Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ০৬ চৈত্র ১৪২৫, ১২ রজব ১৪৪০ হিজরী।
শিরোনাম

সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের পথ

প্রকাশের সময় : ২১ আগস্ট, ২০১৬, ১২:০০ এএম

প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

॥ এক ॥
দেশে দেশে পরাশক্তিগুলোর অব্যাহত জুলুম ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ মানবতা যখন ইসলামের শান্তিময় আদর্শের দিকে ছুটে আসছে, তখন ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করার জন্য তারা তাদেরই লালিত একদল বুদ্ধিজীবীর মাধ্যমে কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা করে চরমপন্থী দর্শন প্রচার করছে। অন্যদিকে নতজানু মুসলিম সরকারগুলোকে দিয়ে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক কার্যকলাপসমূহ চালাচ্ছে। অতঃপর জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে একদল তরুণকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সন্ত্রাসী তৎপরতায় লাগানো হচ্ছে। আর তাকেই জঙ্গিবাদ হিসেবে প্রচার চালিয়ে ইসলামকে সন্ত্রাসবাদী ধর্ম বলে বদনাম করা হচ্ছে। অতঃপর সন্ত্রাস দমনের নামে বিশ্বব্যাপী নিরীহ মুসলমানদের রক্ত ঝরানো হচ্ছে। বাংলাদেশে একই পলিসি কাজ করছে। এই প্রেক্ষিতে আমাদের পরামর্শগুলো নিম্নরূপ :
এক- এটি হতে পারে সংশ্লিষ্টদের চরমপন্থী আকিদা সংশোধনের মাধ্যমে। দুই- দেশে সুশাসন কায়েমের মাধ্যমে। তিন- গুম, খুন, অপহরণ ও নারী নির্যাতনসহ ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক সকল কার্যক্রম বন্ধের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে। নইলে সমাজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে সন্ত্রাসবাদ জনগণের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করবে। শেষের দুটি সরকারের দায়িত্ব। প্রথমটি সমাজ সচেতন আলেম-ওলামা ও ইসলামী সংগঠনসমূহের দায়িত্ব। নিম্নে জিহাদ ও ক্বিতাল বিষয়ে চরমপন্থীদের বই-পত্রিকা ও ইন্টারনেট ভাষণ সমূহের জবাব দানের মাধ্যমে আমরা জনগণকে সতর্ক করতে চাই। যাতে তাদের মিথ্যা প্রচারে মানুষ পদস্খলিত না হয়। আমরা সকলের হেদায়াত কামনা করি। নিঃসন্দেহে হেদায়াতের মালিক আল্লাহ।
মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপারে শৈথিল্যবাদী ও চরমপন্থী দুটি দল রয়েছে। যার কোনটাই ইসলামে কাম্য নয়। এদের বিপরীতে ইসলামের সঠিক আকিদা হলো মধ্যপন্থা। যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং প্রকৃত আহলে হাদিসগণই যা লালন করে থাকেন। চরমপন্থীরা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত ও কয়েকটি হাদিসকে তাদের পক্ষে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। যে সবের মাধ্যমে তারা কবীরা গোনাহগার মুসলমানকে ‘কাফের’ বলে এবং তাদের রক্ত হালাল গণ্য করে। যেমন, (১) সূরা মায়েদাহ ৪৪ : যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ্র নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার বা শাসন করে না, তারা কাফের’ (মায়েদাহ ৫/৪৪)। এরপরে ৪৫ আয়াতে রয়েছে ‘তারা জালেম’ এবং ৪৭ আয়াতে রয়েছে, ‘তারা ফাসেক’। একই অপরাধের তিন রকম পরিণতি : কাফের, জালেম ও ফাসেক। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নাজিলকৃত বিধানকে অস্বীকার করল সে কুফরী করল। আর যে ব্যক্তি তা স্বীকার করল, কিন্তু সে অনুযায়ী বিচার করল না সে জালেম ও ফাসেক। সে ইসলামের গ-ী থেকে বহির্ভূত নয়’ (তাফসীর ইবনু জারীর, কুরতুবী, ইবনু কাছীর)। বিগত যুগে এই আয়াতের অপব্যাখ্যা করে চরমপন্থী ভ্রান্ত ফের্কা খারেজীরা চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-কে ‘কাফের’ আখ্যায়িত করে তাঁকে হত্যা করেছিল। আজও ওই ভ্রান্ত আকিদার অনুসারীরা বিভিন্ন দেশের মুসলিম সরকার ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাসূল (সা.) খারেজীদেরকে ‘জাহান্নামের কুকুর’ বলেছেন (ইবনু মাজাহ হা/১৭৩)। মানাবী বলেন, এর কারণ হ’ল তারা ইবাদতে অগ্রগামী। কিন্তু অন্তরসমূহ বক্রতায় পূর্ণ। এরা মুসলমানদের কোন কবীরা গোনাহ করতে দেখলে তাকে ‘কাফের’ বলে ও তার রক্ত হালাল জ্ঞান করে। যেহেতু এরা আল্লাহ্র বান্দাদের প্রতি কুকুরের মত আগ্রাসী হয়, তাই তাদের কৃতকর্মের দরুণ জাহান্নামে প্রবেশকালে তারা কুকুরের মত আকৃতি লাভ করবে’ (ফায়যুল ক্বাদীর)। (২) তওবা ৫ : ‘অতঃপর নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিক্রান্ত হ’লে তোমরা মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর, পাকড়াও কর, অবরোধ কর এবং ওদের সন্ধানে প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, সালাত আদায় করে ও জাকাত দেয়, তাহলে ওদের রাস্তা ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (তওবা ৯/৫)। আয়াতটি বিদায় হজের আগের বছর নাজিল হয় এবং মুশরিকদের সাথে পূর্বেকার সকল চুক্তি বাতিল করা হয়, এর ফলে মুশরিকদের জন্য হজ চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয় এবং পরের বছর যাতে মুশরিকমুক্ত পরিবেশে রাসূল (সা.) হজ করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা হয়। এটি বিশেষ অবস্থায় একটি বিশেষ নির্দেশ মাত্র। কিন্তু তারা এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, ‘যেখানেই পাও’ এটি সাধারণ নির্দেশ। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের যেখানেই পাও না কেন তাদেরকে বধ কর, পাকড়াও কর হারাম শরিফ ব্যতীত (যুগে যুগে শয়তানের হামলা ৯২ পৃ.)। (৩) তওবা ২৯ : ‘তোমরা যুদ্ধ কর আহলে কিতাবদের মধ্যকার ঐসব লোকের বিরুদ্ধে, যারা আল্লাহ ও বিচার দিবসের উপর ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম করে না ও সত্য দ্বীন (ইসলাম) কবুল করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা বিনীত হয়ে করজোড়ে জিজিয়া প্রদান করে’ (তওবা ৯/২৯)। আয়াতটি ৯ম হিজরিতে রোমকদের বিরুদ্ধে তাবুক যুদ্ধে গমনের প্রাক্কালে নাজিল হয়। এটিও বিশেষ প্রেক্ষিতের নির্দেশনা। কিন্তু তারা এর ব্যাখ্যা করেছে, মদীনায় হিজরতের পরে আল্লাহ জিহাদের অনুমতি প্রদান করেন। পরে জিহাদ ও ক্বিতাল ফরজ করে দেন। নবী ও সাহাবীগণ আল্লাহ্র উক্ত ফরজ আদায়ের লক্ষ্যে আমরণ জিহাদে লিপ্ত ছিলেন। এই জিহাদের মাধ্যমেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়’ (ঐ, ৯৪ পৃ.)।
উক্ত আয়াতের পরেই তারা (৪) একটি হাদিস এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, আমি লোকদের সাথে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি, যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল। আর তারা সালাত কায়েম করে ও জাকাত আদায় করে। যখন তারা এগুলো করবে, তখন আমার পক্ষ হ’তে তাদের জান ও মাল নিরাপদ থাকবে ইসলামের হক ব্যতীত এবং তাদের (অন্তর সম্পর্কে) বিচারের ভার আল্লাহ্র উপর রইল’ (বু:মু: মিশকাত হা/১২)। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় তারা বলেছেন, আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘উক্বাতিলান্নাস’ অর্থাৎ ‘মানব সমাজের সাথে যুদ্ধ করার জন্য’। রাসূল (সা.) যেহেতু শেষ নবী, তাঁর পরে আর কোন নবী নেই, অতএব এই নির্দেশ কিয়ামত পর্যন্ত চলবে’ (ঐ, ৯৪ পৃ.)।
অথচ উক্ত হাদিসে ‘আন উক্বাতিলা’ (যেন পরস্পরে লড়াই করি) বলা হয়েছে, ‘আন আক্বতুলা’ (যেন আমি হত্যা করি) বলা হয়নি। ‘যুদ্ধ’ দু’পক্ষে হয়। কিন্তু ‘হত্যা’ এক পক্ষ থেকে হয়। যেটা চোরাগুপ্তা হামলার মাধ্যমে ক্বিতালপন্থীরা করে থাকে। অত্র হাদিসে বুঝানো হয়েছে যে, কাফির-মুশরিকরা যুদ্ধ করতে এলে তোমরাও যুদ্ধ করবে। কিংবা তাদের মধ্যকার যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করবে। কিন্তু নিরস্ত্র, নিরপরাধ বা দুর্বলদের বিরুদ্ধে নয়। কাফির পেলেই তাকে হত্যা করবে সেটাও নয়। তাছাড়া উক্ত হাদিসে ‘যারা কালেমার স্বীকৃতি দিবে, তাদের জান-মাল নিরাপদ থাকবে বলা হয়েছে, ইসলামের হক ব্যতীত এবং তাদের বিচারের ভার আল্লাহ্র উপর রইল’ বলা হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, আমাদের দায়িত্ব মানুষের বাহ্যিক আমল দেখা। কারু অন্তর ফেড়ে দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। অতএব সরকার যদি বাহ্যিকভাবে মুসলিম হয় এবং ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের সুযোগ কোথায়?
(৫) এরপর তারা ইমাম মাহদীর আগমন ও ঈসা (আ.) কর্তৃক দাজ্জাল নিধন সম্পর্কিত হাদিস এনেছেন এবং বলতে চেয়েছেন যে, কেবল জিহাদ ও ক্বিতালের মাধ্যমেই ইসলামের অগ্রযাত্রা সম্ভব। তাওহিদি দাওয়াতের মাধ্যমে নয়’ (ঐ, ৯৫ পৃ.)। অতঃপর আরেকটি হাদিস এনেছেন, (৬) ‘নিশ্চয়ই এই দ্বীন সর্বদা প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং মুসলমানদের একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত এর জন্য লড়াই করবে’ (মুসলিম হা/১৯২২)। তারা এর অনুবাদ করেছেন, ‘মুসলমানদের একদল কিয়ামত পর্যন্ত এ দ্বীনের জন্য যুদ্ধে রত থাকবে’ (ঐ, ৯৯ পৃ.)।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন