Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

গুজব প্রতিরোধে ইসলামের ভূমিকা

নেছার বিন আলী আহমদ হাজারী | প্রকাশের সময় : ২০ নভেম্বর, ২০২০, ১২:০২ এএম

গুজব শব্দটি বাংলা যার আরবি প্রতিশব্দ ইশায়াতুন। অর্থ রটনা বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, যার কোন ভিত্তি নেই। জনসাধারণ সম্পর্কিত কোনো বিষয়, ঘটনা, তথ্য বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত অমূলক, বিকৃত ও বর্ণনা বা গল্পকে গুজব বলা হয়। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় গুজব হলো এমন কোনো বিবৃতি যার সত্যতা নিশ্চত বা উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। গুজব অনেক ক্ষেত্রে ‘ভুল তথ্য’ এবং ‘অসঙ্গত তথ্য’ বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। প্রতিনিয়ত গুজব শুনতে শুনতে আমরা এখন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ফলে গুজব মাঝে মাঝে বিশ্বাসে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়ে উঠে। গুজবের কারণে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দ্ব›দ্ব-কলহের শেষ নেই। গুজব সৃষ্টি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে যেমনিভাবে র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট তাদের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার ও কঠোর অবস্থানে। তেমনি গুজব প্রতিরোধে ইসালামেরও রয়েছে চমৎকার দৃষ্টিভঙ্গি ও অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান। ইসলামে গুজবের কোনো স্থান নেই এবং এ বিষয়টি ইসলামে খুবই গর্হিত কাজ হিসেবে চিহ্নিত। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে গুজব তথা মিথ্যা অপপ্রচারের ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। গুজব ছড়ানো ইসলামে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গুজব ছড়িয়ে যারা মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নত করে এবং সম্মানহানি করে তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধানও রয়েছে ইসলামে।
মূলত ইসলাম গুজবকে যেভাবে দেখে। সাধারণত গুজব মানুষের মুখে মুখে এটি বেগবান হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে। আর এ কাজে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে শয়তান। স্বভাবতই শয়তান সবসময় মানুষের মধ্যে ওয়াস-ওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। এই শয়তান দুই প্রকারের হয়ে থাকে। এক শ্রেণীর শয়তান আছে, যারা জিন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং অপর শ্রেণীর শয়তান মানুষেরই এক সম্প্রদায়। এই উভয় শ্রেণীকে পবিত্র কুরআনে ‘শায়তানুল ইনছ ওয়াল জিন্ন’ বলে আখ্যায়িত করেছে। শায়তানুল জিনরা নির্দিষ্ট কতেক আকৃতি ব্যতীত যে কোনো আকার-রূপ ধারণ করতে পারে। এই শক্তি সৃষ্টিকর্তাই তাদেরকে দিয়েছেন। কুরআনের ভাষার ‘হিজবুশ শায়তান’ বা শয়তানের দলকে মানবের চর্ম চোখে স্বাভাবিকভাবে অবলোকন করা না গেলেও, তাদের আচরণ ও কার্যকলাপ সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। পক্ষান্তরে মানব শয়তান যেহেতু কোনো অদৃশ্য শক্তি নয়, তাই তাদের পরিচয় শয়তানি কার্যকলাপের মাধ্যমে পাওয়া যায়। মুনাফেকি আচরণ হলো তাদের অন্যতম পরিচয় ও লক্ষণ। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুনাফিকের অন্যতম আলামত হলো যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা কথা বলে’(বুখারী)। এরূপ লোকেরা সাধারণ মানুষকে নানাভাবে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত করে থাকে। জনসাধারণের মধ্যে মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে শয়তানি ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশেষ পরিস্থিতিতে নানা গুজব রটানো ও উদ্ভট কথাবার্তা প্রচার করে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালানোই এদের স্বভাব-চরিত্র। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের চরিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা যমীনে ফাসাদ করো না’, তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী’। জেনে রাখ, নিশ্চয় তারা ফাসাদকারী; কিন্তু তারা বুঝে না। (সূরা আল বাকারা-১১,১২)। ফাসেক বা মন্দ লোকের খবর ততক্ষণ বিশ্বাসযোগ্য না, যতক্ষণ তা প্রমাণিত না হবে। কুরআনের এই সুনীতির অনুসরণ করা হলে গুজব রটনা বা মিথ্যা প্রচারণায় কোনো মুসলমান বিভ্রান্ত হতে পারে না। পাশাপাশি সন্দেহ এবং সংশয়ের বিষয়গুলো হতে বিরত থাকার প্রতিও গুরুত্বরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘হে মোমিনগণ! অধিক সংশয় বোধ হতে বিরত থাকো। কেননা কোনো কোনো সংশয় পাপকার্যের অন্তুর্ভুক্ত’ (সূরা হুজরাত-১২)।
হাদিস শরীফে সংশয় সৃষ্টিকে ‘মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) কর্তৃক বর্ণিত; নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘সত্য সম্পর্কে তোমরা সংশয় সৃষ্টি হতে বেঁচে থাকো। কেননা সংশয় সৃষ্টি মিথ্যা কথা স্বরূপ’ (তিরমিজি)। এতে প্রমাণিত হয় যে, যারা গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে মানুষদেরকে সংশয়গ্রস্ত করে তোলে, এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তারা মুনাফিক, মিথ্যাবাদী ও বড় পাপিষ্ঠ। সংশয় ও গুজব কিভাবে প্রকাশ পায় সেটিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তুলে ধরেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘শয়তান মানুষের আকার ধারণ করে লোকের কাছে আসে এবং তাদের মধ্যে মিথ্যা কথা প্রচার করে। ফলে তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্য হতে কোনো লোক বলে ওঠে যে, আমি এক ব্যক্তির কাছে এরূপ বলতে শুনেছি, তার চেহারা দেখলে চিনি, কিন্তু তার নাম বলতে পারি না’(মুসলিম)। মিথ্যা প্রচার ও গুজব রটনা সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই স্পষ্ট চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, গুজব রটনাকারীরা এই নীতিরই অনুসরণ করে থাকে। সুতরাং গুজব ছড়ানো শয়তানের কাজ আর কোনো মুমিন মুসলমান কখনও শয়তানের কাজে সহযোগিতা করতে পারে না। গুজবে কান না দেয়া, গুজবে বিশ্বাস না করা ও যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রচার করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্বও বটে।



 

Show all comments
  • ফরিদ আহমেদ হাজারী ২০ নভেম্বর, ২০২০, ৯:৫৬ পিএম says : 0
    আল্লাহ আমাদের সকলকে এই গুজব ছড়ানোসহ সকল ফেতনা থেকে হেফাজত করুন আমিন ছোট ভাইয়ের জন্য দোয়ার দরখাস্ত রইল আল্লাহ যেন আমার ভাই কে বড় আলেম হিসাবে কবুল করে
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলামের-ভূমিকা
আরও পড়ুন