Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০ চৈত্র ১৪২৭, ২৯ শাবান ১৪৪২ হিজরী

ইসলামে নারীর অধিকার

ইসমাইল মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ৮ মার্চ, ২০২১, ১২:০১ এএম

মানব সমাজের অবিচ্ছেদ ও অপরিহার্য অংশ হচ্ছে নারী ও পুরুষ। কবিতার ভাষায় ‘পৃথিবীতে যা কিছু চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী-অর্ধেক তার নর’। পৃথিবীতে পুরুষরা নারীর এবং নারীরা পুরুষদের মুখাপেক্ষী। তাই একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি দিয়ে মানব সমাজ কোনভাবেই পূর্ণত্ব লাভ করতে পারবে না। এ কারণেই নারী-পুরুষের সমানভাবে মূল্যায়ন ও সুষম উন্নয়ন সমাজ প্রগতির এক অনিবার্য পূর্বশর্ত। নারী ব্যতিত পুরুষ সমাজ বা পুরুষ ব্যতিত নারী সমাজ গড়ে উঠলে পৃথিবী সৃষ্টির পরই ধ্বংস হয়ে যেত। তাই নারীকে উপেক্ষা করে সমাজ উন্নয়ন কল্পনাই করা যায় না। তারপরও সেই আদিকাল থেকেই নারীরা ঘরে-বাইরে নানাভাবে নিযাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত ও নিষ্পেষিত হয়ে আসছে। বর্তমান সভ্য সমাজেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। অথচ ইসলামের মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআন শরীফে ‘নিসা’ অর্থাৎ ‘মহিলা’ শব্দটি ৫৭ বার এবং ‘ইমরাআহ’ অর্থাৎ ‘নারী’ শব্দটির ২৬ বার উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ‘নিসা’ তথা ‘মহিলা’ শিরোনামে নারীর অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত একটি আলাদা সূরাও রয়েছে। এ ছাড়া পবিত্র কোরআন শরীফের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও তাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। দিয়েছে নারীর জান-মালের নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সম্মান।

আইয়ামে জাহেলিয়াতে নারীদেরকে সামাজিক মর্যাদা দেয়া তো দূরের কথা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত ছিলো না। কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণের কথা শুনামাত্র সে সময়ে পিতাদের মুখ কালো হয়ে যেতো। তাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার জন্য সকলে আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে উঠতো। কন্যা সন্তান জন্মের সাথে সাথে তাকে মাটিতে জীবন্ত পুতে ফেলাকেই সে সময়ে নিজেদের জন্য সম্মান, মর্যাদা ও পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো। জাহেলী যুগের সেই সময়কার ভয়াবহ এই অবস্থার কথা তুলে ধরে পবিত্র কোরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, সে দুঃখে সে কওমের থেকে আত্মগোপন করে। আপমান সত্তে¡ও কি একে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, তারা যা ফয়সালা করে, তা কতই না মন্দ!’ সুরা নাহল: আয়ত ৫৮, ৫৯।

পবিত্র ধর্ম ইসলাম নারীকে মা, কন্যা, বোন, স্ত্রী হিসেবে পৃথক পৃথক মর্যাদা আর সম্মানের আসনে বসিয়েছে। ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ ‘মা’ হিসেবে নারীর সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে। মা হিসেবে নারীর সম্মান ও মর্যাদার বিষয়ে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘মায়ের পদতলে (পায়ের তলায়) সন্তানের বেহেশত’। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার এক লোক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দরবারে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি অধিকারী কে? মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘তোমার মা’। ওই লোক দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন ‘তোমার মা’। ওই লোক আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? এবারও তিনি উত্তর দিলেন ‘তোমার মা’। (বুখারি)।

হজরত ওয়াইস করনি (রা.) মহানবীর জমানায় প্রিয় নবীর সাহাবি হতে পারেননি শুধুমাত্র মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারনে। মায়ের সেবা চলমান অবস্থায় একবার ওয়াইস করনি (রা.) প্রিয় হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এঁর সাথে দেখা করার ইচ্ছে পোষণ করে খবর পাঠান। তিনি নবীজির কাছে খবর পাঠান তিনি নবীজির সাথে দেখা না করে থাকতে পারছেন না আবার মা অসুস্থ থাকায় দেখাও করতে পারছেন না। এ অবস্থায় করণীয় কি? মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) হজরত ওয়াইস করনি (রা.)-কে উত্তর পাঠালেন, ‘আমার কাছে আসতে হবে না। আমার সঙ্গে সাক্ষাতের চেয়ে তোমার মায়ের খেদমত করা অনেক বেশি জরুরি।’ নবীজি (সা.) তাঁর গায়ের একটি জুব্বা মোবারক হজরত ওয়াইস করনি (রা.)-এঁর কাছে পৌঁছানোর জন্য হজরত ওমর (রা.)-এঁর কাছে রেখে যান। জুব্বাটি রাখার সময় হজরত মোহাম্মদ (সা.) হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘মায়ের সেবা করার কারণে সে আমার কাছে আসতে পারেনি। আমার ইন্তেকালের পরে তাকে আমার এই জুব্বাটি উপহার দিয়ে ওয়াইস করনির কাছ থেকে তুমি দোয়া নিয়ো।’

কন্যা হিসেবে ইসলাম কিভাবে নারীকে সম্মান দিয়েছে সে বিষয়ে আলোকপাত করে দেখা যায়, ‘আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান আছে, সে তাদেরকে আদব শিক্ষা দিয়েছে এবং বিবাহ দিয়েছে এবং তাদের সাথে সদাচরন করেছে, তার জন্য রয়েছে জান্নাত।” (সুনানে আবু দাউদ)। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মেয়েশিশু বরকত ও কল্যাণের প্রতীক। যে ব্যক্তির তিনটি, দুটি বা একটি কন্যাসন্তান থাকবে; আর সে ব্যক্তি যদি তার কন্যাসন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত ও সুপাত্রস্থ করেন তবে তার জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যাবে।’ মহানবী (সা.) ঘোষণা করেন, ‘যার রয়েছে কন্যাসন্তান, সে যদি তাকে অবজ্ঞা ও অবহেলা না করে এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য না দেয়; আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’

স্ত্রী হিসেবে নারীর গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআন শরীফে বর্ণিত আছে নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। ‘তারা তোমাদের আবরণস্বরূপ আর তোমরা তাদের আবরণ।’ (সূরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণ করো।’ (সূরা-৪ নিসা, আয়াত: ১৯)। ‘নারীদের ওপর যেমন অধিকার রয়েছে পুরুষের, তেমনি রয়েছে পুরুষের ওপর নারীর অধিকার।’ (সূরা-২ বাকারা, আয়াত ২২৮)। ‘তোমরা তাদের (নারীদের) সঙ্গে উত্তম আচরণ করো ও উত্তম আচরণ করার শিক্ষা দাও।’ (সূরা-৪ নিসা, আয়াত: ১৯)। স্ত্রীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যের পরিচায়ক।’ (মুসলিম শরিফ)। তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি)।

বোন হিসেবে নারীর সম্মান নিয়ে হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘কারও যদি কন্যাসন্তান ও পুত্রসন্তান থাকে আর তিনি যদি সন্তানদের জন্য কোনো কিছু নিয়ে আসেন, তবে প্রথমে তা মেয়ের হাতে দেবেন এবং মেয়ে বেছে নিয়ে তারপর তার ভাইকে দেবে।’ হাদিস শরিফে আছে, বোনকে সেবাযত্নকরলে আল্লাহ প্রাচুর্য দান করেন।
এছাড়া বিধবা নারীর অধিকার ও সম্মান নিয়ে ইসলামের রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। বিধাব নারীর অধিকার ও সম্মান নিয়ে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যিনি বা যারা বিধবা নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়, তারা যেন আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং নিরলস নামাজি ও সদা রোজা পালনকারী। (বুখারি ও মুসলিম)।

নারীরা ‘মা’ হিসেবে সন্তানকে গর্ভে ধারণ, লালন-পালনের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। তারা (নারী) সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে আজ পর্যন্ত। কিন্তু নারীরা সব সময়ই সর্বক্ষেত্রে বঞ্চনা, লাঞ্চনা, অবহেলা, নির্যাতন আর নীপিড়নের শিকার। তাইতো আজকের শিক্ষিত ও সভ্য সমাজেও নারীদের অধিকার নিয়ে ‘নারী দিবস’ পালন করতে হয়। নারীদের সম্মান, সম্ভ্রম ও ইজ্জতের সংরক্ষণ করে তাদের ফিতনার কারণ সমূহ হতে দূরে রাখার দায়িত্ব সকলের।
লেখক : প্রাবন্ধিক এবং সভাপতি, পরিচালনা কমিটি, সাইটুলা ইসলামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম মাদরাসা, শ্রীমঙ্গল।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম


আরও
আরও পড়ুন