Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২১, ০৭ মাঘ ১৪২৭, ০৭ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

কেমন ছিল সাহাবায়ে কেরামের নবীপ্রেম

মাওলানা বাশীরুদ্দীন আদনান | প্রকাশের সময় : ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১২:০০ এএম

নবী কারীম (সা.)-কে ভালোবাসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। তাঁরা সত্যিকারের নবীপ্রেমের বেনজীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। হযরত আবু সুফিয়ান রা. ইসলাম গ্রহণের আগেই এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন : ‘আমি কাউকে এতটা ভালোবাসতে দেখিনি, মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর সঙ্গীরা যতটা ভালোবাসে।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম ২/১৭২; আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/৬৫)
এমনিভাবে হযরত উরওয়া ইবনে মাসঊদ রা. ইসলাম গ্রহণের আগে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুশরিকদের পক্ষ হয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরসঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর তিনি নিজ কওমের নিকট এই অনুভূতি পেশ করেছিলেন : ‘আমি অনেক রাজা বাদশাহদের কাছে প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছি। কায়সার কিসরা ও নাজাশীর কাছেও গিয়েছি। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সা.)-কে তার সঙ্গীরা যেভাবে ভক্তি করে সেভাবে আমি আর কাউকে দেখিনি তাদের বাদশাহকে ভক্তি করতে। আল্লাহর কসম! তিনি থুথু ফেললেই তাদের কেউ না কেউ তা হাতে নিয়ে নেয় এবং তা চেহারায় ও শরীরে মাখে। তিনি যখন তাদেরকে আদেশ করেন তখন তারা তাঁর আদেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর যখন তিনি অজু করেন তখন তাঁর অজুতে ব্যবহৃত পানি পাওয়ার জন্য লড়াই করার উপক্রম হয়।’ (সহীহ বুখারী : হাদীস ২৫৮১)।

হযরত আনাস রা. বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি, তাঁর চুল মুবারক মুন্ডন করা হচ্ছে আর তাঁর সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে আছে। তাঁরা চাইছিলেন তাঁর একটি চুলও যেন মাটিতে না পড়ে। বরং কারো না কারো হাতেই পড়ে। (সহীহ মুসলিম : হাদীস ২৩২৫)।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) মৃত্যুশয্যায় আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন : ‘নবীজি (সা.) কোন্ দিন ইন্তেকাল করেছেন? আয়েশা রা. জানালেন, সোমবার। তিনি বললেন, আজ কী বার? জবাব দিলেন, সোমবার। তখন তিনি বললেন, হায় যদি আমার মওত রাতের আগেই হতো!’ (সহীহ বুখারী : হাদীস ১৩৮৭)। ভালোবাসার দৃষ্টান্ত দেখুন। আমার মৃত্যুও যেন হয় সে দিনে, যে দিনে প্রেমাষ্পদের মৃত্যু হয়েছিল।
হযরত আমর ইবনুল আস রা. মৃত্যুশয্যায় বলেছেন : ‘এই পৃথিবীতে আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে অধিক প্রিয় ও মহান আর কেউ নেই। আমার হৃদয়ে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার এ অবস্থা ছিল যে, আমি তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতাম না। আমাকে যদি তাঁর দেহাবয়বের বর্ণনা দিতে বলা হয়, আমি পারব না। কারণ, আমি দুচোখ ভরে তাঁকে দেখতে পারিনি।’ (সহীহ মুসলিম : হাদীস ১৯২)।

হযরত জাবের রা. বলেন, উহুদ যুদ্ধের সময় রাতে আমার আব্বা আমাকে ডেকে বললেন : ‘আমার প্রবল ধারণা, আমি নবী কারীম (সা.)-এর সঙ্গীদের মধ্যে আগেভাগেই শহীদ হব। আর আমি তোমাকেই সবচেয়ে প্রিয় হিসেবে রেখে যাচ্ছি, তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) ছাড়া (কারণ, তিনিই আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়)।’ (সহীহ বুখারী : হাদীস ১৩৫১)।

এই উহুদ যুদ্ধেরই ভয়াবহ মুহূর্তে আরেক সাহাবী হযরত আবু তালহা (রা.) নিজে ঢাল হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ওপর আক্রমণ প্রতিহত করছিলেন। একপর্যায়ে যখন নবীজী উঁকি দিয়ে দেখতে উদ্যত হলেন তখন আবু তালহা রা. বলে উঠলেন : ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি উঁকি দেবেন না; পাছে আপনার গায়ে কোনো তীর এসে লাগে। আমার বুক আপনার জন্য উৎসর্গিত। (সহীহ বুখারী : হাদীস ৩৮১১)।
আরেক নারী সাহাবীর ঘটনা তো আরও বিস্ময়কর। উহুদ যুদ্ধেরই ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বনূ দীনারের এক নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার স্বামী ও ভাই উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। লোকেরা যখন তাকে সমবেদনা জানাতে গেল তখন তিনি জানতে চাইলেন, নবীজী কেমন আছেন?। তারা বলল, ভালো আছেন আলহামদুলিল্লাহ। (তাতেও তাঁর মন শান্ত হল না।) বললেন : তবুও আমি নিজে দেখতে চাই; আমাকে দেখাও। অতপর যখন তাকে দেখানো হলো তিনি বললেন : (আল্লাহর রাসূল, আপনি নিরাপদ আছেন!) আপনার (নিরাপত্তার) পরে সমস্ত বিপদ তুচ্ছ। (দালাইলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী ৩/৩০২; সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৯৯)

 



 

Show all comments
  • Khorshed Gazi ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১:১০ এএম says : 0
    রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম মহানবী (সা.)-এর প্রতি যে ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা কেবল বিস্ময়করই নয়; নজিরবিহীনও বটে। তাঁর একটু সান্নিধ্য-পরশ পাওয়ার জন্য যাঁরা সর্বদা অধীর আগ্রহী ও ব্যাকুল হয়ে থাকতেন, তাঁর ইশারায় যাঁরা মুহূর্তেই প্রিয় প্রাণ উৎসর্গে সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন
    Total Reply(0) Reply
  • Khan Ifteakhar ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১:১১ এএম says : 0
    নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। এছাড়া ঈমান পূর্ণতা পায় না। ঈমানের পূর্ণতার জন্য নবীজীকে শুধু আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসেবে মেনে নেওয়াটাই যথেষ্ট নয়। সেইসাথে নবীজীকে ভালোবাসতে হবে হৃদয় থেকে। এ ভালোবাসা ঈমানের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে। ঈমানকে সজীব ও জীবন্ত করে তোলে। সেইসাথে শরীয়তের আহকাম ও বিধি-বিধান মানাও সহজ করে।
    Total Reply(0) Reply
  • Ujjal Khan ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১:১১ এএম says : 0
    তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান ও সকল মানুষ থেকে প্রিয় হব। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫
    Total Reply(0) Reply
  • Jabair Ahammad ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১:১২ এএম says : 0
    সাহাবায়ে কেরামের কাছে নবীজী ছিলেন প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তাই নবীজীর জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা ছিল তাদের দিলের তামান্না। নবীজীর গায়ে কোনো আঁচড় লাগুক অথবা পায়ে কোনো কাঁটা বিঁধুক এটাও তারা সহ্য করতে পারতেন না।
    Total Reply(0) Reply
  • Omar Farook Sharif ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১:১৩ এএম says : 0
    কারো প্রতি ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে তার আদেশ মেনে চলা। তার চিন্তা ও আদর্শকে জীবনে ধারণ করা। সাহাবীগণ নবীজীর প্রতি যে গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন তা তাদের কর্ম ও আমলের মাধ্যমেও প্রকাশ পেত।
    Total Reply(0) Reply
  • Hassan Mohammed ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১:১৪ এএম says : 0
    সাহাবিদের লাখ লাখ চক্ষু সার্বক্ষণিক রসুল (সা.)-এর দৈনন্দিন জীবনযাপন ও কর্মের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকত। কোনো করণীয় ও বর্জনীয় আমল প্রিয় রসুল (সা.) থেকে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমলে রূপান্তরিত করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। কার আগে কে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন।
    Total Reply(0) Reply
  • Hassan Mohammed ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১:১৫ এএম says : 0
    সাহাবিরা নবীপ্রেমে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন। যেমন সন্তান প্রিয় মায়ের স্নেহ-মমতা, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, ভাই-বোনের হৃদয় নিংড়ানো দরদ, এমনকি পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করে স্বীয় বাপ-দাদার বসতভিটা, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ধন-সম্পদ এবং নিজেদের ক্ষমতা প্রভাব-প্রতিপত্তি পেছনে রেখে প্রিয় নবীর সংস্পর্শে লাভের আকাঙ্ক্ষায় অজানা-অচেনা পথ ধরে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। পেছনে রেখে আসা সহায়-সম্পত্তির জন্য জীবনে কখনো আক্ষেপ পর্যন্ত করেননি।
    Total Reply(0) Reply
  • Md. Amzad Hossain Sagor ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ১০:৪৭ এএম says : 0
    রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম মহানবী (সা.)-এর প্রতি যে ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা কেবল বিস্ময়করই নয়; নজিরবিহীনও বটে।
    Total Reply(0) Reply
  • আললাহ আমাদের তাদের মতো ভালোবাসার তাওিফক িদন
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

১৬ জানুয়ারি, ২০২১
১৫ জানুয়ারি, ২০২১
১৪ জানুয়ারি, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন