Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ০৩ মাঘ ১৪২৭, ০২ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

সুগন্ধি আগর আতরের রাজ্য সুজানগর

দেশের গাঁও পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য জয়

কামাল আতাতুর্ক মিসেল | প্রকাশের সময় : ৪ ডিসেম্বর, ২০২০, ১২:০৬ এএম

সুগন্ধি ভালোবাসেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ধর্মীয়-উৎসব থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও দেখা যায় আতর কিংবা সুগন্ধির ব্যবহার। পবিত্রতার আমেজ ছাড়াও বিভিন্ন সময় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয় এটি। চিরসবুজ এক বৃক্ষ আগর গাছ। আর এই গাছের নির্যাস থেকেই তৈরি করা হয় আতর বা সুগন্ধি। কৃত্রিম এবং প্রাকৃতিক দুই উপায়েই আগর থেকে সুগন্ধি জাতীয় আতর বা পারফিউম উৎপাদন করা হয়। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে আতর তৈরি হচ্ছে। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগর গ্রামটি আগর-আতরের জন্য বিখ্যাত। গ্রামটির ভেতরে ঢুকতে দু’পাশে চোখে পড়বে বাগানে সারি সারি আগর গাছ। গ্রামের পথ ধরে হাঁটলেই নাকে আসবে আগর-আতরের সুঘ্রাণ। হাওর উপজেলা জুড়ী থেকে সড়ক পথে বড়লেখার দিকে এগোলেই পথে রতুলীবাজার। ওই বাজারের উত্তর দিকে চলে যাওয়া পাকা সড়কটিই সুজানগরের প্রবেশ পথ। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়লো উঠানের এক পাশে বসে এক ব্যক্তি আগরগাছ ফালি ফালি করে কাটছে, আরেক পাশে চলছে কাটা ফালি বা টুকরাগুলো থেকে পেরেক খোলার কাজ। আর ঘরের বারান্দায় বসে নারীরা ফালি কেটে ছোট্ট ছোট্ট টুকরা করায় ব্যস্ত। খানিক দূরে কারখানায় শ্রমিকেরা সারি সারি যন্ত্রে আগর জ্বাল দিয়ে আতর তৈরি করছেন।
সুজানগর গ্রামে ঢুকে কথা হলো বেঙ্গল পারফিউমারিতে কর্মরত মোতালেবের সঙ্গে। তিনি জানালেন, মাসে গড়ে ২০০ তোলা (এক তোলায় ১১.৬৬ গ্রাম) আতর হয়। ভালো মানের প্রতি তোলা আতর বিক্রি হয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা দরে। মান একটু খারাপ হলে প্রতি তোলা আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পাওয়া যায়। এখানকার তৈরি আতর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। চাহিদা ভালো থাকায় প্রচুর পরিমাণে আগর কাঠও রফতানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব কাঠ ধূপের মতো জ্বালিয়ে সুগন্ধি তৈরি করে।
আবদুল মোতালেব আগর প্রস্তুতের বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, একটি আগরগাছ লাগানোর পর ছয়-সাত বছর বয়স হলেই পুরো গাছে এক ইঞ্চি পরপর পেরেক মারা হয়। তখন গাছ থেকে এক ধরনের রস বের হয়। পেরেকের চারপাশে সেই রস জমে কালো রং ধারণ করে। এভাবেই তিন থেকে পাঁচ বছর রাখা হয়। এরপর গাছ কাটা হয়। ছোট ফালি করে কাটার পর পেরেক খোলা হয়। তখন গাছের কালো ও সাদা অংশ আলাদা করা হয়। সেই কাঠ কারখানার হাউস কিংবা প্লাস্টিকের ড্রামে রাখা পানিতে ভেজানো হয়। এভাবে ফেলে রাখা হয় এক থেকে দেড় মাস। তারপর সেগুলো স্টিলের ডেকচির মধ্যে দিয়ে অনবরত জ্বাল দেয়া হয়। তখন পাতন পদ্ধতিতে ফোঁটায় ফোঁটায় আতর নির্দিষ্ট পাত্রে জমা হয়। তবে আগরগাছের কালো অংশ দিয়েই ভালো মানের আতর হয়। তবে সাদা অংশ দিয়েও হয়, তবে সেটি একটু নিম্নমানের আতর। এ ছাড়া আতর তৈরির প্রক্রিয়া শেষে ব্যবহৃত কাঠ গুঁড়ো করে বিক্রি হয়। এক কেজি ৫০ টাকা। এগুলো মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি হয়।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে আগর-আতরের ব্যাপক চাহিদা থাকায় সিলেটের মৌলভীবাজারের প্রায় সবকটি উপজেলায় ছোটবড় বাগানের পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙিনায় আগর চাষ করা হচ্ছে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৪০ থেকে ৫০ হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক। এক সময় আগর গাছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ক্ষতের রেজিনযুক্ত কাঠ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আগর তেল বা সুগন্ধি তৈরি করা হতো। বর্তমানে কৃত্রিমভাবে সংক্রমণ ঘটিয়ে ১২-১৫ বছর বয়সের আগর গাছ থেকে মূল্যবান আগর সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু বড়লেখায় বছরে আগরের নির্যাস (তৈল) উৎপাদিত হয় প্রায় দুই হাজার লিটার। এক লিটার কাঁচা আতরের স্থানীয় বাজার মূল্য ৬ লাখ টাকার বেশি। এই ২ হাজার লিটার নির্যাস বিদেশে বিক্রি করে প্রায় ১২০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে।
বাংলাদেশ আগর-আতর উৎপাদন ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আনছারুল হক বলেন, ঋণপত্র খুলে ৫ লিটার আতর পাঠাতে যে খরচ হয় ১০ তোলা পাঠাতেও একই খরচ। তবে কারখানাগুলো এত ছোট যে তাদের পক্ষে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে রফতানি সম্ভব নয়।
বেঙ্গল পারফিউমারির আবদুল মোতালেব বললেন, আমাদের কাছ থেকে ইউরোপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আতর নেয়। সুজানগরের আগর-আতর শিল্পকে ঘিরে সুগন্ধি কারখানা করা সম্ভব। এটি করা গেলে মূল্য সংযোজন বাড়বে। তবে সুগন্ধির বিশ্ববাজারের সম্ভাবনার কথাটি জানা গেল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গেøাবাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যানালিস্টিস এক প্রতিবেদনেও। এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বিশ্বে সুগন্ধির বাজার দাঁড়াবে চার হাজার কোটি ডলারের। দেশীয় মুদ্রায় যা কিনা ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার সমান।
আগর রফতানিকারকরা জানান, উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিক কৌশল সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবসহ বাজারজাতকরণে সরকারের সহযোগিতা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য নিয়ে দর-কষাকষি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশের রফতানি খাতে অবদান রাখার সুযোগ থাকলেও পারছে না আগর-আতর শিল্প। এ জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেয়া হলে ব্যক্তি উদ্যোগে আগর চাষ বাড়বে। শুধু তাই নয়, এ শিল্পে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আইনি বিভিন্ন জটিলতার কারণে আগর-আতর উৎপাদনকারীরা ফ্রান্স, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে অবৈধপথে বছরের পর বছর ধরে আগর-আতর রফতানি করছেন। এতে সরকারও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।



 

Show all comments
  • খোরশেদ আলম ৪ ডিসেম্বর, ২০২০, ১:৩১ এএম says : 0
    এটা খুবই ভালো খবর
    Total Reply(0) Reply
  • বুলবুল আহমেদ ৪ ডিসেম্বর, ২০২০, ২:৫৪ এএম says : 0
    এসব খবর নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আশা আলো
    Total Reply(0) Reply
  • মোহাম্মদ কাজী নুর আলম ৪ ডিসেম্বর, ২০২০, ৮:৪১ এএম says : 0
    সরকারের উচিত এই শিল্পে বিনিয়োগ করা। যাতে আরও প্রসারিত হয়।
    Total Reply(0) Reply
  • হক কথা ৪ ডিসেম্বর, ২০২০, ৮:৪২ এএম says : 0
    খবরটি পড়ে ভালো লাগলো। সরকারের কাছে দাবি থাকবে এখানে যেন সাহায্য সহযোগিতা করা হয়।
    Total Reply(0) Reply
  • বিবেক ৪ ডিসেম্বর, ২০২০, ৮:৪৩ এএম says : 0
    আলহামদুলিল্লাহ, এটা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো একটা খবর।
    Total Reply(0) Reply
  • INDIAN ATTAR ৫ ডিসেম্বর, ২০২০, ৯:২৬ এএম says : 0
    কেউ এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন আমার একজন ইনভেস্টর দরকার
    Total Reply(0) Reply
  • INDIAN ATTAR ৫ ডিসেম্বর, ২০২০, ৯:২৮ এএম says : 0
    কেউ এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন আমার একজন ইনভেস্টর দরকার lamisf arishta দিয়ে গুগোল করে আমার বিস্তারিত পাবেন
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আতর
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ