Inqilab Logo

সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮, ১৯ সফর ১৪৪৩ হিজরী

সাত বছরে খুন ৩৮৩

পাহাড়ি তিন জেলায় সশস্ত্র তৎপরতা নেপথ্যে চাঁদাবাজি

স্টাফ রিপোর্টার, রাঙামাটি : | প্রকাশের সময় : ২ মার্চ, ২০২১, ১২:০১ এএম

চাঁদাবাজি করে অর্থের পাহাড় গড়তে মরিয়া আঞ্চলিক চারটি সংগঠন। টাকার অংকে এই চাঁদাবাজির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা। তাই আধিপত্য বিস্তারে অবৈধ অস্ত্র মজুদ করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এতে পাহাড়ে ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠছে সশস্ত্র অপতৎপরতা। এই চার সংগঠনের বিবাদমান সংঘাতে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার, মতের ভিন্নতা আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন-খারাবি ও অপহরণসহ নানান অপতৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে এসব সংগঠন। আবার পাল্টা প্রতিশোধ নিতেও খুন করা হচ্ছে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের। চার সংগঠনের সশস্ত্র সংঘাতে তাদের নিজেদের নেতাকর্মী-সমর্থক, জনপ্রতিনিধি, সাধারণ মানুষ, রাজনীতিক এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও খুনের শিকার হচ্ছেন।
নিজেদের নিয়ন্ত্রণে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় যেকোন সময়েই প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের হত্যা করা মামুলি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। নিরাপত্তার অভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দুই জেলার পর্যটন ব্যবসার খাতেও।
অবশ্য এসব হত্যাকান্ডে নিয়ম করে আঞ্চলিক দলগুলো পরস্পরকে দোষারোপ আর দায় অস্বীকার করে চলছে। আর এখন পর্যন্ত কোন হত্যাকান্ডেরই বিচার না পাওয়ায় মামলা দায়ের করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন স্বজনরাও। তবে এই অশুভ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ চান পাহাড়ের মানুষ। পুলিশ বলছে, শুধু সাজা দিয়ে খুনোখুনি হবেনা।
অভিযোগ আছে, পাহাড়ে উন্নয়ন প্রকল্প, ঠিকাদার, কাঠ-বাঁশ ব্যবসা, পরিবহন, ব্যবসায়ি, চাকরিজীবী, চাষাবাদ-ফসল, পোষাপ্রাণি বিক্রি, চোরাকারবারী, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক, অস্ত্রব্যবসাসহ নানান উৎস থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চাঁদাবাজি করে আসছে আঞ্চলিক দলগুলো। যদিও এসব অভিযোগ স্বীকার করেনা কোন সংগঠনই।
পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায় আর চুক্তির পূর্ণবাস্তবায়নের দৃশ্যমান দাবির আড়ালে এখন সক্রিয় চারটি আঞ্চলিক সংগঠন সশস্ত্র তৎপরতার লিপ্ত। প্রধান দুই সংগঠন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও প্রসীত খীষার ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)র এবং সংস্কারপন্থী অপর দুই সংগঠন জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দুটি আলাদা ‘জোট’ করে সংঘাতে জড়িয়ে আছে। আঞ্চলিক দলগুলোর সংঘাতে ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত গত ৭ বছরে পাহাড়ি তিন জেলায় খুন হয়েছেন ৩৮৩ জন। এরমধ্যে ২৬৩ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির আর ১২০ জন বাঙালি। এছাড়া অপহরণের শিকার হওয়া ৫৪০ জনের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ৩৭১ জন ও বাঙালি ১৬৯ জন।
চাঁদাবাজিও হচ্ছে বছরে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা। গেল এক বছরেই খুন হয়েছেন ২৬ জন। এসময়ে সাজেক ও রাজস্থলীতে সেনাটহলে পৃথক দুই হামলার ঘটনায় রাজস্থলীতে এক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাঘাইছড়িতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) সরকারি কার্যালয়ে ঢুকে ইউপি সদস্য জেএসএস সংস্কার নেতা সমর বিজয় চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসিরা।
শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, কোন মৃত্যুই কাম্য হতে পারে না। পাহাড়ের মানুষ শান্তি চায়। চাঁদাবাজির কথা সবাই জানে। এই চাঁদাবাজি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, সন্তু লারমা নিজেই চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। ১৯৯৮ সালে তার দল অস্ত্র জমা দেয়ার পরও পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র থাকে কী করে?। এখন চারটি সশস্ত্র আঞ্চলিক দলের অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিতে অস্থির পার্বত্য চট্টগ্রাম।
পাহাড়ে যৌথবাহিনীর অভিযান দিতে হবে। খাগড়াছড়ি সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী বলেন, পাহাড়ের অর্থই অনর্থের মূল। নানান উৎস থেকে চাঁদাবাজি করে অর্থের পাহাড় গড়তে মরিয়া আঞ্চলিক দলগুলো। তাই আধিপত্য বিস্তারে অবৈধ অস্ত্র মজুদ করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পাহাড়ে চিরুনি অভিযান ও প্রতিটি হত্যাকান্ডের বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে দোষিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, পাহাড়ে চাঁদাবাজির বিষয়টি সবাই জানলেও কেউ লিখিত অভিযোগ করেনা। অবিশ্বাস, দ্বন্ধ, আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে খুনোখুনি হচ্ছে। সম্প্রীতির মাধ্যমে শান্তি ফিরতে পারে। এজন্য সামাজিক প্রতিশ্রুতি দরকার। শুধু সাজা দিয়ে হবেনা’। ‘বিশেষ ভূ-প্রকৃতি, দূর্গমতা ও পুলিশের পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকার কারণে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় নেয়া যায় না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: চাঁদাবাজি


আরও
আরও পড়ুন