Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ০১ ব্শৈাখ ১৪২৮, ০১ রমজান ১৪৪২ হিজরী

দাখিলের উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুপারিশ নিয়ে যা বলছেন মাদরাসা শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৭ মার্চ, ২০২১, ৪:৩৩ পিএম

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষার বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের উত্তরপত্র মাদরাসা শিক্ষকের বাইরে অন্য ধারার শিক্ষকদের মাধ্যমে মূল্যায়নের পরামর্শ করেছে একটি সংসদীয় কমিটি।

কমিটির একজন সদস্য বলছেন, মাদরাসার শিক্ষকদের মধ্যে এসব বিষয়ে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক কম এবং অনেক শিক্ষকের মধ্যে অতিরিক্ত নম্বর দেয়ার প্রবণতা থাকায় শিক্ষার্থীদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছেনা বলেই এমন সুপারিশ করেছেন তারা। তবে মাদরাসা শিক্ষকরা বলছেন, মাদরাসাগুলোতে এখন আর এসব বিষয়ে যোগ্য শিক্ষকের সঙ্কট নেই। অন্যদিকে নিয়মানুযায়ী সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

দাখিলে কী পড়ানো হয়, শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি কি: বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দাখিল হলো এসএসসির সমমানের এবং দাখিল মাদরাসাগুলোতে প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। প্রধানত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোরআন ও হাদিস শিক্ষার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানেও বাংলা, অংক, ইংরেজি ও বাংলাদেশের বিশ্ব পরিচয়ের মতো বিষয়গুলো পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।

আর দাখিল মাদরাসা পরিচালনার জন্য মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের যেমন অনুমোদন দরকার তেমনি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকারের নিবন্ধিত শিক্ষকের তালিকা থেকেই শিক্ষক নিয়োগ করতে হয়। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের হিসেবে এখন দেশে অনুমোদিত দাখিল মাদরাসার সংখ্যা ছয় হাজার ৫৯৩টি। এছাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদরাসার (প্রথম থেকে ৫ম শ্রেণি) সংখ্যা তিন হাজার ৪৩৩টি, আলিম মাদরাসার (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী) সংখ্যা এক হাজার ৫৫৮টি। ফাজিল (ডিগ্রি বা স্নাতক) ও কামিল মাদরাসার (মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর) ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।

তবে এর বাইরেও অসংখ্য কওমি মাদরাসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো দেশ জুড়ে। এগুলো নুরানি মক্তব, ফোরকানিয়া, কারিয়ানা কিংবা হাফেজি মাদরাসা হিসেবে পরিচিত।

গত বৃহস্পতিবার সংসদীয় কমিটির সভায় দাখিল পরীক্ষার বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের উত্তরপত্র মাদরাসার শিক্ষকদের বাদ দিয়ে অন্য ধারার শিক্ষকদের দিয়ে মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টি আলোচনায় এসেছে কারণ দেখা যাচ্ছে দাখিলে এসব বিষয়ে ভালো করা অনেক শিক্ষার্থী পরে এসব বিষয়ে ভালো করছেনা। অর্থাৎ তাদের মধ্যে দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে।

কমিটির একজন মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, অনেক সংসদ সদস্যই এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সে কারণে আলোচনা হয়েছে। মনে হচ্ছে একই ধারার শিক্ষকরা সবাই ঠিকমত শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র দেখতে পারছেন না। দাখিল পাশ করেই উচ্চ শিক্ষার দিকে যায় শিক্ষার্থীরা এবং পরবর্তীতে চাকরির জন্য অনেক পরীক্ষায় তাদের অংশ নিতে হয়। তিনি আরো বলেন, এখানে সঠিক মূল্যায়ন হলে পরে আর তাদের সমস্যায় পড়তে হবে না বলেই আমরা চাই তারা এসব বিষয়ে যথাযথ যোগ্যতা অর্জন করুক এবং সেভাবেই মূল্যায়ন হোক। কিন্তু এসব বিষয়ে যোগ্য শিক্ষকেরও সংকট আছে। আবার অনেকের মধ্যে অতিরিক্ত নাম্বার দেয়ার প্রবণতাও আছে। অন্য ধারার শিক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন হলে এসব সমস্যা কেটে যাবে বলে মনে করেছে সংসদীয় কমিটি।

মাদরাসা শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়া : তবে মাদরাসা শিক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, শিক্ষক নিয়ে সঙ্কট গত কয়েক বছরে কেটে যাওয়ায় এসব বিষয়ের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য মাদরাসা শিক্ষকরাই যথেষ্ট। নোয়াখালীর হাতিয়ার হাজী ফাজিল আহমদ দাখিল মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বিএসসি কিংবা এমএসসি পাশ করা শিক্ষকরা অংক বা ইংরেজির মতো বিষয়গুলো পড়ান এখন। এ বছর করোনার মধ্যেও আমরা অংক ও ইংরেজি বিষয়ে আলাদা করেও পড়ানোর ব্যবস্থা করেছি শিক্ষার্থীদের। এখন শিক্ষকরাও মানসম্পন্ন। তাই অন্য ধারার শিক্ষকদের দিয়ে খাতা মূল্যায়নের আর দরকার আছে বলে মনে হয় না।

হাতিয়ার এ মাদরাসাটিতে প্রায় ১২০০ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে যার মধ্যে ৯০০ নারী শিক্ষার্থী। মাদরাসাটিতে ভোকেশনাল কোর্সও খোলা হয়েছে যাতে ড্রেস মেকিং ও জেনারেল ইলেকট্রিকাল সম্পর্কে পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লা সদর উপজেলার রঘুরামপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার প্রধান শিক্ষক অলি আহমদ বলছেন, মাদরাসা শিক্ষার একটা স্বকীয়তা আছে সেটা বিবেচনায় নিয়েই চিন্তা করা দরকার। এখন অনেক ভালো মানের শিক্ষক মাদরাসাগুলোতে বাংলা, ইংরেজি ও অংক পড়ান। আমাদের মাদরাসা থেকে পাশ করে অনেক শিক্ষার্থী এসব বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন ও নিচ্ছেন। সরকারি চাকরিও করছে অনেকে। তিনি বলেন, হয়তো হাতে গোনা কিছু শিক্ষক নিয়ে সমস্যা হতে পারে। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সংসদীয় কমিটির উদ্বেগের বিষয়টি বোঝা যায়। কিন্তু এখন তো প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিকের মতোই দাখিলের শিক্ষকদের সরকারি নিবন্ধন পরীক্ষায় পাশ করে নিবন্ধিত হয়ে চাকরির আবেদন করতে হয়।

বিশেষজ্ঞ মতামত: মাদরাসা বিষয়ে অভিজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন বলেন, মাদরাসায় বাংলা, অংক ও ইংরেজি যারা পড়ান তারা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা। তারা কিন্তু মাদরাসায় পড়া নন। কোনো কোনো মাদরাসায় হয়তো সুনির্দিষ্ট কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু ঢালাও ভাবে অন্য ধারার শিক্ষকদের দিয়ে এসব বিষয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়নের চিন্তা করলে সেটি নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি করবে। কারণ, এসব শিক্ষকরা সাধারণ শিক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত। এগুলো অপ্রয়োজনীয় চিন্তা। বরং ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করে অধিকতর যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করাটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সূত্র: বিবিসি বাংলা।



 

Show all comments
  • মোঃ দুলাল মিয়া ৭ মার্চ, ২০২১, ৯:৪০ পিএম says : 0
    এই সমস্ত কিছু সরকারের চালাকি এরা বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে ইসলামকে দুরে রাখার জন্য। এইটা কিছুতেই ঠিক হবে না ।মাদ্রাসায় যারা শিক্ষকতা করে তাহারা ইউনিভার্সিটি লেখা পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষক হিসাবে শিক্ষকতা করেন। এরাতে আর সংসদ সদসদের মতে সিনেমায় কাজ করে ।অথবা রাস্তায় গানবাজনা করে শিক্ষক হয় নাই। বিষয়টি একেবারেই হাস্যকর।
    Total Reply(0) Reply
  • Zhc ৮ মার্চ, ২০২১, ১২:০৩ এএম says : 0
    হানিফ সাহেবের কথার সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাই যে, চাকরির জন্য যারা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করে তাদের তো আর চাকরি হয় না, চাকরি হয় পরীক্ষায় যারা ফেলা করে তাদের। এটাই এখন দেশের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই ইন্টারভিউতে ফেল করা লোকদের চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হলে তারা পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করবে কোন যোগ্যতায়? শুধু শুধু মাদ্রাসার শিক্ষকদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। দুর্নীতির মাধ্যমে যারা যোগ্য লোকদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের চাকরিতে নিয়োগ দেয় প্রথমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মাদরাসা


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ