Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২১, ০৭ মাঘ ১৪২৭, ০৭ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

মীরসরাইয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি

ভাঙ্গছে জমি, কাঁদছে মানুষ

মীরসরাই (চট্টগ্রাম) উপজেলা সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২২ নভেম্বর, ২০২০, ১:৫৩ পিএম
  • ১০ বছরে কমেছে ২ হাজার ১শত ৫ হেক্টর জমি
  • ইজারা এলাকা থেকে সুবিধা জনক স্থানে গিয়ে কাটা হচ্ছে চর
  • চর বেচা কেনায় দালাল চক্র প্রভাব খাটানো অভিযোগ
  • বালু উত্তোলনে ৩ ফসলী জমিতে রাখায় কমছে ফসল উৎপাদন
  • বালু উত্তোলন করতে গিয়ে নদী পড়ে নিহত-১

মীরসরাই উপজেলা ফেনী নদী ও এর আশপাশের এলাকায় বিটি বালুর (জমি ভরাটের কাজে ব্যবহৃত) চাহিদা মিঠিয়ে থাকে উপজেলার ইজারাকৃত তিনটি বালু মহল। কিন্তু বৈধ ইজারার নামে উপজেলার হিঙ্গুলী, ধুম ও করেরহাট ইউনিয়নের ফেনী নদীর পার্শ্ববর্তী চরগুলোতে বালু উত্তোলনের নামে ফসলি জমি কাটার অভিযোগ পাওয়া গেছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে কৃষি জমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষকরা পড়েছে বিপাকে। তবে ফসলের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক স্থানীয় দালালের খপ্পরে পড়ে স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করে ফেলছে। আবার অনেকে পাশের জমি বিক্রি করায় অবৈধ বালু সিন্ডিকেট গভীর করে বালু উত্তোলনের ফলে জমি নদীতে ভেঙ্গে পড়ায় বাধ্য হয়ে নিজ জমি বিক্রি করছে বালু সিন্ডিকেটের হাতে। ফসলি জমি কেটে বালু উত্তোলন সহ বিভিন্ন কারণে গত ১০ বছরে মীরসরাইয়ে কৃষি জমি কমেছে ২ হাজার ১শত ৫ হেক্টর।
মীরসরাই কৃষি অফিসের তথ্য মতে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় কৃষি জমির পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৫শত ৫ হেক্টর। ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে তাহা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৪০০ হেক্টরে। অর্থাৎ গত ১০ বছরের কৃষি জমি কমেছে ২ হাজার ১শত ৫ হেক্টর। সবচেয়ে বেশি কৃষি জমি কমেছে বালু উত্তোলনকারী ইউনিয়ন ১নং করেরহাটে। ওই ইউনিয়নে ১০ বছরে কমেছে ১ হাজার ৫শত হেক্টর জমি।
হিঙ্গুলী ইউনিয়নের দক্ষিণ আজমনগর গ্রামের বর্গাচাষী মিজানুর রহমানের সংসার চলতো জমি চাষ করে। কিন্তু তার চাষাবাদের জমিতে নজর পড়ে বালু ব্যবসায়ীদের। ফল যা হওয়ার তাই হলো। নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হলো বালু সেন্ডিকেট এর কাছে। জমি হারিয়ে তিনি এখন সংসার চালান দিনমজুরী করে। শুধু মিজানুর রহমান নন। হিঙ্গুলী ও ফেনী নদীর সংযোগ স্থলে ৪৬ শতক জমি হারিয়ে দিশেহারা কৃষক জাফর উল্ল্যা। যেখানে চাষ হতো ধান, ডাল, শীতকালীন সবজি সহ বিভিন্ন ফসল। সেখানে এখন শুধু পানি আর পানি। এমন অনেকে আছেন বালু সিন্ডিকেটের হাতে জমি হারিয়ে দিন কাটাচ্ছেন দুঃখ কষ্টে।
মীরসরাই উপজেলা ভূমি কার্যলয় সূত্র জানা গেছে, প্রত্যেক বছরের মতো চলতি বছরও বাংলা ১৪২৭ সালের জন্য উপজেলায় সরকারীভাবে ৩টি বালু মহাল ইজারা দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৩৬ লাখ টাকায় করেরহাট ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি সুলতান গিয়াস উদ্দিন জসিম ‘লিজা এন্টাপ্রাইজের’ নামে ওই ইউনিয়নের ২ নং সিটে শুভপুর সেতুর দুই পাশে ৫০০ গজের মধ্যে ৮.৮০ একর জায়গা ইজারা নেন। ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায় করেরহাট ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সেলিম ‘মের্সাস সেলিম এন্টারপ্রাইজ’ এর নামে একি ইউনিয়নের পশ্চিম অলিনগরের ৬ নং মৌজায় ফেনী নদী সংলগ্ন ২.৫০ একর মোল্লাঘাট নামে আরেকটি বালু মহাল ইজারা নেয়। এছাড়া ২নং হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী মৌজার ৫৯৯ দাগের শেষে ও ২হাজার ১৯৯ দাগের শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাছির উদ্দিন হারুন ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় ১.৬২ একর ‘নাছির এন্টাপ্রাইজ’ এর নামে ইজারা নেন। এছাড়া জাফর কোম্পানী, ইব্রাহিম, জসিম, তৌহিদসহ আরো ২০-২৫ জনের একটি সিন্ডিকেট বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, ইজারা এলাকার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলনের নামে চরে ফসলি জমি কেটে কৃষকদের সর্বশান্ত করা হচ্ছে। চর কেটে কৃষি জমি নষ্ট কারীদের অতি দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।
সম্প্রতি বালু উত্তোলন করতে গিয়ে গত ১৭ নভেম্বর হিঙ্গুলী খালের সংযোগস্থলে ডুবে ইকবাল হোসেন (২০) নামে এক বালু শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে বালু উত্তোলনের তিনটি ইজারা স্থানে গিয়ে দেখা যায়, ইজারাকৃত স্থানে বালু না থাকায় ইজারাদাররা কৌশলে ১-২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে নামমাত্র মূল্যে চর কিনে শক্তিশালী ড্রেজার দিয়ে বালু তুলছে।
এ বিষয়ে ব্যাপারে শুভপুর বালু মহালের ইজারাদার লীজা এন্টারপ্রাইজের মালিক সুলতান গিয়াস উদ্দিন জসিম বলেন, কিছুদিন আগে ইজারা এলাকার বাইরে গিয়ে চর কাটায় প্রশাসন ৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। ওই দিন থেকে আমরা আর চর কাটছি না।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বালু ব্যবসায়ীরা কৌশলে চর কেটে থাকে। তারা প্রথমে নদীর পাশের বালুযুক্ত জমিগুলোর একটি কিনে নেন। পরে ওই জমিতে খাড়াভাবে ৮০ ফুট গভীর পর্যন্ত বালু তুলে পার্শ্ববর্তী জমির মালিককে জিম্মি করা হয়। এ অবস্থায় ইচ্ছা না থাকালেও বাধ্য হয়ে পাশের জমির মালিক তার জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয় বালু ব্যবসায়ীদের কাছে। প্রতি শতক জমি মাত্র ৫-৬ হাজার টাকায় কিনে নেয় সেন্ডিকেট চক্র।
এই বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুবল চাকমা জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনস্থলে সম্প্রতি একাধিকবার অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও মেশিন পুড়ে ফেলা হয়েছে।
মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিনহাজ উদ্দিন বলেন, চর কেটে বালু উত্তোলনের বিষয়টি জানতে পেরেছি। শীঘ্রই অবৈধ বালু মহালগুলোতে অভিযান চালানো হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন