Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮, ২৮ রমজান ১৪৪২ হিজরী

ডিম : পরিপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার

| প্রকাশের সময় : ১৯ মার্চ, ২০২১, ১২:০৭ এএম

সকলের নিকট অতি পরিচিত খাদ্য ডিম। এটি পরিপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার। যা শরীরের নানা উপকার ও স্বাস্থ্যের জন্য অতি উত্তম। ডিম নিয়ে আমাদের মাঝে নানা ভুল ধারণা ও আছে। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ডিম খাওয়া ফনয়ে অনুমান নির্ভর দুশ্চিন্তায় ভোগেন। অনেক মনে করেন ডিমের কোলেষ্টেরল হৃদরোগ, মস্তিকে রক্ত করণ (স্ট্রোক) রোগ সৃষ্টি করে। আবার কেউ মনে করে ডিম খেলে উচ্চ রক্তচাপ, বা হাইপ্রেসার হয়। পেটে গ্যাস জমা হয়। কিন্তু আসলে এসব ক্ষেত্রে ডিম কতটুকু দায়ী তা জানা দরকার। আর ডিম কাদের জন্য ক্ষতিকর এ সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা থাকা দরকার। তাছাড়া ডিমের উপাদান সম্পর্কে জানা থাকলে ডিমের মতো সুষম খাবার হতে বঞ্চিত আমরা হব না। ডিম মুখরোচক, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রণ, কোলিন এবং ভিটামিন সি ছাড়া অন্যান্য ভিটামিনে ভরপুর।

ডিমের বাহিরের শক্ত খোসা ছাড়া ভিতরের সব অংশই খাদ্য উপযোগী। একটি ডিমের গড় ওজন ৬০ গ্রাম প্রায়। পুুষ্ঠিমানের দিক দিয়ে হাঁসের ও মুরগির ডিমের তেমন কোন পার্থক্য নেই। তবে মুরগির ডিমের চেয়ে ফার্মের ডিম বা হাঁসের ডিমের পুষ্টির পরিমান বেশি। কারণ এগুলো আকারে একটু বড়। বাংলাদেশের মানুষ বছরে মাত্র ৪৫-৫০টি ডিম খায়। অথচ জাতি সংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে সুস্থ থাকার জন্য বছরে এক জন মানুষ ১০৪ ডিম খাওয়া প্রয়োজন। সুষম খাদ্যের অভাবে বাংলাদেশের শিশু থেকে শুরু করে সব ধরনের মানুষ অপুষ্ঠিতে ভোগে। তাই স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য আমাদের খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ডিমে প্রচুর পরিমাণে প্রোট্রিন, চর্বি, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, কোলিন ও ৮ ধরনের অ্যামাইনো এসিড থাকে যা সুস্থ দেহ গঠনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া ডিমে প্রচার পরিমানে ফ্যাটি এসিড আছে। একটি ডিমে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ ১.৮৬ গ্রাম, অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ ৩.১২ গ্রাম এবং কোলেস্টেরল পরিমাণ ২২৫ গ্রাম। উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরলের সাথে সম্পৃক্ত চর্বি খাদ্যে মিলিত হয়ে মানব দেহে হৃদরোগের সৃষ্টি করতে পারে, তা সত্য। কিন্তু ডিমে সম্পৃক্ত চর্বির চেয়ে মানব দেহের জন্য উপকারি অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমান প্রায় দ্বিগুণ। মানব শরীরের জন্য কোলেস্টেরল খুবই প্রয়োজন। অথচ এই কোলেস্টেরলের ভয়ে কেউ কেউ ডিম খান না। মানুষের শরীরের সকল ষ্টেরয়েড হরমোন তৈরীতে এটা প্রয়োজন হয়।পুরুষের সেক্স হরমোন টেস্টোস্টেরন আর মহিলাদের সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন দেহে তৈরীর জন্য কোলেস্টেরল প্রয়োজন। ভিটামিন ডি এবং যকৃতের বাইল এসিডের প্রাথমিক উৎস কোলেস্টেরল। তাছাড়া শরীরের বিপাকীয় কাজে কোলেস্টেরল গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

ডিমে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা ৩ থাকে। যা শরীরের কোষগুলিকে নিয়ন্ত্রন করে। ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এ উপাদানটি রক্তের প্রজমায় ট্রাইগিøসারিডের পরিমাণ কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। তাছাড়া এ উপাদানটি চোখের দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি করে। দেহের সালমোনেলা আক্রমন রোধ করে, মাংসের ক্ষয়রোধ করে এবং স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

ডিমের এইচডিএল (হাই ডেনসিটি লাইপো প্রোট্রিন), অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড, ও মেগা ৩ রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায় এবং রক্ত নালীতে এলডিএল (লো-ডেনসিটি লাইপো প্রোট্রিন) জমতে দেয় না। ফলে হৃদরোগ ও মস্তিষ্কের রক্তকরণ রোগ অনেকাংশে কমে যায়। ডিমে কোলিন নামে যে উপাদান থাকে তা মস্তিষ্ক গঠন করে এবং সুস্থ ও সবল রাখে। তাই শিশুদের ডিম খাওয়ালে মস্তিষ্কের সঠিক গঠন ও পরিপক্ক হয়। কোলিন যকৃতের (কলিজা) কাজ স্বাভাবিক রাখে। বাচ্চাদের নিউরন কোষ তৈরীতে সাহায্য করে। গর্ববতী মহিলাদের প্রতিদিন একটি করে ডিম খাওয়ালে গর্ভের বাচ্চার উন্নত স্মৃতিশক্তি তৈরী হয়। ডিমের জৈব ক্রোমিয়াম ইনসুলিন উৎপাদনের মাধ্যমে রক্তের শর্করা বা চিনির সমতা বজায় রাখে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে একটি ডিম হতে যে খাদ্য উপাদান পাওয়া যায় তা নিম্নরূপ:- খাদ্য শক্তি ১৮১ কিলোক্যালরি, আমিষ ১৩.৫ গ্রাম, চর্বি ১৩.৭ গ্রাম, শর্করা ০.৮ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৭০ মিলিগ্রাম, আয়রণ ৩ গ্রাম, পানি ৩৫ গ্রাম, কোলেস্টেরল ২২৫ গ্রাম, সোডিয়াম ০.১২ গ্রাম, ক্লোরিন ০.১৮ গ্রাম, পটাশিয়াম .১২ গ্রাম, ভিটামিন বি-১ ০.৫ মিলিগ্রাম, বি-৬ ০.১৪ মিলিগ্রাম, নিয়োসিন ০.৭ মিলিগ্রাম, থায়ামিন ০.০৬ মিলিগ্রাম, ই-৭ ৪০ মিলিগ্রাম, বি-২ ৩১০ মিলিগ্রাম, বি-১২ ১ মিলিগ্রাম, এ- ৭৪০ মিলিগ্রাম, ফলাসিন ৪৬ মিলিগ্রাম কোলিন ১২৬ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৯৬ মিলিগ্রাম, সেলেনিয়াম ১৫.৮ মাাইক্রোগ্রাম। ডিমের সাদা অংশ বা অ্যালবুমিন ৩৪-৩৫ গ্রাম থাকে যা ডিমের মোট ওজনের শতকরা ৫৭ ভাগ। এ অ্যালবুমিন মিউকাস মেমব্রেনকে সুরক্ষা করে পাকস্থলির প্রদাহ, আলসার, ডায়রিয়া প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। একজন পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ মানুষ প্রতিদিন ৩০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কোলেস্টেরল গ্রহন করতে পারে। ডিমে থাকে ২২৫ গ্রাম কোলেস্টেরল। সুতরাং ভয় করে ডিম খাওয়া বাতিল করা উচিত নয়। যদি আপনার দেহে কোলেস্টেরল আগ থেকে বেড়ে না থাকে, তাহলে ডিম খাওয়া বাদ দেওয়া উচিত নয়। তবে মনে রাখবেন আপনার শরীরের সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মতে ডিম খাবেন। কাঁচা ডিমে সালমোনেলা, সিগেলা নামক জীবানু সংক্রমনের আশংকা থাকে। গরমের সময় এ আশংকা আরও বেশী থাকে। তাই কাঁচা ডিম খাওয়া উচিত নয়। অনেকে মনে করেন ডিম খেলে বাত হয়। তা সঠিক হয়। বাতের অন্যতম কারণ হলো রক্তের ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। ডিমের সাদা অংশে যে ইউরিক এসিড থাকে তা খবুই সামান্য, যা আমাদের শরীরের কোন ক্ষতি করে না। ডিমে ফসফরাস থাকে যা দেহের হাড় গঠনে সাহায্য করে। কুসুমে থাকে ফোলেট যা রক্ত কোষ তৈরীতে সাহায্যকরে এবং কুসুমের জিংক থাকে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সিদ্ধ ডিম খেলে চোখের ছানিপড়া এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে।

মোঃ জহিরুল আলম শাহীন
শিক্ষক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কলাম লেখক
ফুলসাইন্দ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
গোলাপগঞ্জ, সিলেট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পুষ্টিকর খাবার
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ