Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০৫ মাঘ ১৪২৭, ০৫ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

অশ্রু, শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় শেষ বিদায় বাবা-মার পাশে চিরঘুমে ম্যারাডোনা

স্পোর্টস রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৮ নভেম্বর, ২০২০, ১২:০০ এএম

ফুটবলের মহানায়ক ম্যারাডোনার চিরবিদায়- এই একটি খবরে গত দু’দিন ধরেই স্তব্ধ গোটা বিশ্ব। যে দেশকে একক নৈপূণ্যে এনে দিয়েছিলেন বিশ^জয়ের স্বাদ সেই আর্জেন্টিনা কিংবা মিনোজ থেকে যার জাদুকরি ফুটবলে একসময় ইতালি শাসন করেছিল নেই নাপোলির মানুষগুলোর অবস্থা আরো করুণ। শোকে পাথর, কাতর চোখ যেন কাঁদতেও ভুলে গেছে। নাওয়া-খাওয়ার প্রয়োজনও যেন ফুরিয়েছে মানুষগুলোর। রাস্তায় নেমে আশা লাখো আর্জেন্টাইনদের তো অন্তত এতটুকু সান্ত¡না আছে- শেষবারের মতো এক নজর দেখতে তো পাবো! কিন্তু নাপলসবাসীদের? দূর পরবাস থেকে আসা সেই বাঁ পায়ের জাদুকর যেন তাদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’। মৃত্যুর পরও যার মাদকতার সুরের টানে এই মুথগুলো পথহারা, বৈরাগী হতেও তৈরী।

মৃত্যুর পর প্রাণের খুব কাছে থাকা এই মানুষগুলোকে হয়ত আর কষ্ট দিতে চাইলেন না। শেষ বিদায় বলেই দিলেন। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ম্যারাডোনাকে সমাহিত করা হয়েছে পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের অদূরে বেল্লা ভিস্তা সমাধিস্থলে মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, গতপরশু ভোরে ম্যারাডোনার শেষকৃত্যে অংশ নেন তার কিছু ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধু। তাকে সমাহিত করার আগে অগণিত মানুষ রাস্তায় জড়ো হয়ে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। বেয়া ভিস্তা সমাধিস্থলের বাইরেও অবস্থান নিয়েছিলেন হাজার হাজার ভক্ত-সমর্থক।

এর আগে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্সিয়াল ভবন কাসা রসাদায় রাখা হয়েছিল ম্যারাডোনার লাশ। বুয়েনস আইরেসের সব পথ গিয়ে যেন মিশেছিল সেখানে। ভক্ত, সমর্থকরা একবারের জন্য তার কফিন দেখতে, ভালোবাসা জানাতে ধরেছিল বিশাল লাইন। কয়েকঘন্টা ধরে চলেছিল সেই আয়োজন। করোনাভাইরাসের প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে লাখো মানুষ ধরেছিল শোকের মাতম।

ভোরের আলো ফুটতেই বুয়েন্স আইরেস শহরের সব পথ দিয়ে মিলল কাসা রসাদায়। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের এই ভবনেই যে রাখা হয়েছিল মানুষের নায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনার লাশ। ভক্ত, সমর্থকরা তার কফিন একবার দেখতে, ভালোবাসা জানাতে ধরেছিলেন বিশাল লাইন। কয়েকঘন্টা ধরে চলে সেই আয়োজন। লক্ষ মানুষ করোনাভাইরাসের প্রতিক‚লতা উপেক্ষা করে ধরেছিলেন মাতম। ম্যারাডোনার নাম নিয়ে, ম্যারাডোনার জার্সি পরে মিছিলের স্রোত এগিয়েছে বিদায় জানানোর পথে।

কাসা রসাদায় ম্যারাডোনার কফিন ঢাকা ছিল আর্জেন্টিনার পতাকা দিয়ে। তাতে ভক্তরা ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন ভালোবাসার ১০ নম্বর জার্সি। যা একসময় হয়ে যায় স্তুপ। কেউ দিয়ে ভালোবাসা লেখা কোন কাগজ, কারো বা দেওয়ার ছিল গোলাপ। বোকা জুনিয়র্সের জার্সি ও পতাকা, আর্জেন্টিনার জার্সি ও পতাকার ছিল সমারোহ। হাজার হাজার মানুষের টুপিতে লেখা ছিল, ‘আদিয়র, মি হিরোওই’ অর্থাৎ ‘বিদায়, আমার নায়ক।’ বুকে চাপড় দিচ্ছিলেন, কেউ হাত উঁচিয়ে ধরছিলেন। কান্না, ভালোবাসা সব একাকার হয়ে তৈরি করছিল এক অদ্ভুত মুহূর্ত।

সকালে রাষ্ট্রপতির ভবন ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়ার পরই ঘটে বিস্ফোরক কান্ড। বিপুল মানুষের স্রােত সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় নিরাপত্তারক্ষীদের। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর তৈরি করা হয় কিলোমিটার লম্বা লাইন। সেই লাইন ধরে মানুষের প্রবেশের স্রােত যেন ফুরোচ্ছিলই না। অনেকেই কফিনের কাছে এসে ম্যারাডোনার ১০ নম্বর জার্সি ছুঁড়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অনেকে ম্যারাডোনার নাম ধরে দিতে থাকেন চিৎকার। ক্র্যাচে ভর দিয়ে আসতে দেখা গেছে শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা বহু মানুষকে।

মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের আগেই ম্যারাডোনার পরিবার ও বন্ধুরা আলাদাভাবে প্রিয় এই মানুষকে জানিয়েছেন বিদায়। এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ ঘোষণা করেন তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক। আর্জেন্টাইন গণমাধ্যমগুলো জানায়, বৃহস্পতিবার পুরো দেশই ছিল শোকের চাদরে ঢাকা।

গত বুধবার মারা যান ‘ফুটবল ঈশ্বর’ খ্যাত ম্যারাডোনা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। টিগ্রেতে নিজ বাসায় হার্ট অ্যাটাক হয় তার। হাসপাতালে নেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু এবার তাকে আর ফেরানো যায়নি। মহাতারকার মহাপ্রয়াণে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছে পুরো বিশ্ব।
১৯৬০ সালে ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার জন্ম বুয়েন্স আয়ার্সের লানুসে। ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনোস জুনিয়ার্সের হয়ে পেশাদার খেলার শুরু। ১৯৭৯ প্রথম বিশ্বকাপ বিজয় আর্জেন্টিনার আন্ডার-টোয়েন্টি টিমের সঙ্গে খেলে। ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। তার পরের গোলটি জিতে নেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের শতাব্দীসেরা গোলের খেতাব। সেই আসরের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের গৌরব। ১৯৯৭ সালে ৩৭তম জন্মবার্ষিকীতে তিনি পেশাদার খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০০ ফিফার শতাব্দী সেরা খেলোয়াড় খেতাবে ভ‚ষিত হন। ২০০৮ সালের দুই বছরের জন্য আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচ নিযুক্ত, চলতি নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দলের ম্যানেজার ছিলেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: চিরঘুমে-ম্যারাডোনা
আরও পড়ুন