লেখ করতে পারি।

মদীনার নগরকর্তা হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর সাথে ইহুদী, অগ্নিপূজক ও মুশরিকদেরও সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থেকে ইসলামের সর্বজনীন আদর্শ এবং বিশ্বশান্তির ধারণা পাওয়ার সহজ হয়ে ওঠে। প্রতিরক্ষা, সামাজিক সুবিচার, পেশাগত স্বাধীনতা, নৈতিক স্বকীয়তা, ধর্মীয় স্বাধিকার ও নাগরিক আনুগত্য বা শৃংখলার মূলমন্ত্র নিয়ে রচিত হয় এই বহুজাতিক, বহু মাত্রিক দলিল। এর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল ইসলামের ধর্মীয় জিহাদে অমুসলিম নাগরিকদের সামাজিক অংশগ্রহণ। অমুসলিম মুনাফিকদের দলে নিয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের প্রকাশ্যে সমালোচনা, বহিষ্কার কিংবা বিচার করেননি। কেননা, ঐক্য, সংহতি ও সামাজিক শৃংখলা একজন শাসকের ভাবমর্যাদাকে শত্রুশক্তির সামনে উজ্জ্বল ও প্রভাবশালী রূপে তুলে ধরে থাকে। অন্তর্দ্ব›দ্ব ও আত্মঘাতী তৎপরতার সংবাদ শত্রুদের সাহস বৃদ্ধি করে।

মক্কার মুশরিকরা মদীনায় আক্রমণ পরিচালনা করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নব অংকুরিত সুখী সমাজের ভিত তছনছ করে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অর্থ রসদ ও অস্ত্রের যোগান দেয়ার জন্য তারা যৌথ বাণিজ্যের কাফেলাসহ আবু সফিয়ানকে অখন্ড শামে পাঠায়। ফেরার পথে আবু সুফিয়ানের কাফেলার উপর আক্রমণ চালনার মাধ্যমে শত্রুর সমর শক্তি বিনাশ এবং নিজেদের ফেলে আসা সম্পদ ও অধিকার আদায়ের যৌক্তিকতা নিয়ে মদীনার প্রতিরক্ষা বাহিনী ঘুরে বেড়ায় মক্কা-সিরিয়া মহসড়কে। গোপনে খবর পেয়ে আবু সুফিয়ান সমুদ্র তীর বেয়ে মক্কায় পৌঁছে যায়। কিন্তু আক্রমণের নেশা তাকে আবার টেনে আনে নিরীহ মদীনার পানে। বদর প্রান্তরে যুদ্ধ বাঁধে। এরপর আবার সংঘটিত হয় ওহুদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত। হুযুর রণক্ষেত্রে সৈন্যবণ্টন, কাতারবন্দী, নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা, ঘাঁটি প্রহরা ইত্যাদি তদারক করেন পরম নৈপুণ্য ও দক্ষতার সাথে। সকল বিরোধী শক্তির সমবেত অভিযান, আহযাবের যুদ্ধে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মর্যাদাবান অনুচর ইরানের জ্ঞানবৃদ্ধ সালমান ফারসী রাযি. এর পরামর্শে প্রয়োগ করেন আরব বিশ্বের অভিনব সমর পদ্ধতি। পরিখা খননের মাধ্যমে অরক্ষিত সীমান্তে ব্যারিকেড নির্মাণের প্রয়াস, যা আরবীয় যোদ্ধাদের জন্য ছিল বিস্ময়কর। এ ছাড়া প্রতিটি কাজে, সাধনায়, সংগ্রামে সাধারণ সৈনিকদের সাথে, সরল নাগরিকদের সাথে মহানবীর উদার অংশগ্রহণ, কাজের স্পৃহা, গতি ও উৎকর্ষকে করে তুলতো বহগুণ তেজী ও উজ্জ্বল। খন্দক বা পরিখা খননের সময় সাহাবীরা ক্ষুধা তৃষ্ণার অবস্থা হুযুরকে অবহিত করলে তিনি নিজের পেটের কাপড় উঠিয়ে প্রদর্শন করেন। ক্ষুধাকাতর দেহকে সোজা রাখার প্রয়োজনে বাঁধা দু’খানা পাথর। ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ‘পরিখা খননে কোদাল চালনায় ছিটকে পড়া পাথর খন্ডের উপর থেকে বিচ্ছুরিত অগ্নিস্ফুলিংগে আমি পারস্য সম্রাটের রাজকীয় প্রাসাদ দেখতে পাই।’ এ সবই তোমাদের করতলগত হচ্ছে অচিরেই। (চলবে)



 

Show all comments
  • তাসফিয়া আসিফা ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ২:৩৫ এএম says : 0
    মানবজাতির আদর্শ হজরত মুহাম্মদ (সা.)। দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পরকালে মুক্তির জন্য তিনি জীবন ভর মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করেছেন। হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে শ্রেণিবৈষম্যকে অতিক্রম করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব জাগ্রত করেছেন। আকাবার শপথ, মদিনা সনদ ও হুদায়বিয়ার সন্ধি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
    Total Reply(0) Reply
  • তোফাজ্জল হোসেন ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ২:৩৫ এএম says : 0
    সিরাত বা মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী পাঠ করলে মানবতার কল্যাণে তার মহৎকর্ম ও কৃতিত্ব বোঝা যায়।
    Total Reply(0) Reply
  • গাজী ওসমান ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ২:৩৬ এএম says : 0
    আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা পেতে হলে তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন। (সূরা আলে ইমরান-৩১)।
    Total Reply(0) Reply
  • কে এম শাকীর ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ২:৩৬ এএম says : 0
    আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা পেতে হলে তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন। (সূরা আলে ইমরান-৩১)।
    Total Reply(0) Reply
  • হৃদয়ের ভালোবাসা ৩০ অক্টোবর, ২০২০, ২:৩৬ এএম says : 0
    মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে ভালোবাসা মুমিন হওয়ার অন্যতম শর্ত। তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছাড়া কেউ মুমিন হতে পারে না।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ