Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

সবুজের মেলা বনসাই মেলা

প্রকাশের সময় : ২৩ আগস্ট, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ফাহমিদা  আহমদ
মানুষের মনের জগৎকে সাজিয়ে তুলতে প্রকৃতির কোনো জুড়ি নেই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ছাড়াও মানুষের সৌন্দর্য চেতনা গঠনে বৃক্ষ, লতা, পুষ্পের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। জৈন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধ্যান মগ্নতার মধ্য দিয়ে বনসাইয়ের সৃষ্টি। এরা মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সেতু বন্ধন রচনায় আগ্রহী। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ তার পরিশ্রম মেধা কল্পনা অনুযায়ী শিল্পকলার চর্চা করে আসছে। একে কেন্দ্র করেই গাছকে মূল উপাদান ধরে বনসাই নামের জীবন্ত শিল্পকর্মের সৃষ্টি। এই শিল্পকর্মটিকে আমাদের দেশে  জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। সোসাইটির আয়োজিত প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে মানুষের নান্দনিক রুচিবোধ গড়ে উঠেছে।
ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা অনুপাতে যে পরিমাণ গাছ থাকার কথা তার সিকি ভাগের উপস্থিতি
থাকলেও মানুষের জন্য অন্তত সুবিধা হতো। তার ওপর ইন্ডাস্ট্রি বর্জ্যরে কারণে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি ও বাতাস। সব মিলিয়ে দিন দিন বাড়ছে ঢাকার বাতাসে সিসার পরিমাণ। নগরবিদদের ধারণা, সহসাই এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে না পারলে মহাসংকটে পড়বে ঢাকা শহর। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে পৃথিবীর দেশে দেশে নগর পরিকল্পনায় যোগ হচ্ছে প্রকৃতির অংশগ্রহণ। সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটি। বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির কয়েকটি প্রদর্শনী খুব কাছে থেকে দেখেছি। গাছ প্রস্তুত থেকে শুরু করে প্রতিটি গাছের পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ ও যতœ চলে সারা বছর ধরে। তিন দিনব্যাপী চলে এই প্রদর্শনীর আয়োজন। তাই বছর জুড়েই থাকে বনসাই শিল্পীদের কমবেশি ব্যস্ততা। এবার বর্ষাকালে অনুষ্ঠিত হলো বনসাই মেলা। বর্ষাকালে গাছপালার শাখা-প্রশাখা এমনিতেই পাতা পল্লবে ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠে। এমনই অপরূপ সৌন্দর্যের আধার নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো এবারের বনসাই মেলা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বনসাই শিল্পীদের সংখ্যা যেমন দিন দিন বাড়ছে তেমনি বনসাইয়ের প্রতি বাড়ছে সাধারণ মানুষের আগ্রহও। সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কের ২০ নম্বর বাড়িতে ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশনের অডিটরিয়ামে চার দিনব্যাপী ১৮তম বার্ষিক বনসাই প্রদর্শনী আয়োজন করেছে বনসাই সোসাইটি।
২১ আগস্ট পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনী উন্মুক্ত ছিল। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ও ভিজুয়াল আর্টিস্ট প্রফেসর রোকেয়া সুলতানা। এ ছাড়াও বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থপতি ও শিল্পী মুস্তফা খালিদ পলাশ ও গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা চৌধুরী। বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির সভাপতি নাজমা শফিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আনিসুল হকসহ অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনীতে দেশি ও বিদেশি প্রায় ১০০ প্রজাতির ২ হাজারেরও বেশি বনসাই স্থান পেয়েছে। তবে দেশীয় প্রজাতির গাছের সংখ্যাই অনেক বেশি। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ বট, পাকুর, নিশিন্দা, সুন্দরী, কাঞ্চন, কডরেল, তেঁতুল, হিজল, শেওড়া, কৃষ্ণচূড়া, কামিনী, ডুমুর, নারিকেল, নাগলিঙ্গম, বাগানবিলাস, প্রেমনা, বকুল ইত্যাদি। আর বিদেশি প্রজাতির গাছের মধ্যে রয়েছে ফাইকাস, চীনাবট,  পুকেন্টি, জুনিপার, ঝুমুর, সাফেলারা ইত্যাদি। বনসাই সোসাইটির ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিশেষ করে সিলেট, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের প্রায় শতাধিক সদস্য তাদের তৈরি করা বনসাই নিয়ে এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। আকারভেদে ৫০০ থেকে শুরু করে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বনসাইয়ের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরনো কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন বট ও ঘূর্ণিগাছের বনসাই ছিল সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সিলেটের কুলাউড়া থেকে এই প্রদর্শনীতে দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নিয়েছেন বনসাই শিল্পী সেলিনা পারভিন লাভলী। পাহাড় ঘেঁষা সবুজ বা বাগানের কোলে গড়ে তুলেছেন তার বনসাই রাজ্য। নিসর্গ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা সেলিনা পারভিন ভালোবাসেন প্রকৃতিকে। তার এই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই সূচনা তার বনসাই শিল্পের।
স্বামীর ঐকান্তিক আগ্রহ ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলেই এই শিল্পের অগ্রযাত্রার লক্ষ্যে তিনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন।
ছোট থেকে শুরু করে বড় পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির বনসাই রয়েছে তার কালেকশনে। বিভিন্ন প্রজাতির কতগুলো বনসাই নিয়ে তিনি এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। তার সৃষ্ট মাল্টা গাছের বনসাই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল। গত বছরের প্রথম স্থান অধিকারী সেলিনা পারভিন বলেন, বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের এই চরম দুঃসময়ে বনসাই হতে পারে প্রতিষেধক। ডিজিটাল যুগের যান্ত্রিকতায় আপনার ও আপনার সন্তানদের সুরক্ষায় আপনার ঘরের কোনায় অথবা ব্যালকনিতে গড়ে তুলতে পারেন একটি সবুজ উদ্যান।
যেখানে থাকতে পারে বিভিন্ন প্রজাতির বনসাই। নেট, ফেসবুক অথবা মোবাইলের পরিবর্তে সন্তানের হাতে তুলে দিন একটি সবুজ বৃক্ষ। তাকে পরিচর্যা করতে বলুন। বিভিন্ন প্রজাতির গাছের প্রতি তাকে আকৃষ্ট করে তুলুন। দেখুন না আপনার সন্তানের মনোজগতে কি ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন আপনি! শুধু শখ বা বিনোদনই নয়, এটি হতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তির উপায়ও। সঠিকভাবে বনসাই চাষ করে শখের পাশাপাশি হতে পারেন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। বাংলাদেশে বনসাই সোসাইটি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কোনো বিকল্প নেই।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ