Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে ভর করে ভারত কি তার অবস্থান ফিরে পাবে?

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১ নভেম্বর, ২০২০, ১২:০২ এএম

করোনা মহামারির মধ্যে উপমহাদেশে চীনের ব্যাপক প্রভাব বিস্তারে যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে, তা এখন স্পষ্ট। এটা আরও পরিস্কার হয়েছে, গত মাসের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগানের ভারত ও বাংলাদেশ সফরের পরপরই গত ২৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারের দুই দিনের ভারত সফরের মধ্য দিয়ে। বলা যায়, উপমহাদেশে চীনের প্রভাব ঠেকানোর জন্য ভারতকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উঠেপড়ে লেগেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই মন্ত্রীর সফর শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়াও সফর করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপমহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের এমন হাইপ্রোফাইল সফর দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের কারণে উপমহাদেশে তার প্রভাব হারাতে বসেছে তা করোনাকালের গত কয়েক মাসে বোঝা গেছে। তবে প্রভাব হারানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যতটা না উদ্বিগ্ন তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ভারত। দীর্ঘ সময় ধরে উপমহাদেশে ভারতের এক ধরনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য চলে আসছিল। করোনা এসে তার এই আধিপত্যে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এ সুযোগটাই গ্রহণ করেছে চীন। সে উপমহাদেশের দেশগুলোর ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যে দেশের যা প্রয়োজন তাই নিয়ে এগিয়ে এসেছে। অন্যদিকে ভারত নিজেই করোনায় বিধ্বস্ত হয়ে নাজেহাল হয়ে পড়ে। তার অর্থনৈতিক অবস্থা ইতিহাসের সবচেয়ে নিচে চলে গেছে। প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াবে কি নিজেই দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে চীনের এগিয়ে আসা তার কাছে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত নিয়ে চীনের সাথে বিবাদ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ তাকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। এমতাবস্থায় উপমহাদেশে যে তার প্রভাব অনেকটাই খর্ব হয়ে গিয়েছে, তা সে ভালভাবেই আঁচ করতে পারছে। ফলে তাকে একদিকে নিজের ঘরের দুর্দশা যেমন সামলাতে হচ্ছে, তেমনি উপমহাদেশে তার প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টাও করতে হচ্ছে।

দুই.
হাজার হাজার মাইল দূর থেকে উপমহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের একার পক্ষে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। তবে বিশ্বরাজনীতিতে নিজের প্রভাব ধরে রাখা এবং চীনের প্রভাব ঠেকানোর জন্যই তাকে উপমহাদেশের রাজনীতিতে যুক্ত হতে হচ্ছে। কারণ, পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতিতে চীন অনেকটাই নিয়ন্ত্রকের আসনে বসেছে। তার এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। ফলে যেখানেই চীনের প্রভাব সৃষ্টি হবে, সেখানে তাকে থাকতে হবে এবং চীনকে ঠেকিয়ে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে হবে। চীন যেহেতু সর্বাগ্রে এই উপমহাদেশে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে নজর দিয়েছে এবং প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য ক্ষয়িষ্ণু ভারতকে চাঙ্গা করা ছাড়া তার বিকল্প নেই। এ কথার প্রতিফলন ঘটেছে পম্পেওর এক বক্তব্যে। তিনি ভারতকে চাঙ্গা করতে বলেছেন, নেতৃত্বদানকারী বিশ্বশক্তি হিসেবে ভারতের উত্থানকে সম্মান জানায় আমেরিকা। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল অনুযায়ী, আমেরিকা ভারতের বিশ্বশক্তি হিসেবে উত্থানকে স্বাগত জানায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আগামী বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও বাড়াবে। ভারত সফরকালে পম্পেও বলেছেন, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার জন্য চীন যে হুমকি সৃষ্টি করেছে, তা মোকাবেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে একসাথে কাজ করতে হবে। আঞ্চলিক শান্তি ও সুস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তার এসব বক্তব্য ভারতের জন্য উদ্দীপনাদায়ক হলেও প্রকারন্তরে তা যে উপমহাদেশে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকানোর কৌশল, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আঞ্চলিক রাজনীতিতে দুর্বল হয়ে পড়া ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র এখন দাবার ঘুটিতে পরিণত করতে চাচ্ছে। বিষয়টি অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কৌশলের মতো। ভারতের সাথে যেহেতু চীনের এখন সাপে নেউলে সম্পর্ক বিরাজমান, এ সুযোগে ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে যুক্তারাষ্ট্র উপমহাদেশে একদিকে তার আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে তার প্রবল প্রতিপক্ষ চীনকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে। এটাকে যদি যুক্তরাষ্ট্রের চিরায়ত ‘বন্ধুত্বের ফাঁদ’ বলা হয়, তবে ভারত সেই ফাঁদেই পড়তে যাচ্ছে কিংবা পড়েছে। ভারতও অনেকটা মরিয়া হয়ে নিজের প্রভাব ফিরে পাওয়ার জন্য এই ফাঁদের দিকে পা বাড়িয়েছে। অবশ্য, এছাড়া তার ঘুরে দাঁড়াবার নিজস্ব শক্তি এই মুহূর্তে নেই। ফলে সে যেকোনো উপায়ে আঞ্চলিক প্রভাব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভারতকে শক্তি ও সাহস দিচ্ছে এবং বিশ্বশক্তির উত্থান হিসেবে আখ্যায়িত করছে, তা যে তার এক ধরনের কৌশল, এটা পরিস্কার। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চায় না সে ছাড়া আর কোনো বিশ্বশক্তির উত্থান ঘটুক। সে চায় তার একচ্ছত্র আধিপত্য। যদি ভারতকে সে নতুন বিশ্বশক্তি হিসেবে দেখতে চাইত, তবে চীনকে ঠেকানোর জন্য এমন উঠেপড়ে লাগত না। কারণ, ভারতের চেয়েও চীনের সাথে তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় অনেক। চীনের সাথে রয়েছে তার বিশাল বাণিজ্য। বরং ভারতকে দিয়ে সে পরোক্ষভাবে চীনকে দমাতে চাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দীপনামূলক কথায় ভারত হয়তো খুশি হচ্ছে কিংবা এটাও আশা করছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সাথে যুক্ত হওয়ার তার যে দীর্ঘদিনের খায়েশ, তা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় পেয়ে যাবে। তবে তার এ আশা যুক্তরাষ্ট্র পূরণ করবে, তা কারো পক্ষেই বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। এই উপমহাদেশে চীনের প্রভাব দমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র শুধু ভারতকেই সাথে নেয়নি, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকেও নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এই চার শক্তি মিলে এখন চীনকে ঠেকানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন (বেকা)-এর যে চুক্তি হয়েছে, তাতে প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূস্থানিক গোয়েন্দা তথ্যের সব ধরনের সাহায্য ভারত পাবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, ভারত, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যকার বৈরি সম্পর্কের সূত্র ধরে বিরাজমান যুদ্ধভাবাপন্ন পরিবেশকে কেন্দ্র করে ভারত কিংবা উপমহাদেশের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র তার অস্ত্র বাণিজ্যের একটি বাজার তৈরি করতে চাচ্ছে। দেশটি ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার নীতি অবলম্বন করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় উপস্থিতি সে অঞ্চলে শান্তি সৃষ্টি হয়, এমন নজির খুব কমই রয়েছে। বরং অশান্তি ও যুদ্ধ বাঁধিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে।

তিন.
ভারত সফরে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য নিয়ে চীন কূটনৈতিক বাতাবরণে বক্তব্য দিয়েছে। দেশটি বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায়র অন্য দেশের সঙ্গে চীনের বিভেদ সৃষ্টি করলে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার এ বক্তব্যে বেশ শক্ত একটি বার্তা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সে বুঝিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সে ছেড়ে কথা বলবে না। তার চেয়েও বড় কথা, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যে নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করা হচ্ছে, তাতে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে চীনের প্রভাব বলয়ে থাকা দেশগুলোর কি কোনো প্রতিক্রিয়া আছে? নেই। তারা এ ব্যাপারে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। বরং নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করে চলেছে। এটাই স্বাভাবিক। পরাশক্তির দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্বে তারা কখনোই জড়াতে চায় না। অথচ তাদের পক্ষে নেয়ার জন্য দেশগুলো টানাটানির মধ্যে আছে। যেমন সাম্প্রতিক বছর গুলোতে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও নিবিড় সামরিক সম্পর্ক গড়তে বাংলাদেশকেও ‘জিসোমিয়া’ এবং ‘অ্যাকুইজিশন ও ক্রস সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট (আকসা) সহ ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে যোগ দেয়ার আহবান ও প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ এসব বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কেবল কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, উপমহাদেশে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি এবং চীনের কৌশল ঠেকানোর নামে তাদের আধিপত্য বিস্তারকে কি অন্য দেশগুলো সাদরে গ্রহণ করবে? স্বাভাবিক উত্তর হচ্ছে, করবে না। তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি অবলম্বন করেই চলবে। কারণ, তারা উপমহাদেশে ভারতের আগ্রাসী আচরণ সম্পর্কে যেমন জানে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের আরও আগ্রাসী মনোভাব সম্পর্কেও ভাল করে জানে। এক্ষেত্রে চীনই হচ্ছে, তাদের কাছে যৌক্তিক সহায়ক শক্তি। দেশটি যেভাবে বন্ধুত্বের মনোভাব ধারণ করে দেশগুলোর পাশে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে তাকে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। অন্যদিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে এভাবে দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তা কেবলই দুই দেশের সামরিক বিষয়ক এবং অস্ত্র বেচা-কেনা সংক্রান্ত চুক্তি। এতে উপমহাদেশের দেশগুলোর কোনো লাভ নেই। বলা বাহুল্য, বর্তমান বিশ্বই চলছে অর্থনৈতিক রাজনীতির ওপর। এক দেশ আরেক দেশের সাথে সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। চীন এই রাজনীতি দিয়েই উপমহাদেশে তার প্রভাব বলয় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে, যেখানে অস্ত্রনীতি বা অস্ত্র বাণিজ্যের ঝনঝনানির রাজনীতি নেই। ভারত যে চীনের কাছে তার আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে ভর করেছে, তা দিয়ে কি সে উপমহাদেশে তার আধিপত্য বৃদ্ধি বা ধরে রাখতে পারবে? পারবে না। কারণ, ইতোমধ্যে তার একতরফা স্বার্থ হাসিলের নীতির কারণে বেশিরভাগ দেশ চীনের পারস্পরিক সমতাভিত্তিক স্বার্থ নীতিতে আকৃষ্ট হয়ে তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এখন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বলে বলীয়ান হয়ে যতই আধিপত্য বিস্তার করতে চাক না কেন, তার জন্য সে সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তার সাথে সব প্রতিবেশীর সম্পর্কই অবনতির দিকে এবং শীতল। এ সত্য কথাটি প্রকাশিত হয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রধান মোহন ভগবতের এক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে উন্নতির কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ভারতের সাথে দেশগুলোর সম্পর্কের টানা পড়েন চলছে। ভারতের তা মিটিয়ে ফেলা প্রয়োজন। তার এ কথা থেকেই বোঝা যায়, ভারতের সাথে তার প্রতিবেশীর সম্পর্ক এখন মোটেই ভাল যাচ্ছে না। এর কারণ, প্রতিবেশীর সাথে তার দীর্ঘ দিনের আগ্রাসী মনোভাব এবং ‘খাই খাই’ রাজনীতি। দেশগুলো থেকে সে কেবল নিয়েই গেছে, বিনিময়ে কিছুই দেয়নি। বাংলাদেশের কথাই যদি ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয় এমন কিছুই ভারত করেনি। বাংলাদেশের ন্যায্য কোনো দাবীই সে পূরণ করেনি। উল্টো তার যত ধরনের প্রয়োজন তার সবই আদায় করে নিয়েছে, যেখানে পারস্পরিক সমতাভিত্তিক স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। এ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ভারতের প্রতি ব্যাপক মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। সরকারও তা জানে এবং জানে বলেই অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা মোকাবেলায় চীনের সমতাভিত্তিক সহযোগিতার দিকে ঝুঁকেছে। এক্ষেত্রে ভারতেরও কিছু বলার থাকছে না। কারণ, সে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারেনি এবং সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতাও তার নেই। বাংলাদেশের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং তার অর্থনৈতিক অক্ষমতা তার জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোও ভারতের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছে। এর জন্য ভারত যদি কাউকে দায়ী করতে চায় তবে তাকে নিজেকেই দায়ী করতে হবে। তার আগ্রাসী ও স্বর্থপর নীতিতে প্রতিবেশীরা দীর্ঘদিন ধরেই বিরক্ত এবং এ থেকে মুক্ত থাকার সুযোগও তারা খুঁজেছে। সে সুযোগ করে দিয়েছে করোনায় দেশগুলোর অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং এ পথ ধরে চীনের সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা। অন্যদিকে করোনা ভারতকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে সে সুযোগ হাতছাড়া করে দিয়েছে। বরং করোনার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি যদি চীনের মতো শক্ত অবস্থানে থাকত, তাহলে তার আগ্রাসী মনোভাব আরও বেগবান হতো। বলা যায়, প্রকৃতিই ভারতের এই আধিপত্যবাদী শক্তিকে খর্ব করে দিয়েছে। এখন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের স্কন্ধে ভর করে যতই তার অবস্থান ফিরে পেতে চেষ্টা করুক না কেন, সে পথ এখন সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে। চীনের প্রভাব মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হাত মিলালেও তাতে কোনো লাভ হবে না। এতে যুদ্ধ বাঁধতে পারে, তবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। কারণ, চীনও তাদের ছেড়ে দেবে না। আর প্রতিবেশিদের সমর্থন পাবে তার আশা ক্ষীণ।

চার.
প্রতিবেশিদের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের একটাই পথ তার আগ্রাসী মনোভাব পরিহার করা। সমতাভিত্তিক স্বার্থের রাজনীতি অবলম্বন করা। নিজে বড় দেশ বলে হুমকি-ধমকি দিয়ে প্রতিবেশিদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কেবল নিজের স্বার্থ হাসিল করার মতো নীতি বাদ দিতে হবে। তবে অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, ভারত সে পথে হাঁটছে না। সে শক্তি ও আধিপত্য দিয়েই প্রতিবেশিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সে সামরিক বিষয়ক নানা চুক্তি করেছে। এতে যে তার খুব বেশি লাভ হবে, তা বলা যায় না। চীনকে মোকাবেলা করতে গিয়ে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি এবং উপমহাদেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট ছাড়া কোনো লাভ হবে না। এই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র মুখিয়ে আছে। ভারতকে দিয়ে সে চীনকে শায়েস্তা করার নীতি দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে চীনকে দমিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরোক্ষ এই দ্বন্দ্বে পড়ে ভারত যে বিশ্বরাজনীতি থেকে ছিটকে পড়বে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
[email protected]



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভারত


আরও
আরও পড়ুন