Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

দুর্নীতি দমনে রাসুল (সা.)-এর দর্শন

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ৫ নভেম্বর, ২০২০, ১২:০১ এএম

পূর্ব প্রকাশিতের পর
“আল-কুরআন, ২ : ১৮৮” আল্লাহ বলেছেন, “আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের সম্পদ অবৈধ পদ্ধতিতে ভক্ষণ করো না এবং শাসকদের সামনেও এগুলোকে এমন কোন উদ্দেশ্যে পেশ করো না যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে তোমরা অন্যের সম্পদের কিছু অংশ খাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাও।”
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে গোটা বিশ্বকে একটি Global Village মনে করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে অপেক্ষাকৃত কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলো অধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর সংস্পর্শে এসে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। IMF, World Bank, USA পলিসি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি অনেক NGO দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছে।
দুর্নীতিদমনে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব-কর্তব্য, ভূমিকা ও আইনগত বাধ্যবাধকতা অনেক বেশি। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ বলেছিলেন, “ঘুষ যদি টেবিলের উপরে উঠে যায় তা হলে আমার করণীয় কিছুই নেই, আর যদি নিচে থাকে তাহলে এক্ষুণি প্রতিরোধ করা সম্ভব”। বর্তমানে আমাদের জাতীয় জীবনে ঘুষ, দুর্নীতির অবস্থান কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। দুর্নীতিমুক্ত পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ধর্মীয় আদর্শ ও মূল্যবোধ এবং তাকওয়ার (আল্লাহভীতি) ব্যাপক অনুশীলন হওয়া প্রয়োজন; ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনে দুর্নীতির ভয়াবহ পরিণতি ও কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন; রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, এ ক্ষেত্রে সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সম্পূরক অধ্যায় চালু করা যেতে পারে; সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মানদন্ড রক্ষা করা উচিত; এ বিষয়ে লিখিত অঙ্গিকারনামা ও মৌখিক শপথ নেয়া উচিত যে, তিনি কোন পর্যায়ে নিজেকে দুর্নীতির সাথে জড়াবেন না; রাজনৈতিক পক্ষপাত ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা প্রয়োজন; সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পদমর্যাদা ও দ্রব্যমূল্য সামনে রেখে সম্মানজনক জীবন-জীবিকার উপযোগী বেতনভাতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন;
উল্লেখ্য সুইডেন, আর্জেটিনা, পেরু, সিংগাপুরসহ বিভিন্ন দেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা জীবন-জীবিকার উপযোগী বলে সেখানে দুর্নীতি অনেক কম; সকল ক্ষেত্রে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন; সৎ, যোগ্য ও দক্ষ প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ অডিট ব্যবস্থা, স্বচ্ছ মনিটরিং পদ্ধতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চতকরণ এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তথ্য সংরক্ষণ; দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং দুদককে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির ক্ষমতা দিতে হবে; জনপ্রতিনিধিদের ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মানসিকতার উন্নতি করতে হবে, যাতে দুর্নীতির মত ঘৃণ্য কাজকে ঘৃণার চোখেই দেখে এবং দুর্নীতি থেকে বিরত থেকে নিজেদেরকে মডেল হিসাবে উপস্থাপন করতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে; দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র ও প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। জনপ্রতিনিধি, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রাইভেট চাকরিজীবী ও সাধারণ জনগণকে এ পরিকল্পনার অধীনে নিয়ে আসতে হবে এবং সকলকে আধ্যাত্নিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সততা ও নৈতিকতার আদর্শে উজ্জীবিত করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রণীত কর্মসূচির সাথে আলেম-ওলামা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং মসজিদের ইমাম ও খতবীগণকে সম্পৃক্ত করা এবং তাঁদের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি চালু করা; দুর্নীতি প্রবণতার কারণসমূহ উদঘাটন করে সে আলোকে প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা; সংবাদপত্রের আদর্শিক স্বাধীনতা দিতে হবে; প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; ইসলামের শাস্তি বিধান (ইসলামী ফৌজদারী আইন) চালু করা; কুরআনে বর্ণিত দুর্নীতি প্রতিরোধের আয়াতসমূহের ব্যাপক প্রচার করা; দুর্নীতির ভয়াবহতা ও পরিণাম সম্বলিত হাদীসের ব্যাপক প্রচার করা; সর্বোপরি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় দুর্নীতি বিরোধী ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে আরো গণসচেতনতা ও জনমত সৃষ্টি করতে হবে।
নানা কারণে দুর্নীতি হতে পারে, কোন একক উপাদানকে দুর্নীতির কারণ বলে উল্লেখ করা যায় না। নিম্নে এর কারণগুলো বর্ণনা করা হলো- মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক পরিবেশ থেকে নৈতিক মূল্যবোধের প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। যে জাতি ইসলামী শিক্ষায় তথা ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়, যাদের তাকওয়া ও আখিরাতে জবাবদিহিতার বালাই নেই সে সমাজে দুর্নীতি সহজেই প্রবেশ করে। তার সাথে বাড়তে থাকে অনৈতিক কর্ম, দেখা দেয় হানাহানি, মারামারি ইত্যাকার বিষয়।
সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের কারণে সামাজিক মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটছে। সময় সময় সামাজিক অবস্থার প্রচন্ড পরিবর্তনের চাপে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তার ভাব জন্মায়। এরূপ অনিশ্চয়তা হতে রক্ষার জন্য মানুষ বৈধ বা অবৈধ যে কোন উপায়েই হোক না কেন টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ অর্জন করতে চায়। ফলে দুর্নীতির জন্ম হয়।
অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভের পরই নি:সংকোচে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেরা অবৈধ উপায়ে সুবিধা লাভে লিপ্ত হয় এবং কখনো কখনো একে দূষণীয় মনে না করে যেন অধিকার মনে করে। বিভিন্নপদে স্বজনদেরকে নিয়োগদান, নিজ দলের লোকজনকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধাদান এবং এর মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগদান করে। এভাবে অযোগ্য লোকদের নিয়োগদানের মাধ্যমে দেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।
উন্নত দেশে ব্যক্তির বৈষয়িক সম্পত্তি এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার উপর সমাজে স্থান ও মর্যাদা নিরূপিত হয়। আমাদের দেশে সম্পদের স্বল্পতা ও অভাবের কারণে সরকার সকল কর্মীকে পর্যাপ্ত ভাতা প্রদান করতে পারে না। ফলে সে সমাজের লোকজন জীবিকা নির্বাহের জন্য এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এ বৈষয়িক ব্যাপারটি দুর্নীতির অন্যতম কারণ।
দুর্নীতির অন্যতম আরেকটি কারণ হলো অর্থনীতি। অভাবে যখন স্বভাব নষ্ট হয় তখন সে নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে অসৎ পথে আয় করতে চায়। সীমিত আয়, অর্থাভাব, আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয়, সন্তানের খরচ যোগানো ইত্যাদি কারণে দুর্নীতি করে থাকে।
বর্তমান সমাজে এ সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে তাদের শিক্ষা জীবন শেষ করছে, সার্টিফিকেট নিয়ে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তারা প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। ফলে তারা যখন বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে সোনার হরিণ নামক চাকরি পেয়ে যায় আর তারাই আবার দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে অবলীলাক্রমে জড়িয়ে পড়ে।
আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বেকার সমস্যা। তারপর ভাগ্যের কিংবা মামার জোরে কোনমতে চাকরি হলেও সরকারি চাকরিতে সহনীয় উপযুক্ত ও মানসম্মত বেতন স্কেল ও পদোন্নতি তত সহজ নয়। ফলে খুব সহজেই একজন কর্মকর্তা দুর্নীতিতে আকৃষ্ট হয়।
আরবী ভাষায় একে ফাসাদ বলা হয়। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘‘যে সব লোক আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি হচ্ছে: তাদেরকে হত্যা করতে হবে কিংবা শূলিবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের নির্বাসিত করা হবে।’’ ‘‘আল-কুরআন, ৫ : ৩৩’’ আরবী জারীমা শব্দকেও এর সমার্থক শব্দ হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। জারীমা অর্থ অপরাধ, পাপ বা আইন বিরোধী শব্দ হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। জারীমা অর্থ অপরাধ, পাপ বা আইন বিরোধী কাজ। এর ইংরেজী প্রতিশব্দ হলো crime, offense তাছাড়া Moral degeneration; a malpractice, a corruption, perversion (বদমায়িশি), wickedness, Improbity, dishonesty (অসততা), a diversion from the true path (সৎ পথ থেকে বিপথে গমন)। যার বিপরীত হলো Moral, Morality or relating to the conduct of men; The doctrine or practice of the duties of life. Oxford English Dictionary তে বলা হয়েছে, Dishonest, illegal behabior, especially of people in authority, elegations of bribery.
অর্থাৎ ‘‘দুর্নীতি হল অসততা, অবৈধ আচরণ, বিশেষ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে আসীন ব্যক্তিবর্গের আইন বহির্ভূত আচরণ, ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ইত্যাদি’’। দুর্নীতি হলো সমাজে প্রচলিত নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী বিশেষ ধরণের অপরাধমূলক আচরণ। সাধারণত ঘুষ বলপ্রয়োগ, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব খাটিয়ে এবং ব্যক্তি বিশেষকে সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে গণপ্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধা অর্জনের নাম দুর্নীতি। রমনাথ শর্মার মতে, In corruption a person willfully neglected his specified duty in order to have an undue advantage. অর্থাৎ ‘‘অবৈধ সুযোগ সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তির নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলার নাম দুর্নীতি’’। World Bank কর্তৃক প্রদত্ত দুর্নীতির সংজ্ঞা হলো: Corruption is the abuse of public power for private benefit. অর্থাৎ ‘‘দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার।’’ Trancparency International (TI) এবং Corruption Perception Index (CPI) প্রতিবেদনে দুর্নীতি বলতে সরকারি ক্ষমতা ও সুবিধাকে বেসরকারি বা ব্যক্তি স্বার্থে অপব্যবহার এবং সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিকে বুঝানো হয়েছে। Trancparency International এর সংজ্ঞা হলো: Corruption is the abuse of public office for private gain. অর্থাৎ “সরকারি দফতরকে ব্যক্তি স্বার্থে কাজে লাগানো, যেখানে জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।” M.Johne এর মতে, ‘‘Corruption is missuse of public property, public rank and status for private interest.” দুর্নীতি কেবল সরকারি কার্যক্রমের মধ্যে সীমিত নয়; বরং সরকারি, বেসরকারি, এনজিও বিভিন্ন পেশা, শ্রেণী, পরিবার, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক স্বার্থেও হতে পারে। যেমন, একজন সরকারি কর্মকর্তা অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়ে ব্যক্তিগত কার্যাবলী সম্পন্ন করতে পারেন, যা দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত হবে অথবা সরকারি বাজেটের টাকা দিয়ে টেন্ডার ছাড়াই কোন কাজ নিজের বা দলীয় লোকদের মাধ্যমে করানো অথবা টেন্ডার দিলেও কাজের মান যথাযথভাবে ঠিক না রেখে কিছু টাকা খরচ করে বাকি টাকা নিজের পকেটস্থ করাও দুর্নীতি হিসেবে গণ্য হবে।
লেখক : ইসলমী শিক্ষাবিদ ও গবেষক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রাসুল-(সা.)-দর্শন
আরও পড়ুন