Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৩ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

মরণ বাঁধ ফারাক্কা

প্রকাশের সময় : ২৭ আগস্ট, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মুনশী আবদুল মাননান
ভারতের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সে দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গঙ্গার ওপর নির্মিত বিতর্কিত ফারাক্কা বাঁধের সবকটি গেট খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খুলে দিয়ে পানি ছেড়ে দিলে বিহারের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তাদের মতে, বর্ষাকালে এমনিতেই অন্য সময়ের তুলনায় ফারাক্কায় বেশি গেট খোলা থাকে। ফারাক্কার গেট সংখ্যা ১০৪টি এর মধ্যে ১০০টি গেট খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে ১১ লাখ কিউসেক পানি সরে যাবে, যাতে বিহারের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইতোমধ্যে অন্তত ৯৫টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
একযোগে ফারাক্কার গেটগুলো খুলে দেয়ার কারণে বাংলাদেশের বন্যা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারত ফারাক্কার সব গেট খুলে দিচ্ছে, এই খবরে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জোর তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ করা হয়েছে, খবরের সত্যতা নিরূপণের জন্য মন্ত্রণালয় তৎপর হয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য যৌথ নদী কমিশনের এক সদস্যকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকে মনে হতে পারে, ভারত যে হঠাৎ করেই একযোগে ফারাক্কার সব গেট খুলে দিচ্ছে, সে কথা বাংলাদেশকে আগে জানায়নি। ভারতের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অবশ্য ভিন্ন কথা বলেছেন। তার মতে, গেটগুলো খুলে দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশকে আগেই নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছে এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোনটি সত্য? বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে, না কি হয়নি?
ফারাক্কায় সব গেট খুলে দেয়ার ফলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, সহজেই আন্দাজ করা যায়। ১১ লাখ কিউসেক অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করলে বন্যার তা-ব ও মানবিক বিপর্যয় চরমে উঠবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো প্রস্তুতি কি বাংলাদেশের আছে? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যা অবস্থা তাতে মনে হয়, কোনো প্রস্তুতিই তার নেই।
পদ্মার আর সেই আগের অবস্থা নেই। এককালের প্রমত্তা পদ্মা মরা গাঙে পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। তার বুকে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। গত শুকনো মৌসুমেও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পদ্মার কী করুণ হাল। গত ৪০ বছর ভারতের পানি ছিনতাইয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে পদ্মার পানি ধারণ ক্ষমতা অবিশ্বাস্য রকম হ্রাস পেয়েছে। এক সময় এই নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা ছিল ২৫ লাখ কিউসেক। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর শাখা নদীগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে।
এ মুহূর্তে দেশের বন্যা পরিস্থিতি রীতিমতো অস্থির অবস্থায় রয়েছে। উত্তর, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে এবারের বন্যার হানায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার সঙ্গে নদীভাঙনে হাজার হাজার বাড়িঘর, স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়েছে। লাখ লাখ একর জমির ফসল ধ্বংস বা নষ্ট হয়েছে। রাস্তাঘাটের অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে। মানবিক বিপর্যয়ের তো কোনো কথাই নেই। লাখ লাখ মানুষ সহায় সম্পদ হারিয়ে পথে এসে দাঁড়িয়েছে। এখনো পদ্মাসহ ছোট-বড় সব নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ভারী বর্ষণ হলে এবং উজান থেকে পানি নেমে এলে পুনরায় বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হতে পারে। এমতাবস্থায় ফারাক্কার সব গেট খুলে দেয়ার খবরে পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলোর তীরবর্তী মানুষ ব্যাপক শঙ্কা ও আতঙ্কের মধ্যে নিপতিত হয়েছে। ইনকিলাবের রাজশাহী প্রতিনিধি রেজাউল করিম রাজু জানিয়েছেন, পদ্মায় পানি বাড়ছে। যে হারে পানি বাড়ছে তাতে বিপদসীমা অতিক্রম করবে যে কোনো সময়। রাজশাহীর কাছে পদ্মার বিপদসীমা হলো ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। দু-এক দিনের মধ্যেই এই বিপদসীমা অতিক্রান্ত হতে পারে। ইতোমধ্যে রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের নিচের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। অনেকে বাঁধের উল্টো পাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। অতঃপর পানি রাশি ঠেলে দেয়া হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি নেমে আসবে। অন্য এক খবরে জানা গেছে, রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধও বিপন্ন হতে পারে। অথচ কয়েক মাস আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। পদ্মার বুকজুড়ে ছিল ধু ধু বালুচর। পদ্মার এই মুমূর্ষু হাল ও পানিশূন্যের কারণ ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারতের নির্বিচার পানি প্রত্যাহার। পদ্মার পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটা চুক্তি আছে বটে, তবে সেই চুক্তি মোতাবেক পানি বাংলাদেশ কোনো বছরই পায়নি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ১৫টি চক্রে বাংলাদেশ পানি কম পেয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৮৬৪ কিউসেক। ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার পর থেকে প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে শুকিয়ে মরা এবং বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে মরা বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যলিপিতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ এক মরণ ফাঁদ। এই বাঁধের যখন পরিকল্পনা করা হয় তখনই বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন পানি, প্রকৃতি, পরিবেশ, নদী প্রবাহ, নৌ-যোগাযোগ, অর্থনীতি, মানববসতি প্রভৃতির ওপর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ফেলবে এ বাঁধ। শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও। কিন্তু ভারত তখন বিশেষজ্ঞ অভিমতকে গ্রাহ্যে আনেনি। চিরবৈরী পাকিস্তানের পূর্বাংশ পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশকে জব্দ করার জন্য কিংবা দাবিয়ে রাখার জন্য ভারত তখন মরিয়া হয়ে এ বাঁধ প্রকল্প গ্রহণ করে। বাঁধের পরিকল্পনা করা হয় ১৯৫১ সালে। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬১ সালে এবং শেষ হয় ১৯৭০ সালে। বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ১৯৭৪ সালে। সেই থেকে এ পর্যন্ত এ বাঁধ বাংলাদেশে যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, তাতে বিশেষজ্ঞদের অভিমত সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের কতটা ক্ষতি হয়েছে এবং তার অর্থমূল্য কত হতে পারে তা নির্ণিত না হলেও অনেকেই মনে করেন, এত ক্ষতি হয়েছে যে, তা নির্ণয়যোগ্য নয়। প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, মানবিক কাজকর্ম ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর অপূরণযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে মরু ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার ঘটেছে। পানি ও নদী ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ভূমি গঠন ব্যাহত হয়েছে। ভূমির উর্বরাশক্তি কমে গেছে। কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। নৌপথ সঙ্কুচিত হয়েছে। নৌ-বাণিজ্য কমে গেছে। মৎস্য চাষ ও পশু পালন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও নদী ভাঙন ভয়ঙ্কর রূপ পরিগ্রহ করেছে। আবহাওয়ায় পরিবর্তন ঘটেছে। জীব ও প্রাণবৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে পড়েছে। গৃহচ্যুতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও ক্লেশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সেই শুরু থেকে বাংলাদেশের মানুষ সোচ্চার দাবি তুলেছে, ‘মরণ বাঁধ ফারাক্কা। ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও’। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে যখন ফারাক্কা লংমার্চ হয় তখন এটিই ছিল লাখ লাখ মানুষের কণ্ঠে প্রধান ধ্বনি। তখন অনেকেই ফারাক্কা লংমার্চকে ভিন্ন চোখে দেখছিলেন। তাদের মতে, এটা ছিল ‘অযৌক্তিক ভারত বিরোধিতা’, ‘পাকিস্তানি মানসিকতা’ ও ‘প্রহসন’। এখন প্রমাণিত হয়েছে তখন যে লংমার্চ হয়েছিল তা না ছিল অযৌক্তিক ভারত বিরোধিতা, না ছিল পাকিস্তানি মানসিকতা এবং না ছিল প্রহসন।
বিস্ময়কর ব্যাপার, তখন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেয়ার যে দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ এখন সেই দাবিই জানাচ্ছে ভারতের মানুষ। কারণ, ফারাক্কা বাঁধ শুধু বাংলাদেশের মানুষেরই অপরিমেয় ক্ষতির কারণ হয়নি, ভারতের মানুষেরও ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি জেলার লাখ লাখ মানুষকে পথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের কতটা ক্ষতি সাধিত হয়েছে তার পরিসংখ্যান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার দিতে পারবে হয়তো। দেড় দশক আগের এক তথ্যচিত্রে দেখা যায়, মালদহ জেলার কালিয়াচক ১, ২, ৩ নং ব্লক এবং মানিক ব্লকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মুর্শিদাবাদ জেলায় ৫০/৬০ হাজার একর জমি একইভাবে গঙ্গা গ্রাস করেছে। গঙ্গাতীরবর্তী এলাকার ৪০ হাজার পরিবার নিঃস্ব ভিখারীতে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পেশাচ্যুত হয়েছে। আমের ফলন, আখ ও তুঁত চাষ হ্রাস পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর পড়েছে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ফারাক্কার গেট বন্ধ থাকার কারণে উজানে গঙ্গা মাইলের পর মাইল নাব্য হারিয়েছে। পলি পড়ে এর বুক ভরাট হয়ে গেছে। অসংখ্য চর সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিগত দেড় দশকে সার্বিক পরিস্থিতির যে আরো অবনতি ঘটেছে তাতে সন্দেহের কারণ নেই।
বহুদিন ধরেই মালদহ-মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গা তীরবর্তী দুর্ভোগ ও বিপর্যয়কবলিত মানুষ ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা ক্ষতিপূরণ, ভূমি ও পুনর্বাসন দাবি করে আসছে। অব্যাহত বন্যা ও নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণেরও তারা দাবি জানিয়ে আসছে। বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের জন্যও ফারাক্কা বাঁধ বড় রকমের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পার্শ্ববর্তী বিহারও ফারাক্কা বাঁধের কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সেখানে চলমান বন্যায় ১০ লাখের বেশি মানুষ ও ২ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিহার রাজ্য সরকারের দাবি, ফারাক্কা বাঁধের কারণেই এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং প্রায় প্রতিবছরই রাজ্য বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা যদিও বলেছেন, ফারাক্কার সব গেট খুলে দিলে বিহারের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে তবে এটা সাময়িক সমাধান, স্থায়ী সমাধান নয়। বিহার রাজ্য সরকার এর স্থায়ী সমাধান চায়। চায় ফারাক্কা বাঁধ অবিলম্বে তুলে দেয়া হোক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার সম্প্রতি রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের আগে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গায় বিপুল পরিমাণ পলি জমেছে। আর এ কারণে প্রতিবছর বিহারে বন্যা হচ্ছে। এর একটা স্থায়ী সমাধান হলো ফারাক্কা বাঁধই তুলে দেয়া। তিনি আরও বলেছেন, আগে যেসব পলি নদীর প্রবাহে ভেসে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত এখন ফারাক্কার কারণে সেটাই নদীর বুকে জমা হয়ে বন্যা ডেকে আনছে। তাই আমি ১০ বছর ধরে বলে আসছি, এই পলি ব্যবস্থাপনা না করলে বিহার কিছুতেই বন্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে না। আমরা কোনো পয়সা চাই না, কিন্তু চাই কেন্দ্রীয় সরকার বা তাদের সংস্থাগুলো এসে দেখুক কীভাবে এই পলি সরানো যায়। এর একটা রাস্তা হতে পারে ফারাক্কা বাঁধটাই হটিয়ে দেয়া।
নাতিশ কুমারের এই বক্তব্যে ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করে এসেছেন, সেই বিশেষজ্ঞরা ও পরিবেশেবাদীরা এতে উজ্জীবিত হয়েছেন, জনগণ পর্যায়ে যে আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে, সেই আন্দোলন-সংগ্রামও অনুপ্রাণিত হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ সরিয়ে দেয়ার দাবি অতঃপর জোরদার হবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মহলবিশেষ অবশ্য ফারাক্কা বাঁধ সরিয়ে দেয়ার প্রশ্নে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। মহলটির মতে, এতদিন বাঁধটি থাকার কারণে এক ধরনের ইকোলজি তৈরি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে দেয়া হলে এতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। অনেকে মনে করছেন, বাঁধের অপসারণ পানীয় পানির সংকট সৃষ্টি করবে। ভাগীরথী ও হুগলি নদীতে পানিপ্রবাহ কমবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ফারাক্কা বাঁধ না থাকায় যে প্রতিক্রিয়া হবে, তা কি বাঁধ থাকার ফলে যে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার চেয়ে বেশি? মোটেই নয়। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে প্রতিবছর যে আর্থিক, পরিবেশগত ও মানবিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, তার কোনো তুলনাই হতে পারে না। বাঁধ থাকলে এই ক্ষয়ক্ষতি আরো বিপুল আকারে বছরের পর বছর ধরে হতে থাকবে। তাছাড়া যে উদ্দেশ্যের কথা বলে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, সে উদ্দেশ্যে সফল হয়নি। বলা হয়েছিল, কলকাতা বন্দর রক্ষা এবং ভাগীরথী ও হুগলি নদীর নাব্য বৃদ্ধির জন্যই এ বাঁধ। তখনই অবশ্য আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ ড. আর্থার টি ইপেন বলেছিলেন, গঙ্গার মিঠাপানি হুগলিতে প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরের সমস্যার সমাধান হবে না, বরং এতে মিঠাপানি ও চর পড়ার সমস্যা সৃষ্টি হবে। ভারতের বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। কারণ এতে ফারাক্কা ও তার আশেপাশের অঞ্চলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। তাদের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের ধ্বনি ‘মরণ বাঁধ ফারাক্কা ভেঙে দাও/ গুঁড়িয়ে দাও’, এখন ভারতের মানুষের ধ্বনিতেও পরিণত হয়েছে। এই ‘রাজনৈতিক বাঁধ’ দু’দেশের সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মধ্যে যে দুর্ভোগ, কষ্ট, বঞ্চনা ও বিপর্যয় ডেকে এনেছে তাতে এই বাঁধ রাখার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে থাকতে পারে না। দু’দেশের মানুষ যদি এই বাঁধের বিরুদ্ধে একট্টা হয়ে দাঁড়ায় তবে আশা করা যায়, একদিন বাঁধ সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে ভারত সরকার। সঙ্গতকারণেই বাংলাদেশ সরকারকেও এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। কারণ এ বাঁধের সবচেয়ে বড় শিকার বাংলাদেশ ও এ দেশের মানুষ।
খবর পাওয়া গেছে, ফারাক্কার গেট খুলে দেয়ার ফলে পদ্মা মহানন্দাসহ বিভিন্ন নদীতে দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যা দেখা দিয়েছে। জেলা সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সামনে কী পরিস্থিতি দেখা দেবে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচিত ভারতের ঠেলে দেয়া পানির সয়লাব ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া।



 

Show all comments
  • Kamal ২৭ আগস্ট, ২০১৬, ১১:৩০ পিএম says : 0
    ভারত তাঁর দেশের বন্যার পানির ভার সইতে না পেরে গজলডোভার সকল গেট খুলে দিয়েছে,ফারাক্কার ১১৭টির মধ্যে ৯৯টি গেট খুলে দিয়েছে ।যার ফলে বাংলাদেশের বিশাল অংশ আজ পানির নীচে।অথচ ভারত শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশকে এক ফোটা পানি দেয়না । সরকার ভারতকে বন্ধু দেশ বলে থাকে,এই কি বন্ধ্বত্বের নমুনা ? আজ বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতের পানি আগ্রাসনে মানবেতর জীবন যাপন করছে ! সরকার নাকি বানবাসীদের জন্য বরাদ্ধ দিয়েছে যার মাথাপিছু বরাদ্ধ মাত্র ২১ টাকা ! জনগণের সাথে কেন এ নির্মম পরিহাস? নিজ দেশের জনগণকে কেন কষ্টে রাখা? দরকার নাই মেট্ররেল আর উড়াল সেতুর---আগে মানুষকে বাচান। উন্নয়নের এমন জোয়ার আর চাইনা l সারা দেশে ভয়াবহ বন্যায় বানবাসী দুর্গত জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করছে।এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিত্তবান ও সামর্থ্যবানদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানাই l
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।