Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০৯ মাঘ ১৪২৭, ০৯ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

ওয়াইসি কি পশ্চিমবঙ্গের ভোটেও প্রভাব ফেলবেন?

বিহারে বিজেপির জয়ে ভ‚মিকা এমআইএম’র?

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১৩ নভেম্বর, ২০২০, ১২:০২ এএম

বিহারের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীরা ১৯টি আসনে জয়লাভ করেছেন। এগুলোর মধ্যে ৫টি আসন দখল করেছে দক্ষিণ ভারতভিত্তিক অল ইন্ডিয়া মজলিশে ইত্তেহাদুল মুসলিমীন বা এমআইএম। এতে উজ্জীবিত হয়ে তারা ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটেও লড়ার কথা জানিয়েছে। এর ফলে মুসলিম ভোট ভাগাভাগি হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। এমনকি এর ফলে অনেক আসনে তৃণমূল পরাজিত হয়ে বিজেপির পাল্লা ভারী হয়ে যাবার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিবিসি বাংলার অমিতাভ ভট্টশালীর প্রতিবেদন:

আসাদউদ্দিন ওয়াইসি দল অল ইন্ডিয়া মজলিশে ইত্তেহাদুল মুসলিমীন বা এমআইএম বলছে, তারা ২০২১ সালে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী দেবে। ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দিয়েছে, কিন্তু ইতিবাচক কোনও সাড়া পায়নি। ওদিকে, বিহারে তার দল লড়ার কারণে বিজেপি বিরোধী জোট বেশ কিছু আসনে হেরেছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা ইতিমধ্যেই খারিজ করে দিয়েছেন জনাব ওয়াইসি।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জনাব ওয়াইসি তথা এমআইএম-এর প্রবেশ কি একইভাবে বিজেপি বিরোধী ভোটে ভাগ বসাবে? কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এ আইএমআইএম - এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে আলোচনা।
বিহারের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পরে জনাব ওয়াইসির দলের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে যে, তারা বিজেপি বিরোধী জোটের ভোট কিছুটা কেটে নিয়েছেন বলেই বেশ কিছু আসনে আরজেডি-কংগ্রেস আর বামপন্থীদের মহাজোট হেরেছে। তাদের মোট প্রাপ্ত আসনসংখ্যাও কমেছে, যার সুবিধা পেয়েছে বিজেপি জোট। জনাব ওয়াইসির বিরুদ্ধে এ অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের একাংশ বলছে, ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি যেমন করেন জনাব ওয়াইসি, তেমনই তিনি যেভাবে কড়া ভাষায় মুসলিম সমাজের অনুন্নয়নের কথা বলে থাকেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই সত্য হলেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী ভোট একজোট করে দেয় তার নির্বাচনী ভাষণ। যদিও একাধিকবার তার বিরুদ্ধে তোলা এ অভিযোগ নস্যাৎ করেছেন জনাব ওয়াইসি।

বিহারের পর বড় নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গ আর আসামে। আগামী বছরের এপ্রিল মে মাস নাগাদ ভোট নেয়া হতে পারে। তার আগে জনাব ওয়াইসি পশ্চিমবঙ্গে ভোটে লড়ার ঘোষণায় বিজেপি বিরোধী ভোট ভাগাভাগি হয়ে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশে যে আলোচনা চলছে, তার কতটা ভিত্তি আছে?
পশ্চিমবঙ্গে এমআইএম-এর রাজ্য কোঅর্ডিনেটর সৈয়দ জামিরুল হাসান বলেন, ‘আমরাও কখনও চাই না যে বিজেপি জিতুক। সেজন্যই জনাব ওয়াইসি বিহারে এবারের নির্বাচনের আগে আর জেডি-কংগ্রেস জোটের কাছে অনুরোধ করেছিলেন আমাদেরও জোটে সামিল করার জন্য। আমরা চেয়েছিলাম সীমাঞ্চল এলাকায় আমাদের আসন ছেড়ে দেয়া হোক। কিন্তু তারা রাজী হননি’।

‘আমরাও তো রাজনীতি করতেই এসেছি। তাই ভোটে তো আমরা লড়বই। কেউ সঙ্গে না নিলে রবীন্দ্রনাথের গানের কথা মতো একলা চলো রে নীতিতেই আমরা লড়েছি বিহারে, পশ্চিমবঙ্গেও যদি কেউ সঙ্গে না নেয় আমাদের, এখানেও তাই করব’ -বলছিলেন জনাব হাসান।

তার কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গেও আমরা সেই একইভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে অন্তত ছয় মাস আগে চিঠি দিয়েছি যে, আমাদেরও তার সঙ্গে সামিল করা হোক। কিন্তু তিনি উত্তর দিয়েছেন আমাদের দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে। কিন্তু তাতেও তৃণমূলের সঙ্গেই কাজ করতে রাজী আছি যদি আমাদের যথেষ্ট সংখ্যক আসন ছাড়া হয়’।
বিজেপি-র বিরুদ্ধে ভোটে লড়ার জন্য সব রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনগুলোর কাছে আহŸান জানিয়ে মুসলিম সামাজিক সংগঠনগুলোর একাংশ ইতিমধ্যেই প্রচার শুরু করেছে। ফেসবুকে এরকম বেশ কিছু ভিডিও ইতোমধ্যেই সামনে এসেছে যেখানে সব রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে বলা হচ্ছে যে, এমআইএম-কেও যেন বিজেপি-বিরোধী জোটে সঙ্গে নেয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় ২৯৪টি আসন। তার মধ্যে ৯৪টি আসনে লড়তে চাইছে এমআইএম।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, ২৯৪টির মধ্যে এমন ৯৮টি আসন আছে, যেখানে মুসলমান ভোটাররাই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করেন। এগুলির মধ্যে ৩০টি আসন আছে যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ আর ৩৮টি আসনে মুসলমান ভোটার প্রায় ২০ শতাংশ।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, ‘এমআইএম যেসব এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছে, সেগুলো খেয়াল করলে দেখবেন, মূলত বিহার লাগোয়া উত্তর দিনাজপুর, মালদহ বা মুর্শিদাবাদ এসব অঞ্চল। এখানে একদিকে যেমন মুসলিম ভোটারদের আধিক্য আছে, আবার এগুলো বিহারের সেসব এলাকার পাশেই, যেখানে জনাব ওয়াইসির দল এবার ভোটে জিতেছে’।

‘আবার কলকাতা বা পার্শ্ববর্তী যেসব এলাকায় উর্দুভাষী মুসলমানরা থাকেন, তাদের মধ্যেও এমআইএমের একটা সমর্থন গড়ে উঠেছে। তাই এসব ফ্যাক্টর ভোটের ফলাফলে ভালই প্রভাব ফেলবে বলে আমার ধারণা’, বলছিলেন রায়চৌধুরী।
রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ও মুসলিম সমাজের অন্যতম নেতা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিচয়ভিত্তিক যে রাজনীতি করতে চাইছেন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, তা খুব একটা সমর্থন পাবে না বলেই তার বিশ্বাস। তার কথায়, ‘এ রাজ্যের মুসলমানরা প্রথাগতভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে সমর্থন করেনি, যে কারণে মুসলিম লীগও খুব দ্রæত জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এখানে। এখানকার মুসলমানরা এটাই দেখে যে কারা ধর্মনিরপেক্ষ থেকে সরকার গঠন করতে পারবে, তাদেরই ভোট দেয়। যেমন একটা সময়ে ছিল কংগ্রেস জমানা, তারপর বাম জমানা আর এখন তৃণমূল কংগ্রেসের জমানা। সবসময়েই এটা হয়ে এসেছে’।

বিহারের উদাহরণ দেখিয়ে জনাব চৌধুরী বলেন, ‘এমআইএম-এর নানা বক্তব্যের কারণে বিজেপি তাদের ভোট ব্যাঙ্ক সুসংহত করে ফেলার সুযোগ পেয়ে যায়। তারপরেও যদি কেউ ওই ফাঁদে পা দিতে চায়, তাহলে কিছু বলার নেই’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক অরুন্ধতী মুখার্জী বলছিলেন, গতবছরই জনাব ওয়াইসি কলকাতায় এসে ঘোষণা করেছিলেন যে, তার দল পশ্চিমবঙ্গে কাজ শুরু করতে চলেছে এবং ইতোমধ্যেই তারা বেশ কয়েকটি মুসলমান অধ্যুষিত জেলায় দফতরও খুলেছে, সমর্থকও যোগাড় করছে।

আবার জনাব ওয়াইসি যেসব প্রশ্ন তুলছেন রাজ্যের মুসলিমদের অনুন্নয়নের ক্ষেত্রে, সেগুলোকেও মুসলিম সমাজের একাংশ সমর্থন করছে বলেই মনে করেন অরুন্ধতী মুখার্জী। ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে একটা কথা অনেক সময়েই বিজেপি বলে থাকে যে, তিনি মুসলমান তোষণের রাজনীতি করছেন। কিন্তু জনাব ওয়াইসি যেসব প্রশ্ন তুলছেন তা হল, মমতা ব্যানার্জী মুসলমানদের সঙ্গে আছেন বলে কিছুটা লোক দেখানো রাজনীতি করছেন, আদতে মুসলমানদের অর্থনৈতিক বা শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি কিছুই হচ্ছে না এবং আমি গ্রাম-গঞ্জে সংবাদ সংগ্রহের কাজে গিয়ে দেখেছি, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির এসব কথার প্রতি একটা সমর্থন কিন্তু মানুষের মধ্যে থেকে আসছে’- বলছিলেন অরুন্ধতী মুখার্জী।

‘বিজেপি তো বলেই যে, মমতা ব্যানার্জী মুসলমান তোষণের রাজনীতি করছেন। কিন্তু অন্যভাবে যদি ভাবেন, এ প্রশ্নও তো উঠতে পারে যে, দুর্গাপুজোর সময়ে ক্লাবগুলোকে ৫০ হাজার টাকা করে দিল সরকার, কিন্তু ঈদের সময়ে তো মুসলমান প্রধান এলাকার ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়া হয়নি’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বলছেন, ‘সরকারি প্রকল্পগুলোর মধ্যে বিশেষ করে কন্যাশ্রী খুবই উপকারী এবং ভাল একটা প্রকল্প, কিন্তু সেটির নামের সঙ্গে যখনই ‘শ্রী’ যোগ করা হল, তার মধ্যে কি একটা হিন্দু টোন চলে এল না’?

পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের একটা অংশ মনে করছে যে, এমআইএম পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে নামলেই যে দলে দলে মুসলমান সেদিকে চলে যাবেন, এমনটা নয়। কারণ মুসলমান সমাজ একজোট হয়ে কোনও একটি দলকে ভোট দেয় বলে যে ধারণা রয়েছে, তা ভুল। তাই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ রাজনৈতিক বিশ্বাস আর পছন্দের ভিত্তিতেই ভোট দেবেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয় - এমনটাই বক্তব্য মুসলিম সমাজের ওই অংশের।

আবার অন্য একটি অংশের মতে, মূলত কম বয়সীদের এমআইএম-এর রাজনীতি আকৃষ্ট করছে এবং এদের মধ্যে উর্দুভাষীরা যেমন আছেন, তেমনই বাংলাভাষী গ্রামগঞ্জের মুসলমানরাও আছেন।
‘এমআইএম-এর রাজনীতি শুধু উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদে নয়, বাঙালী মুসলমান অনেক সংখ্যায় রয়েছেন, এমন জেলা বীরভ‚মেও যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কমবয়সীদের মধ্যে, সেটা আমরা লক্ষ্য করছি’, -বলছিলেন সামাজিক সংগঠন বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের নেতা সামিরুল ইসলাম।

তার কথায়, ‘মুসলমানরা তো দেখছে যে, বিভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল তাদের শুধুই ভোট ব্যাঙ্ক হিসাবে ব্যবহার করে এসেছে এতদিন। কোনও দলেই বড়মাপের কোনও নেতা দেখবেন না যিনি মুসলিম বা দলিত শ্রেণী থেকে উঠে এসেছেন। এ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটার বহিঃপ্রকাশের জায়গা কোথায়! গণি খান চৌধুরীর পরে গ্রাম বাংলার মুসলমানদের তো কোনও নেতাই নেই।
‘এ জায়গাটাই কাজে লাগাচ্ছেন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। এখন মুসলমানদের একাংশ তাই ভাবছে, তিনিই বোধহয় তাদের ত্রাতা হয়ে উঠবেন। এ মনোভাব আমরা গ্রামে-গঞ্জে দেখতে পাচ্ছি, বিশেষ করে যুবকদের একাংশ তার কথায় প্রভাবিত হচ্ছেন। কিন্তু তিনি যদি মুসলমানদের কথা এতটাই ভাবতেন, তাহলে বেছে বেছে হাতে গোনা কিছু জায়গায় প্রার্থী দিতেন না। আবার এ প্রশ্নও উঠছে যে, হায়দ্রাবাদের একজন নেতা কেন বাংলার মুসলমানদের নেতৃত্ব দেবেন! তাই তিনি যে ভোট ভাগাভাগির কাজটাই করে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেবেন, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না’, -বলছিলেন জনাব ইসলাম। তবে তার আরও প্রশ্ন, ‘কিন্তু বিজেপি-কে আটকানোর দায় কি শুধু মুসলমানদেরই’? সূত্র : বিবিসি বাংলা।

 

 



 

Show all comments
  • বাবুল ১৩ নভেম্বর, ২০২০, ২:০৯ এএম says : 0
    সেরকমই মনে হচ্ছে
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ওয়াইসি


আরও
আরও পড়ুন