Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার ২১ জুলাই ২০১৯, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

মুমিনের উপমা খেজুর বৃক্ষের ন্যায়

প্রকাশের সময় : ২৮ আগস্ট, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ড. মুহাম্মদ সিদ্দিক

॥ এক ॥
‘মুসলিম’-এর হাদীস নং ২৯৯৯ : অর্থ-ইয়াহইয়া ইবনে আইয়্যূব, কুতাইবাহ ইবনে সাঈদ এবং আলী ইবনে হুজুর (রহ:) বর্ণনা করিয়াছেন...আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) বলেন, হুযুরে পাক (সা:) এরশাদ করিয়াছেন, বৃক্ষসমূহের মধ্যে এমন একটি বৃক্ষ আছে যাহার পাতা ঝরিয়া পড়ে না এবং তাহা হইল মুমিনদের উপমা। তোমরা আমাকে বলিতে পার সেটা কোন বৃক্ষ? তখন লোকজনের খেয়াল জঙ্গলের বৃক্ষসমূহের প্রতি ধাবিত হইল। আব্দুল্লাহ (রা:) বলেন, আমার মনে হইল, উহা খেজুর বৃক্ষ; কিন্তু তাহা প্রকাশ করিতে আমি সংকোচবোধক করিলাম। ছাহাবায়ে কেরাম বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা:)! আপনিই আমাদিগকে বৃক্ষটির নাম বলিয়া দিন। তখন তিনি বলিলেন, বৃক্ষটি হইল, খেজুর বৃক্ষ। আব্দুল্লাহ (রা:) বলেন, তারপর আমি আমার পিতাকে আমার মনে যে খেয়াল আসিয়াছিল তাহা বলিলাম। তিনি বলিলেন, তুমি যদি তখন তাহা প্রকাশ করিতে যে, উহা হইল খেজুর বৃক্ষ তাহা হইলে আমি অমুক অমুক বস্তু লাভ করার তুলনায়ও অধিক খুশী হইতাম।
হাদীস নং ৩০০০ : অর্থÑ আবুবকর ইবনে আবী শায়বাহ (রহ:) বর্ণনা করিয়াছেন... ইবনে ওমর (রা:) বলেন, (একদা) আমরা রাসূলে পাক (সা:)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। ঐ সময় তিনি বলিলেন, এমন একটি গাছ আছে যাহা মুসলমানের অনুরূপ। যাহার পাতা কখনও ঝরিয়া পড়ে না। গাছটির পরিচয় তোমরা আমাকে বলিতে পার কি? ইব্রাহীম ইবনে সুফিয়ান (রহ:) বলেন, সম্ভবত ইমাম মুসলিম (রহ:) বলিয়াছেন, “ওয়াতুতী উকুলাহা কুল্লা হীনিন”। যাহা প্রত্যেক মওছুমে ফল দেয়। তবে আমি ছাড়া অন্যান্যদের বর্ণনায়ও আমি পাইয়াছি, “ওয়ালা তুতী উকুলাহা কুল্লা হীনিন” অর্থাৎ “লা” ব্যতীত। ইবনে ওমর (রা:) বলেন, আমার মনে হইতে লাগিল যে, উহা খেজুর গাছ হইবে; কিন্তু তখন আমি দেখিলাম যে, আবুবকর এবং ওমর (রা:)-এর মত ব্যক্তিগণ কিছুই বলিতেছেন না। তাই আমি কোন কথা বলা পছন্দ করিলাম না। তবে ওমর (রা:) আমার এই কথা শুনিয়া বলিলেন, আহা! তুমি ইহা বলিলে আমার অমুক অমুক বস্তু লাভ করা হইতেও আমি বেশী খুশী হইতাম।
পরকালের জগতেও গাছ ও বাগিচা
গাছ-বাগিচা শুধু এই জগতেই আল্লাহ্র অবদান নয়। পরকালের জগতেও এগুলো রয়েছে। এমন কি বিষাক্ত গাছও রয়েছে দোজখের গভীরে। আমরা কিছু উদ্ধৃতি কুরআন হাদীস থেকে আনব।
“তারা (জান্নাতবাসীরা) থাকবে এক বাগানে যেখানে থাকবে কণ্টকহীন কুল গাছ, কাঁদি কাঁদি কলা, বিস্তুত ছায়া, উপচে পড়া পানি ও পর্যাপ্ত ফলমুল যা শেষ হবে না ও যা নিষিদ্ধ হবে না।” (৫৬ ছুরা ওয়াকি’আহ: ২৮-৩৩ আয়াত)
“যদি সে (মৃত ব্যক্তি) নৈকট্য প্রাপ্তদের একজন হয়, তার জন্য রয়েছে আরাম, উত্তর জীবনের উপকরণ ও জান্নাতুল নাঈম (সুখকর উদ্যান)। (৫৬ ছুরা ওয়াকি’আহ : ৮৮-৮৯ আয়াত)।
“যারা বিশ্বাসী ও সৎ কর্মপরায়ণ তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাসে জন্য পথনির্দেশ করবেন জান্নাতুন নাঈমে (সুখকর উদ্যানে) যার পাদদেশে নদী বইবে (১০ ছুরা ইউনুস : ৯ আয়াত)
“তাদের (বিশুদ্ধ চিত্ত বান্দাহ) জন্য আছে নির্ধারিত জীবনের উপকরণ ফলমুল ও তারা সম্মানিত হবে, সুখকর উদ্যানে (জান্নাতুন নাঈমে) তারা মুখোমুখি হয়ে আসনে বসবে।” (৩৭ ছুরা ছাফফাত : ৪০-৪৪ আয়াত)।
“অপরদিকে যারা দুনিয়ার ঈমান এনেছে এবং যারা সৎকাজ করেছে তাদেরকে এমন বাগিচায় প্রবেশ করানো হবে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে। সেখানে তারা তাদের রবের অনুমতিক্রমে চিরকাল বসবাস করবে। সেখানে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানো হবে শান্তি ও নিরাপত্তার মোবারকবাদ সহকারে। তুমি কি দেখছো না আল্লাহ কালেমা তাইয়েবার উপমা দিয়েছেন কোন জিনিসের সাহায্যে? এর উপমা হচ্ছে যেমন একটি ভালো জাতের গাছ, যার শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে পৌঁছে গেছে। প্রতি মুহূর্তে নিজের রবের হুকুমে সে ফলদান করে। এ উপমা আল্লাহ এ জন্য দেন যাতে লোকেরা এর সাহায্যে শিক্ষা লাভ করতে পারে। অন্যদিকে অসৎ বাক্যের উপমা হচ্ছে একটি মন্দ গাছ, যাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে দূরে নিক্ষেপ করা হয়, যার কোন স্থায়িত্ব নেই।” (১৪ ছুরা ইব্রাহীম : ২৩-২৬ আয়াত)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, বেহেশতে এমন একটি বিরাট গাছ আছে, যদি কোনো সওয়ারী তার ছায়ায় একশত বছরও পরিভ্রমণ করে, তবুও তার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। (বোখারী, মুসলিম ও মেশকাত)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, বেহেশতের সব গাছেরই কা- হবে স্বর্ণের। (তিরমিযী ও মেশকাত)।
কুরআন মজিদে এক বিশেষ কুল গাছ, বরই গাছ-এর কথা বলা হয়েছে এভাবে :
“পুনরায় আর একবার সে (নবী সা:) তাকে (জিব্রাইল আ:) সিদরাতুল মুনতাহার (শেষ প্রান্তবর্তী কুল গাছের) কাছে দেখেছে যার সন্নিকটেই জান্নাতুল মা’ওয়া (বাসোদ্যান নামে একটা বিশেষ জান্নাত শহীদদের জন্য) অবস্থিত। সে সময় সিদরাকে আচ্ছাদিত করছিল এক আচ্ছাদনকারী জিনিস (আলোকোচ্ছটা)। (৫৩ ছুরা আল নাজম : ১৩-১৬ আয়াত)।
ব্যাখ্যায় এসেছে : “আরবীতে ‘সিদরা’ বলা হয় বরই গাছকে আর ‘মুনতাহা’ অর্থ শেষ প্রান্ত সুতরাং ‘সিদরাতুল মুনতাহা’-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, শেষ প্রান্তে অবস্থিত বরই-গাছ। আল্লামা আলূসী ‘রুহুল মাআনী’তে এর ব্যাখা করেছেন : ‘এ পর্যন্ত গিয়ে সর্ব জ্ঞানীর জ্ঞান শেষ হয়ে যায়। এর পরে যা আছে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।’ ইবনে জারীর তাঁর তাফসীরে এবং ইবনে আসীরও অনুরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। বস্তুজগতের শেষ প্রান্তে অবস্থিত সে কুল বৃক্ষ কেমন এবং তার প্রকৃতি ও পরিচয় কি তা জানা আমাদের জন্য কঠিন। এটা আল্লাহ তা’আলার সৃষ্ট মহাবিশ্বের এমন রহস্যাবৃত বিষয় যেখানে আমাদের বোধ ও উপলদ্ধি পৌঁছতে অক্ষম। যাই হোক, সেটা হয়তো এমন কোন জিনিস যা বুঝানোর মানুষের ভাষায় ‘সিদরাহ’ শব্দের চেয়ে অধিক উপযুক্ত শব্দ আল্লাহ তা’আলা আর কোন কিছুতে মনে করেননি।”
হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা:) বলেন, আমি নবী করীশ (সা:)কে বলতে শুনেছি এবং যখন তাঁর সঙ্গে সিদরাতুল মুনতাহা’র আলোচনা করা হল তিনি বললেন, তার শাখার ছায়ায় দ্রুতগামী সওয়ারী একশত বছর ভ্রমণ করতে পারবে অথবা বলেছেন : একশত সওয়ারী তার ছায়ায় আশ্রয় নিতে পারবে। এ দু’বাক্যের মধ্যে রাসূল (সা:) কোন্ বাক্যটি বলেছেন এতে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে। তা সোনার পতঙ্গ দিয়ে বেষ্টিত থাকবে। তার ফল মটকার ন্যায় বৃহদাকারের হবে। (তিরমিযী বলেছে, হাদীসটি গরীব। এ হাদীস মেশকাতেও রয়েছে)।
কুরআন বলে : “যাককুম গাছ হবে গোনাহগারদের খাদ্য। তেলের তলানির মত। পেটের মধ্যে এমনভাবে উথলাতে থাকবে যেমন ফুটন্ত পানি উথলায়। পাকড়াও করো একে এবং টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাও জাহান্নামের মধ্যখানে। তারপর ঢেলে দাও তার মাথার ওপর ফুটন্ত পানির আযাব। এখন এর মজা চাখো। তুমি বড় সম্মানী ব্যক্তি কিনা, তাই। এটা সেই জিনিস যারা আসার ব্যাপারে তোমরা সন্দেহ পোষণ করতে” (৪৪ ছুরা দুখান : ৪৩-৪৫ আয়াত)।
“বলো, এ ভোজ ভালো, না যাক্কুম গাছ? আমি এ গাছটিকে জালেমদের জন্য ফিতনায় পরিণত করে দিয়েছি। সেটি একটি গাছ, যা বের হয় জাহান্নামের তলদেশ থেকে। তার ফুলের কলিগুলো যেন শয়তানদের মুন্ডু। জাহান্নামের অধিবাসীরা তা খাবে এবং তা দিয়ে পেট ভরবে।” (৩৭ ছুরা আস সাফফাত : ৬২-৬৬ আয়াত)।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন